শেখ একেএম জাকারিয়া::
ইতিহাসের অনুসন্ধান অনেক সময় আমাদের এমন সব সত্যের সামনে দাঁড় করায়, যা দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সুনামগঞ্জ নামকরণের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমিও তেমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে সুনামগঞ্জ নামকরণের উৎস অনুসন্ধানে আমি বিভিন্ন প্রাচীন মানচিত্র, লোককথা এবং ঐতিহাসিক উপাদান পর্যালোচনা করে আসছিলাম। সেই অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে প্রকাশিত ‘হাওরকণ্ঠ’ লিটল ম্যাগাজিনে আমার “সুনামগঞ্জ নামতত্ত্ব ও বিশ্লেষণ” শীর্ষক প্রবন্ধে এ অঞ্চলের নামকরণের উৎস ও বিবর্তন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করার চেষ্টা করেছিলাম। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ সত্ত্বেও তখন বিষয়টির একটি নির্ভরযোগ্য ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে সুনামগঞ্জ নামের উৎপত্তি স¤পর্কে আমার মনে সংশয় ও অনুসন্ধিৎসা থেকেই গিয়েছিল। সম্প্রতি প্রাপ্ত কয়েকটি প্রাচীন ভূমি-সনদ, দলিল এবং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য আমার সামনে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এসব উপাদান গভীরভাবে পর্যালোচনা করে উপলব্ধি করেছি যে, সুনামগঞ্জ নামকরণ সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী অনেক ধারণাই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। নবপ্রাপ্ত তথ্যগুলো শুধু একটি নামের উৎপত্তির ব্যাখ্যাই দেয় না; বরং সুনামগঞ্জের অতীত, জনপদ-গঠন এবং স্থানীয় ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা সম্পর্কেও নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। সে কারণেই বর্তমান আলোচনায় পূর্ববর্তী মতামতের পুনরাবৃত্তি না করে দলিলভিত্তিক নতুন তথ্যের আলোকে সুনামগঞ্জ নামকরণের ইতিহাস পুনর্বিবেচনার প্রয়াস নিয়েছি। আশা করি, এ আলোচনায় উপস্থাপিত তথ্য, দলিল এবং বিশ্লেষণ সুনামগঞ্জের ইতিহাসচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং নামকরণের উৎস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে। ইতিহাসচর্চায় সত্য কখনো স্থির থাকে না; নতুন তথ্য, নবউদ্ধারকৃত প্রাচীন দলিল এবং নতুন প্রমাণের আলোকে প্রতিষ্ঠিত ধারণাও সংশোধিত হতে পারে। সত্য পাহাড়ের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত ঝরণার মতো; তাকে কিছু সময়ের জন্য পাথর, মাটি কিংবা কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা যায়, কিন্তু চিরদিন রুদ্ধ রাখা যায় না। একসময় সে নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নেয় এবং তার স্বচ্ছ ¯্রােত চারদিকে ছড়িয়ে দেয় প্রকৃত বাস্তবতার সংবাদ। যেমন ভোরের প্রথম আলো রাতের গভীরতম অন্ধকার দূর করে দেয়, তেমনি সত্যও একদিন সকল আবরণ ভেদ করে আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়। এই বিশ্বাস থেকেই সুনামগঞ্জ নামের উৎপত্তি এবং সুনামদি-সংক্রান্ত যে তথ্য ও উপাদান সম্প্রতি আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে, তাই আজকের আলোচনার মূল বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে গবেষকমহলে ১৬৬০ সালে অঙ্কিত একটি প্রাচীন মানচিত্রের কথা আলোচিত হয়ে আসছিল। প্রথমদিকে বিষয়টি আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি মানচিত্রটির একটি অনুলিপি পর্যালোচনার সুযোগ পেয়ে আমি লক্ষ্য করি, সেখানে “সুনামগঞ্জ” নামটি স্পষ্টভাবে অঙ্কিত রয়েছে। এই তথ্য সুনামগঞ্জের নামকরণ-সংক্রান্ত প্রচলিত ধারণাগুলোকে নতুনভাবে পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি করে। মানচিত্রটি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য দীর্ঘদিন ধরে সুনামগঞ্জের ইতিহাসচর্চার মূল আলোচনায় স্থান পায়নি কেন? মানচিত্রটি কি গবেষকদের কাছে দুষ্প্রাপ্য ছিল, নাকি অন্য কোনো কারণে এটি পর্যাপ্ত গুরুত্ব লাভ করেনি? প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করাও ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতদিন সুনামগঞ্জের ইতিহাস আলোচনায় জেমস রেনেলের অঙ্কিত ১৭৭৮ সালের মানচিত্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরও প্রায় এক শতাব্দীর বেশি পূর্বে অঙ্কিত একটি মানচিত্রে যখন “সুনামগঞ্জ” নামটি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত দেখা যায়, তখন সুনামগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে ওঠে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সুনামগঞ্জের নামকরণ-সংক্রান্ত প্রচলিত ইতিহাসচর্চা ও গবেষণালব্ধ আলোচনায় এই প্রাচীন মানচিত্রের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। অথচ কৈলাস সিংহ রচিত রাজমালা গ্রন্থসূত্রে প্রাপ্ত ১৬৬০ সালের এই মানচিত্রে “সুনামগঞ্জ” নামটির উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, নামটি সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগেই প্রচলিত ছিল। ফলে নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে প্রচলিত ব্যাখ্যা ও অনুমানসমূহকে প্রাচীন দলিল-প্রমাণের আলোকে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, জেমস রেনেলের অঙ্কিত মানচিত্রে কেন “সুনামগঞ্জ” নামটি স্থান পায়নি। এর পেছনে তথ্যসংগ্রহের সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, স্থাননামের পরিবর্তন, বানানগত ভিন্নতা কিংবা সমকালীন অন্য কোনো বাস্তব কারণ কার্যকর ছিল কি না, তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে। পর্যাপ্ত দলিল-প্রমাণ, মানচিত্রসমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক ঐতিহাসিক উৎসের সমন্বিত পর্যালোচনা ছাড়া এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সমীচীন নয়। তবে এটুকু বলা যায় যে, ১৬৬০ সালের মানচিত্রে “সুনামগঞ্জ” নামটির উপস্থিতি এ অঞ্চলের ইতিহাসচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা সুনামগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসের অনুসন্ধান কখনো থেমে থাকে না। নবউদ্ধারকৃত প্রাচীন দলিল, নতুন তথ্য এবং নতুন আবিষ্কার প্রায়ই প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ করে দেয়। সুনামগঞ্জের নামকরণের ইতিহাসও হয়তো তেমনই একটি অধ্যায়, যেখানে প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি নতুন তথ্য-উপাত্তকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি পুনরায় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহই সর্বজ্ঞ। তিনি ভালো জানেন, অতীতের কত ইতিহাস, কত স্থাননাম এবং কত জনপদের পরিচয় সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে কিংবা এখনো অজানা রয়ে গেছে। ইতিহাসের অনুসন্ধিৎসু মানুষের দায়িত্ব হলো সেই হারিয়ে যাওয়া সত্যকে দলিল, প্রমাণ এবং গবেষণার আলোকে যতদূর সম্ভব পুনরুদ্ধার করা। দাওরাই গবেষক এএসএম ওয়াজেদের কাছে হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) থেকে শেখ সুনাম উদ্দিন পর্যন্ত একটি প্রাচীন বংশতালিকা সংরক্ষিত রয়েছে, যা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুর্লভ এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে আল-ইসলাহ পত্রিকায় প্রকাশিত হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) থেকে শেখ সুনাম উদ্দিন এবং তাঁর পরবর্তী বংশধরদের বংশপরম্পরার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে উপস্থাপন করা হলো। বংশধারার সূচনায় হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর উত্তরসূরি হিসেবে শেখ আহমদ বখশ, শেখ মীর বখশ, শেখ পীর বখশ, শেখ নূর বখশ খতিব, শেখ সিরাজ মোহাম্মদ, শেখ জান মোহাম্মদ, শেখ মোহাম্মদ হাশিম, শেখ মোহাম্মদ শফী এবং শেখ কেশর মোহাম্মদের নাম পাওয়া যায়। এই ধারাবাহিকতা একটি সুসংগঠিত পারিবারিক বংশপর¤পরার পরিচয় বহন করে। পরবর্তী পর্যায়ে শেখ জান মোহাম্মদের পুত্র শেখ বখশীর নাম পাওয়া যায়। তাঁর পুত্রদের মধ্যে শেখ গয়াছ মোহাম্মদ, শেখ সমশের মোহাম্মদ, শেখ সুলতান মোহাম্মদ এবং শেখ আমীর উদ্দিন উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মধ্যে শেখ গয়াছ মোহাম্মদের বংশধারাই পরবর্তীকালে বিশেষভাবে বিস্তৃত হয়। শেখ গয়াছ মোহাম্মদের দুই পুত্র ছিলেন। তাঁদের একজন শেখ সুনাম উদ্দিন, যিনি ‘সুনামদি’ নামেও পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, তাঁর নামের সঙ্গেই ‘সুনামগঞ্জ’ নামকরণের ঐতিহাসিক স¤পর্ক রয়েছে। অপরজন ছিলেন শেখ বুরহান উদ্দিন। শেখ সুনাম উদ্দিনের বংশধারায় শেখ ইয়াজ উদ্দিন ও শেখ বিরাহিমের নাম পাওয়া যায়। শেখ ইয়াজ উদ্দিনের নামে চাকলাবন্দ দলিল এবং শেখ বিরাহিমের নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমি-সনদের উল্লেখ পাওয়া যায়। ওই ভূমি-সনদে ৭ শাবান ১০৯৭ হিজরি (১৬৮৬ খ্রিস্টাব্দ), নবাব সিকন্দর, কোড এবং কিউ-২৬৭/২৯৩ নম্বর তথ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে। শেখ ইয়াজ উদ্দিনের দুই পুত্র ছিলেন-শেখ আনফর উল্যাহ ও শেখ ছিফত উল্যাহ। শেখ আনফর উল্যাহর পুত্রদ্বয় ছিলেন শেখ ইউসুফ উল্যাহ ও শেখ ইছাক উল্যাহ। অন্যদিকে, শেখ ছিফত উল্যাহর পুত্র ছিলেন শেখ রফাত উল্যাহ। অপরদিকে, শেখ বুরহান উদ্দিনের পুত্র ছিলেন শেখ শহর উদ্দিন ও শেখ আযীম উদ্দিন। শেখ শহর উদ্দিনের বংশধারায় শেখ ইউনুস উল্লাহ এবং তাঁর পুত্র শেখ আব্দুছ ছোবাহানের নাম পাওয়া যায়। শেখ আযীম উদ্দিনের পুত্র ছিলেন শেখ ইনজাদ উল্লাহ। সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, অন্য একটি সূত্রে ইয়াজ উদ্দিন ও বিরাহিমের নাম-সংবলিত একটি ভূমি-সনদে তাঁদের আরও কয়েকজন পুত্রসন্তানের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে অধিকতর অনুসন্ধান এবং দলিল পর্যালোচনার সুযোগ এখনো রয়েছে। এই বংশপর¤পরা কেবল একটি পরিবারের ইতিহাস নয়; বরং দাওরাই জনপদের সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য অনুধাবনের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।⁴ এছাড়া নাসীর উদ্দীন আহমদ বিদ্যাভূষণ রচিত হজরত শাহ দাওর বখশ খতীব গ্রন্থটি ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এএসএম ওয়াজেদের মতে, আল-ইসলাহ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের সূত্র ধরে গ্রন্থকার ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে সরেজমিনে দাওরাই এলাকায় গিয়ে হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মাজারের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত ঐতিহ্য, মাজারের অবস্থান এবং প্রচলিত জনশ্রুতির ভিত্তিতে তিনি বিষয়টির ঐতিহাসিক সত্যতা অনুধাবনের চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে এসব অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই তিনি গ্রন্থটি রচনা ও প্রকাশ করেন। গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, “হজরত শাহ দাওর বখশ খতীব হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম অনুচর। তিনি আতুয়াজান পরগণার দাওরাই মৌজায় অবস্থান করিয়াছিলেন। দাওরাই মৌজার প্রায় এক মাইল দক্ষিণে বড়ফেছি মৌজায় তাহার মাজার শরীফ অবস্থিত। মাজার শরীফ-সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। হজরত শাহ দাওর বখশ খতীব জনৈক হিন্দু কন্যার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাহার বংশধরেরা এখনও তথায় বাস করিতেছেন।” পরবর্তীতে নাসীর উদ্দীন আহমদ বিদ্যাভূষণ, মুহম্মদ নূরুল হক স¤পাদিত ১৩৬৪ বঙ্গাব্দে (১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে) প্রকাশিত আল-ইসলাহ পত্রিকার ‘শাহজালাল সংখ্যা’, দ্বিতীয় খ-ের ৭ম ও ৮ম সংখ্যার ১৫৪তম পৃষ্ঠা থেকে হযরত শাহ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর বংশতালিকা তাঁর গ্রন্থে পুনর্মুদ্রণ করেন। ওই বংশতালিকা অনুসারে শেখ জান মোহাম্মদের পুত্র ছিলেন শেখ বখশী। তাঁর অধস্তন পুরুষদের মধ্যেই সুনামগঞ্জের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব শেখ সুনাম উদ্দিনের আবির্ভাব ঘটে, যিনি ‘সুনামদি’ নামে অধিক পরিচিত। গবেষক এএসএম ওয়াজেদের মতে, ১৬৬০ সালে অঙ্কিত শ্রীহট্টের মানচিত্রে যে ‘সুনামগঞ্জ’ নাম দেখা যায়, সেই নামটি দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর অধস্তন বংশধর শেখ সুনাম উদ্দিনের নাম থেকেই উদ্ভূত। সুনামদির পুত্র ইয়াজ উদ্দিনের পরবর্তী প্রজন্মে আনফর ও ছিফতের নাম পাওয়া যায়। ১৮১৭ সালের দাওরাই এলাকার নিষ্কর রেকর্ডে আনফর ও ছিফতের বংশধরদের অস্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে, যা তাঁদের ঐতিহাসিক উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যদিকে, বিরাহিম (বিরামদি) স¤পর্কে পত্তনি রেকর্ড এবং শায়েস্তানগর পরগণার বসতিভূমির সনদসূত্রে তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া, ভূমি সনদ পরিচিতি গ্রন্থে ছনখাইর পরগণার একটি সনদে গ্রহীতা হিসেবে “শেখ বিরাহিম, পিতা শেখ সুনাম ফকির” এভাবে উল্লেখ রয়েছে। এসব পত্তনি রেকর্ড ও ভূমি-সনদ থেকে ধারণা করা যায় যে, সুনাম উদ্দিনের পুত্রগণ দাওরাই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁদের বংশধররা বিভিন্ন পরগণায় বিস্তৃত হন। বিশেষত, সুনামদির পুত্র বিরাহিমের শায়েস্তানগর পরগণায় বসতিভূমির উল্লেখ তাঁর স্থায়ী আবাস এবং বংশপরম্পরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাছাড়া, দাওরাই অঞ্চলের স্থানীয় গবেষক মহলও সুনামগঞ্জ নামকরণের ক্ষেত্রে দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর সুযোগ্য উত্তরসূরি শেখ সুনাম উদ্দিনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, “সুনামগঞ্জ” নামটির পেছনেও এই বংশধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্র নিহিত রয়েছে। (চলবে)
ইতিহাসের অনুসন্ধান অনেক সময় আমাদের এমন সব সত্যের সামনে দাঁড় করায়, যা দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সুনামগঞ্জ নামকরণের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমিও তেমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে সুনামগঞ্জ নামকরণের উৎস অনুসন্ধানে আমি বিভিন্ন প্রাচীন মানচিত্র, লোককথা এবং ঐতিহাসিক উপাদান পর্যালোচনা করে আসছিলাম। সেই অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে প্রকাশিত ‘হাওরকণ্ঠ’ লিটল ম্যাগাজিনে আমার “সুনামগঞ্জ নামতত্ত্ব ও বিশ্লেষণ” শীর্ষক প্রবন্ধে এ অঞ্চলের নামকরণের উৎস ও বিবর্তন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করার চেষ্টা করেছিলাম। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ সত্ত্বেও তখন বিষয়টির একটি নির্ভরযোগ্য ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে সুনামগঞ্জ নামের উৎপত্তি স¤পর্কে আমার মনে সংশয় ও অনুসন্ধিৎসা থেকেই গিয়েছিল। সম্প্রতি প্রাপ্ত কয়েকটি প্রাচীন ভূমি-সনদ, দলিল এবং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য আমার সামনে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এসব উপাদান গভীরভাবে পর্যালোচনা করে উপলব্ধি করেছি যে, সুনামগঞ্জ নামকরণ সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী অনেক ধারণাই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। নবপ্রাপ্ত তথ্যগুলো শুধু একটি নামের উৎপত্তির ব্যাখ্যাই দেয় না; বরং সুনামগঞ্জের অতীত, জনপদ-গঠন এবং স্থানীয় ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা সম্পর্কেও নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। সে কারণেই বর্তমান আলোচনায় পূর্ববর্তী মতামতের পুনরাবৃত্তি না করে দলিলভিত্তিক নতুন তথ্যের আলোকে সুনামগঞ্জ নামকরণের ইতিহাস পুনর্বিবেচনার প্রয়াস নিয়েছি। আশা করি, এ আলোচনায় উপস্থাপিত তথ্য, দলিল এবং বিশ্লেষণ সুনামগঞ্জের ইতিহাসচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং নামকরণের উৎস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে। ইতিহাসচর্চায় সত্য কখনো স্থির থাকে না; নতুন তথ্য, নবউদ্ধারকৃত প্রাচীন দলিল এবং নতুন প্রমাণের আলোকে প্রতিষ্ঠিত ধারণাও সংশোধিত হতে পারে। সত্য পাহাড়ের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত ঝরণার মতো; তাকে কিছু সময়ের জন্য পাথর, মাটি কিংবা কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা যায়, কিন্তু চিরদিন রুদ্ধ রাখা যায় না। একসময় সে নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নেয় এবং তার স্বচ্ছ ¯্রােত চারদিকে ছড়িয়ে দেয় প্রকৃত বাস্তবতার সংবাদ। যেমন ভোরের প্রথম আলো রাতের গভীরতম অন্ধকার দূর করে দেয়, তেমনি সত্যও একদিন সকল আবরণ ভেদ করে আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়। এই বিশ্বাস থেকেই সুনামগঞ্জ নামের উৎপত্তি এবং সুনামদি-সংক্রান্ত যে তথ্য ও উপাদান সম্প্রতি আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে, তাই আজকের আলোচনার মূল বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে গবেষকমহলে ১৬৬০ সালে অঙ্কিত একটি প্রাচীন মানচিত্রের কথা আলোচিত হয়ে আসছিল। প্রথমদিকে বিষয়টি আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি মানচিত্রটির একটি অনুলিপি পর্যালোচনার সুযোগ পেয়ে আমি লক্ষ্য করি, সেখানে “সুনামগঞ্জ” নামটি স্পষ্টভাবে অঙ্কিত রয়েছে। এই তথ্য সুনামগঞ্জের নামকরণ-সংক্রান্ত প্রচলিত ধারণাগুলোকে নতুনভাবে পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি করে। মানচিত্রটি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য দীর্ঘদিন ধরে সুনামগঞ্জের ইতিহাসচর্চার মূল আলোচনায় স্থান পায়নি কেন? মানচিত্রটি কি গবেষকদের কাছে দুষ্প্রাপ্য ছিল, নাকি অন্য কোনো কারণে এটি পর্যাপ্ত গুরুত্ব লাভ করেনি? প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করাও ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতদিন সুনামগঞ্জের ইতিহাস আলোচনায় জেমস রেনেলের অঙ্কিত ১৭৭৮ সালের মানচিত্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরও প্রায় এক শতাব্দীর বেশি পূর্বে অঙ্কিত একটি মানচিত্রে যখন “সুনামগঞ্জ” নামটি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত দেখা যায়, তখন সুনামগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে ওঠে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সুনামগঞ্জের নামকরণ-সংক্রান্ত প্রচলিত ইতিহাসচর্চা ও গবেষণালব্ধ আলোচনায় এই প্রাচীন মানচিত্রের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। অথচ কৈলাস সিংহ রচিত রাজমালা গ্রন্থসূত্রে প্রাপ্ত ১৬৬০ সালের এই মানচিত্রে “সুনামগঞ্জ” নামটির উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, নামটি সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগেই প্রচলিত ছিল। ফলে নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে প্রচলিত ব্যাখ্যা ও অনুমানসমূহকে প্রাচীন দলিল-প্রমাণের আলোকে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, জেমস রেনেলের অঙ্কিত মানচিত্রে কেন “সুনামগঞ্জ” নামটি স্থান পায়নি। এর পেছনে তথ্যসংগ্রহের সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, স্থাননামের পরিবর্তন, বানানগত ভিন্নতা কিংবা সমকালীন অন্য কোনো বাস্তব কারণ কার্যকর ছিল কি না, তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে। পর্যাপ্ত দলিল-প্রমাণ, মানচিত্রসমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক ঐতিহাসিক উৎসের সমন্বিত পর্যালোচনা ছাড়া এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সমীচীন নয়। তবে এটুকু বলা যায় যে, ১৬৬০ সালের মানচিত্রে “সুনামগঞ্জ” নামটির উপস্থিতি এ অঞ্চলের ইতিহাসচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা সুনামগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসের অনুসন্ধান কখনো থেমে থাকে না। নবউদ্ধারকৃত প্রাচীন দলিল, নতুন তথ্য এবং নতুন আবিষ্কার প্রায়ই প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ করে দেয়। সুনামগঞ্জের নামকরণের ইতিহাসও হয়তো তেমনই একটি অধ্যায়, যেখানে প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি নতুন তথ্য-উপাত্তকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি পুনরায় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহই সর্বজ্ঞ। তিনি ভালো জানেন, অতীতের কত ইতিহাস, কত স্থাননাম এবং কত জনপদের পরিচয় সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে কিংবা এখনো অজানা রয়ে গেছে। ইতিহাসের অনুসন্ধিৎসু মানুষের দায়িত্ব হলো সেই হারিয়ে যাওয়া সত্যকে দলিল, প্রমাণ এবং গবেষণার আলোকে যতদূর সম্ভব পুনরুদ্ধার করা। দাওরাই গবেষক এএসএম ওয়াজেদের কাছে হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) থেকে শেখ সুনাম উদ্দিন পর্যন্ত একটি প্রাচীন বংশতালিকা সংরক্ষিত রয়েছে, যা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুর্লভ এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে আল-ইসলাহ পত্রিকায় প্রকাশিত হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) থেকে শেখ সুনাম উদ্দিন এবং তাঁর পরবর্তী বংশধরদের বংশপরম্পরার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে উপস্থাপন করা হলো। বংশধারার সূচনায় হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর উত্তরসূরি হিসেবে শেখ আহমদ বখশ, শেখ মীর বখশ, শেখ পীর বখশ, শেখ নূর বখশ খতিব, শেখ সিরাজ মোহাম্মদ, শেখ জান মোহাম্মদ, শেখ মোহাম্মদ হাশিম, শেখ মোহাম্মদ শফী এবং শেখ কেশর মোহাম্মদের নাম পাওয়া যায়। এই ধারাবাহিকতা একটি সুসংগঠিত পারিবারিক বংশপর¤পরার পরিচয় বহন করে। পরবর্তী পর্যায়ে শেখ জান মোহাম্মদের পুত্র শেখ বখশীর নাম পাওয়া যায়। তাঁর পুত্রদের মধ্যে শেখ গয়াছ মোহাম্মদ, শেখ সমশের মোহাম্মদ, শেখ সুলতান মোহাম্মদ এবং শেখ আমীর উদ্দিন উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মধ্যে শেখ গয়াছ মোহাম্মদের বংশধারাই পরবর্তীকালে বিশেষভাবে বিস্তৃত হয়। শেখ গয়াছ মোহাম্মদের দুই পুত্র ছিলেন। তাঁদের একজন শেখ সুনাম উদ্দিন, যিনি ‘সুনামদি’ নামেও পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, তাঁর নামের সঙ্গেই ‘সুনামগঞ্জ’ নামকরণের ঐতিহাসিক স¤পর্ক রয়েছে। অপরজন ছিলেন শেখ বুরহান উদ্দিন। শেখ সুনাম উদ্দিনের বংশধারায় শেখ ইয়াজ উদ্দিন ও শেখ বিরাহিমের নাম পাওয়া যায়। শেখ ইয়াজ উদ্দিনের নামে চাকলাবন্দ দলিল এবং শেখ বিরাহিমের নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমি-সনদের উল্লেখ পাওয়া যায়। ওই ভূমি-সনদে ৭ শাবান ১০৯৭ হিজরি (১৬৮৬ খ্রিস্টাব্দ), নবাব সিকন্দর, কোড এবং কিউ-২৬৭/২৯৩ নম্বর তথ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে। শেখ ইয়াজ উদ্দিনের দুই পুত্র ছিলেন-শেখ আনফর উল্যাহ ও শেখ ছিফত উল্যাহ। শেখ আনফর উল্যাহর পুত্রদ্বয় ছিলেন শেখ ইউসুফ উল্যাহ ও শেখ ইছাক উল্যাহ। অন্যদিকে, শেখ ছিফত উল্যাহর পুত্র ছিলেন শেখ রফাত উল্যাহ। অপরদিকে, শেখ বুরহান উদ্দিনের পুত্র ছিলেন শেখ শহর উদ্দিন ও শেখ আযীম উদ্দিন। শেখ শহর উদ্দিনের বংশধারায় শেখ ইউনুস উল্লাহ এবং তাঁর পুত্র শেখ আব্দুছ ছোবাহানের নাম পাওয়া যায়। শেখ আযীম উদ্দিনের পুত্র ছিলেন শেখ ইনজাদ উল্লাহ। সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, অন্য একটি সূত্রে ইয়াজ উদ্দিন ও বিরাহিমের নাম-সংবলিত একটি ভূমি-সনদে তাঁদের আরও কয়েকজন পুত্রসন্তানের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে অধিকতর অনুসন্ধান এবং দলিল পর্যালোচনার সুযোগ এখনো রয়েছে। এই বংশপর¤পরা কেবল একটি পরিবারের ইতিহাস নয়; বরং দাওরাই জনপদের সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য অনুধাবনের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।⁴ এছাড়া নাসীর উদ্দীন আহমদ বিদ্যাভূষণ রচিত হজরত শাহ দাওর বখশ খতীব গ্রন্থটি ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এএসএম ওয়াজেদের মতে, আল-ইসলাহ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের সূত্র ধরে গ্রন্থকার ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে সরেজমিনে দাওরাই এলাকায় গিয়ে হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মাজারের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত ঐতিহ্য, মাজারের অবস্থান এবং প্রচলিত জনশ্রুতির ভিত্তিতে তিনি বিষয়টির ঐতিহাসিক সত্যতা অনুধাবনের চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে এসব অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই তিনি গ্রন্থটি রচনা ও প্রকাশ করেন। গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, “হজরত শাহ দাওর বখশ খতীব হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম অনুচর। তিনি আতুয়াজান পরগণার দাওরাই মৌজায় অবস্থান করিয়াছিলেন। দাওরাই মৌজার প্রায় এক মাইল দক্ষিণে বড়ফেছি মৌজায় তাহার মাজার শরীফ অবস্থিত। মাজার শরীফ-সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। হজরত শাহ দাওর বখশ খতীব জনৈক হিন্দু কন্যার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাহার বংশধরেরা এখনও তথায় বাস করিতেছেন।” পরবর্তীতে নাসীর উদ্দীন আহমদ বিদ্যাভূষণ, মুহম্মদ নূরুল হক স¤পাদিত ১৩৬৪ বঙ্গাব্দে (১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে) প্রকাশিত আল-ইসলাহ পত্রিকার ‘শাহজালাল সংখ্যা’, দ্বিতীয় খ-ের ৭ম ও ৮ম সংখ্যার ১৫৪তম পৃষ্ঠা থেকে হযরত শাহ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর বংশতালিকা তাঁর গ্রন্থে পুনর্মুদ্রণ করেন। ওই বংশতালিকা অনুসারে শেখ জান মোহাম্মদের পুত্র ছিলেন শেখ বখশী। তাঁর অধস্তন পুরুষদের মধ্যেই সুনামগঞ্জের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব শেখ সুনাম উদ্দিনের আবির্ভাব ঘটে, যিনি ‘সুনামদি’ নামে অধিক পরিচিত। গবেষক এএসএম ওয়াজেদের মতে, ১৬৬০ সালে অঙ্কিত শ্রীহট্টের মানচিত্রে যে ‘সুনামগঞ্জ’ নাম দেখা যায়, সেই নামটি দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর অধস্তন বংশধর শেখ সুনাম উদ্দিনের নাম থেকেই উদ্ভূত। সুনামদির পুত্র ইয়াজ উদ্দিনের পরবর্তী প্রজন্মে আনফর ও ছিফতের নাম পাওয়া যায়। ১৮১৭ সালের দাওরাই এলাকার নিষ্কর রেকর্ডে আনফর ও ছিফতের বংশধরদের অস্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে, যা তাঁদের ঐতিহাসিক উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যদিকে, বিরাহিম (বিরামদি) স¤পর্কে পত্তনি রেকর্ড এবং শায়েস্তানগর পরগণার বসতিভূমির সনদসূত্রে তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া, ভূমি সনদ পরিচিতি গ্রন্থে ছনখাইর পরগণার একটি সনদে গ্রহীতা হিসেবে “শেখ বিরাহিম, পিতা শেখ সুনাম ফকির” এভাবে উল্লেখ রয়েছে। এসব পত্তনি রেকর্ড ও ভূমি-সনদ থেকে ধারণা করা যায় যে, সুনাম উদ্দিনের পুত্রগণ দাওরাই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁদের বংশধররা বিভিন্ন পরগণায় বিস্তৃত হন। বিশেষত, সুনামদির পুত্র বিরাহিমের শায়েস্তানগর পরগণায় বসতিভূমির উল্লেখ তাঁর স্থায়ী আবাস এবং বংশপরম্পরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাছাড়া, দাওরাই অঞ্চলের স্থানীয় গবেষক মহলও সুনামগঞ্জ নামকরণের ক্ষেত্রে দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর সুযোগ্য উত্তরসূরি শেখ সুনাম উদ্দিনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, “সুনামগঞ্জ” নামটির পেছনেও এই বংশধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্র নিহিত রয়েছে। (চলবে)