স্টাফ রিপোর্টার::
লহাওরের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। আকাশ কালো হয়ে এলে, মেঘের গর্জন আর ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিলেও জীবিকার তাগিদে মাঠে কাজ চালিয়ে যান কৃষক-শ্রমিকরা। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে নেমে আসা বজ্রপাত কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ। প্রায়ই ঘটে যাওয়া এমন মর্মান্তিক ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে বর্তমানে হাওরাঞ্চল ও কৃষিপ্রধান জনপদে শতশত মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠছে ভয়ানক বজ্রপাত।
গতকাল রবিবার (২৮ জুন) আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস পালিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাতের তীব্রতা ও ঝুঁকি বাড়ছে। তবে প্রাণহানি কমানোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাঠপর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে সময়মতো আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে দেশে বজ্রপাতে মারা গেছেন ৩ হাজার ৮৬০ জন মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ২০২০ সালে, যখন ৪২৭ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ১৪ জুন পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩২ জন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জন, ২০২০ সালে ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন এবং ২০২৫ সালে ২৪৩ জন বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রতি এক হাজার বর্গকিলোমিটারে বজ্রপাতে মৃত্যুর হারে বাংলাদেশ শীর্ষে। বৈশ্বিক হিসাবেও বার্ষিক বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর সংখ্যায় ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর নিয়মিত বজ্রপাতের পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা দিলেও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা কৃষক, জেলে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশের কাছে সেই বার্তা সময়মতো পৌঁছায় না। অধিকাংশ সতর্কবার্তা গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ইন্টারনেটনির্ভর প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত হয়। অথচ মাঠে কাজ করা অনেক কৃষকের কাছে স্মার্টফোন নেই, অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। ফলে ঝুঁকির মুহূর্তেও তারা মাঠে অবস্থান করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত পূর্বাভাস প্রযুক্তি থাকলেও তা যদি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত পৌঁছানো না যায়, তাহলে প্রাণহানি কমানো কঠিন হবে। সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টোর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন মাঠের কৃষকরা। অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে তাদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আজও আবহাওয়া অফিসের সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কৃষক মাঠে কাজ করার সময় টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন না। ফলে অনেক সময় সতর্কবার্তা প্রচার হতে হতে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। রাশিম মোল্লার মতে, বজ্রপাতের হটস্পট এলাকাগুলোতে মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের মাইক বা কমিউনিটি পর্যায়ের ঘোষণার মাধ্যমে কৃষক ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বায়ুম-লে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে, ফলে বজ্রঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু বজ্রপাতের সংখ্যাই নয়, এর শক্তিও আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি আবহাওয়া অধিদপ্তরে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় রাইমসের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ খান মো. গোলাম রাব্বানী জানান, বর্তমানে ‘কন্টিনিউইং কারেন্ট’ বা দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ প্রবাহযুক্ত বজ্রপাতের ঘটনা বাড়ছে। এ ধরনের বজ্রপাত সাধারণ বজ্রপাতের তুলনায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ প্রবাহ বহন করে এবং এর তাপমাত্রা প্রায় ৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে গাছে আগুন লাগা বা বড় গাছ দ্বিখ-িত হওয়ার ঘটনাগুলোও এ ধরনের শক্তিশালী বজ্রপাতের ইঙ্গিত বহন করে।
তিনি আরও জানান, ‘পজিটিভ লাইটনিং’ বা শক্তিশালী ধনাত্মক বজ্রপাতের ঝুঁকিও বাড়ছে। এ ধরনের বজ্রপাত ঝড়ের মূল মেঘ থেকে অনেক দূরেও আঘাত হানতে পারে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ নামে পরিচিত।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, একসময় প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বেশি বজ্রপাত হতো। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়েই বজ্রপাত হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বর্ষাকালেও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে বজ্রমেঘ ও কালবৈশাখী ধরনের ঝড়।
রাইমসের গবেষণায় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বর্তমানে বজ্রপাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা দেশের অন্যতম বড় বজ্রপাতের ‘হটস্পট’। এছাড়া সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজারেও বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝিনাইদহ জেলাকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘কোল্ডস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গোলাম রাব্বানী বলেন, বজ্রপাত নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন মোবাইল ফোন, হাতঘড়ি বা রাবারের জুতা বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা দেয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ¯পর্শ করলে নিজেও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এসব ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তিনি বলেন, বজ্রধ্বনি শোনামাত্র খোলা জায়গা ছেড়ে নিরাপদ ভবনে আশ্রয় নিতে হবে। শেষ বজ্রধ্বনি শোনার পরও অন্তত ৩০ মিনিট নিরাপদ স্থানে থাকতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে বিদ্যুৎ জমা থাকে না, তাই দ্রুত উদ্ধার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিলে জীবন রক্ষা সম্ভব। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে এক থেকে চার ঘণ্টা আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে সেই তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারলে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এদিকে বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে এসএসটিএএফ। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা, দ্রুত পূর্বাভাস মাঠপর্যায়ে প্রচারের ব্যবস্থা করা, কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রশিক্ষণের আয়োজন, মাঠে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
লহাওরের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। আকাশ কালো হয়ে এলে, মেঘের গর্জন আর ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিলেও জীবিকার তাগিদে মাঠে কাজ চালিয়ে যান কৃষক-শ্রমিকরা। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে নেমে আসা বজ্রপাত কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ। প্রায়ই ঘটে যাওয়া এমন মর্মান্তিক ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে বর্তমানে হাওরাঞ্চল ও কৃষিপ্রধান জনপদে শতশত মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠছে ভয়ানক বজ্রপাত।
গতকাল রবিবার (২৮ জুন) আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস পালিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাতের তীব্রতা ও ঝুঁকি বাড়ছে। তবে প্রাণহানি কমানোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাঠপর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে সময়মতো আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে দেশে বজ্রপাতে মারা গেছেন ৩ হাজার ৮৬০ জন মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ২০২০ সালে, যখন ৪২৭ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ১৪ জুন পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩২ জন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জন, ২০২০ সালে ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন এবং ২০২৫ সালে ২৪৩ জন বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রতি এক হাজার বর্গকিলোমিটারে বজ্রপাতে মৃত্যুর হারে বাংলাদেশ শীর্ষে। বৈশ্বিক হিসাবেও বার্ষিক বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর সংখ্যায় ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর নিয়মিত বজ্রপাতের পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা দিলেও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা কৃষক, জেলে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশের কাছে সেই বার্তা সময়মতো পৌঁছায় না। অধিকাংশ সতর্কবার্তা গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ইন্টারনেটনির্ভর প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত হয়। অথচ মাঠে কাজ করা অনেক কৃষকের কাছে স্মার্টফোন নেই, অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। ফলে ঝুঁকির মুহূর্তেও তারা মাঠে অবস্থান করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত পূর্বাভাস প্রযুক্তি থাকলেও তা যদি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত পৌঁছানো না যায়, তাহলে প্রাণহানি কমানো কঠিন হবে। সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টোর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন মাঠের কৃষকরা। অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে তাদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আজও আবহাওয়া অফিসের সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কৃষক মাঠে কাজ করার সময় টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন না। ফলে অনেক সময় সতর্কবার্তা প্রচার হতে হতে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। রাশিম মোল্লার মতে, বজ্রপাতের হটস্পট এলাকাগুলোতে মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের মাইক বা কমিউনিটি পর্যায়ের ঘোষণার মাধ্যমে কৃষক ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বায়ুম-লে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে, ফলে বজ্রঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু বজ্রপাতের সংখ্যাই নয়, এর শক্তিও আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি আবহাওয়া অধিদপ্তরে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় রাইমসের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ খান মো. গোলাম রাব্বানী জানান, বর্তমানে ‘কন্টিনিউইং কারেন্ট’ বা দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ প্রবাহযুক্ত বজ্রপাতের ঘটনা বাড়ছে। এ ধরনের বজ্রপাত সাধারণ বজ্রপাতের তুলনায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ প্রবাহ বহন করে এবং এর তাপমাত্রা প্রায় ৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে গাছে আগুন লাগা বা বড় গাছ দ্বিখ-িত হওয়ার ঘটনাগুলোও এ ধরনের শক্তিশালী বজ্রপাতের ইঙ্গিত বহন করে।
তিনি আরও জানান, ‘পজিটিভ লাইটনিং’ বা শক্তিশালী ধনাত্মক বজ্রপাতের ঝুঁকিও বাড়ছে। এ ধরনের বজ্রপাত ঝড়ের মূল মেঘ থেকে অনেক দূরেও আঘাত হানতে পারে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ নামে পরিচিত।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, একসময় প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বেশি বজ্রপাত হতো। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়েই বজ্রপাত হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বর্ষাকালেও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে বজ্রমেঘ ও কালবৈশাখী ধরনের ঝড়।
রাইমসের গবেষণায় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বর্তমানে বজ্রপাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা দেশের অন্যতম বড় বজ্রপাতের ‘হটস্পট’। এছাড়া সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজারেও বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝিনাইদহ জেলাকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘কোল্ডস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গোলাম রাব্বানী বলেন, বজ্রপাত নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন মোবাইল ফোন, হাতঘড়ি বা রাবারের জুতা বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা দেয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ¯পর্শ করলে নিজেও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এসব ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তিনি বলেন, বজ্রধ্বনি শোনামাত্র খোলা জায়গা ছেড়ে নিরাপদ ভবনে আশ্রয় নিতে হবে। শেষ বজ্রধ্বনি শোনার পরও অন্তত ৩০ মিনিট নিরাপদ স্থানে থাকতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে বিদ্যুৎ জমা থাকে না, তাই দ্রুত উদ্ধার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিলে জীবন রক্ষা সম্ভব। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে এক থেকে চার ঘণ্টা আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে সেই তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারলে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এদিকে বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে এসএসটিএএফ। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা, দ্রুত পূর্বাভাস মাঠপর্যায়ে প্রচারের ব্যবস্থা করা, কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রশিক্ষণের আয়োজন, মাঠে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা।