উন্নয়ন মানেই মানুষের জীবনকে সহজ করা। কিন্তু সেই উন্নয়নকাজ যদি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দুর্বিষহ করে তোলে, তাহলে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রশ্ন সামনে চলে আসে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পুরানগাঁও থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত নির্মাণাধীন উড়াল সড়ক প্রকল্পে বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই একটি সেতু ও দুটি কালভার্ট ভেঙে ফেলার ঘটনা এমনই একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ।
প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প নিঃসন্দেহে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের মৌলিক নীতি হলো- কাজ চলাকালে জনভোগান্তি সর্বনি¤œ পর্যায়ে রাখা। অথচ এখানে সেই নীতির সুস্পষ্ট ব্যত্যয় ঘটেছে। বর্ষা মৌসুমে বিকল্প সড়ক বা ডাইভারশন ছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ছেন।
এই সড়ক শুধু একটি স্থানীয় রাস্তা নয়; এটি বিশ্বম্ভরপুর, ধনপুর, বাদাঘাটসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী এবং রোগী পরিবহন - সব ক্ষেত্রেই এর গুরুত্ব অপরিসীম। যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার ফলে সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি জরুরি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণেও অনাকাক্সিক্ষত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কোনো উন্নয়ন প্রকল্প মানুষের মৌলিক চলাচলের অধিকারকে এমনভাবে ব্যাহত করতে পারে না।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস মিলেছে। তবে প্রশ্ন হলো, এই ব্যবস্থা কাজ শুরুর আগেই কেন নেওয়া হলো না? প্রকল্প পরিকল্পনার সময় কি বর্ষা মৌসুম, স্থানীয় বাস্তবতা এবং মানুষের চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়নি? যদি বিবেচনায় আনা হয়ে থাকে, তাহলে বাস্তবায়নে এমন অব্যবস্থাপনা কেন ঘটল?
অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে- জনস্বার্থই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। উন্নয়নকাজের কারণে মানুষকে সাময়িক অসুবিধা মেনে নিতে হতে পারে, কিন্তু সেই অসুবিধা যেন অবহেলা, সমন্বয়হীনতা বা অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে অযথা দীর্ঘস্থায়ী না হয়। বিকল্প রাস্তা নির্মাণ, অস্থায়ী সেতু স্থাপন, পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমন্বয় - এসব বিষয় প্রকল্প বাস্তবায়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত।
বিশ্বম্ভরপুরের বর্তমান পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের জন্যও একটি শিক্ষা। উন্নয়নের গতি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন উন্নয়নের মান ও মানবিকতা। শুধু প্রকল্পের কাজ শেষ করাই সাফল্য নয়; কাজ চলাকালেও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যতটা সম্ভব সচল রাখা প্রশাসন, প্রকৌশলী এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমান দায়িত্ব।
আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে কার্যকর ডাইভারশন বা বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থা চালু করবে এবং বর্ষা মৌসুমে জনদুর্ভোগ কমাতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের সব অবকাঠামো প্রকল্পে এমন পরিস্থিতি এড়াতে পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করা হবে। উন্নয়ন মানুষের জন্য - মানুষকে দুর্ভোগে ফেলার জন্য নয়; এই সত্যটি বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে প্রতিফলিত হওয়াই এখন সময়ের দাবি।