সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী যাদুকাটা ও মাহরাম নদী শুধু দুটি জলধারা নয়; এগুলো এ অঞ্চলের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, পর্যটন ও মানুষের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদী দুটির স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং নদীতীরবর্তী জনপদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এ বাস্তবতায় সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের কঠোর অবস্থান এবং অবৈধ বালু লুটকারীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যদি তাঁর নিজের দলের নেতা-কর্মী কিংবা আত্মীয়ও হন, তবুও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই বক্তব্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচায়ক। তবে শুধু বক্তব্য বা হুঁশিয়ারিতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; প্রয়োজন ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ।
অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে প্রভাবশালী মহল, অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাব খাটানো ব্যক্তি এবং স্থানীয় কিছু ভূমির মালিক জড়িত থাকার অভিযোগ নতুন নয়। অতীতে বহুবার অভিযান পরিচালিত হলেও কিছুদিন পর আবারও একই চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্ন থেকে যায় - আইনের প্রয়োগ কি সবার জন্য সমান হচ্ছে, নাকি প্রভাবশালীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে?
যাদুকাটা নদী বাংলাদেশের অন্যতম নান্দনিক নদীগুলোর একটি। প্রতি বছর হাজারো পর্যটক এর সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে সুনামগঞ্জে আসেন। অন্যদিকে মাহরাম নদী স্থানীয় মানুষের কৃষি ও জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তীরভাঙন, কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে।
এ কারণে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অভিযানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব যেন কাজ না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, নিয়মিত নজরদারি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
নদী রক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিকদেরও নৈতিক দায়িত্ব। তবে জনগণকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের কর্তব্য। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবর্তে প্রশাসনের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আমরা আশা করি, এমপি কামরুজ্জামান কামরুলের ঘোষিত কঠোর অবস্থান বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেবে। অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ নদী রক্ষা মানেই পরিবেশ রক্ষা, আর পরিবেশ রক্ষা মানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। যাদুকাটা ও মাহরাম নদীকে বাঁচাতে এখন আর প্রতিশ্রুতি নয় - প্রয়োজন দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ ও টেকসই উদ্যোগ।