সুনামগঞ্জে আবারও বন্যার শঙ্কা ঘনিয়ে এসেছে। উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বর্ষণে জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। ইতোমধ্যে কিছু সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে জেলার নি¤œাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে অভিজ্ঞতা বলে, শুধু প্রস্তুতির ঘোষণা নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সুনামগঞ্জ একটি হাওরাঞ্চল। প্রতি বর্ষায় এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা প্রকৃতির সঙ্গে এক কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যা এ অঞ্চলের পরিচিত বাস্তবতা। তাই দুর্যোগকে আর ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটিকে নিয়মিত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, ত্রাণ মজুত, মেডিকেল টিম গঠন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও উদ্ধার কার্যক্রমের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, অনেক সময় ত্রাণ পৌঁছাতে বিলম্ব হয়, দুর্গম এলাকার মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন এবং দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজও ব্যাহত হয়। তাই এবার যেন কোনো ধরনের সমন্বয়হীনতা না থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
একই সঙ্গে বন্যা মোকাবিলায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যুবসমাজ এবং সাধারণ মানুষকে স¤পৃক্ত করতে হবে। নদীর পানি বৃদ্ধির তথ্য নিয়মিত প্রচার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বন্যা-পরবর্তী সময়ের কথাও এখন থেকেই ভাবতে হবে। কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, কৃষকদের প্রণোদনা এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমানো অবশ্যই সম্ভব। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে সম্ভাব্য বন্যার ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে। সুনামগঞ্জবাসী আশা করে, এবার প্রস্তুতি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বাস্তবেও তার কার্যকর প্রতিফলন ঘটবে। কারণ দুর্যোগের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা হলো একটি দক্ষ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।