সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা আবারও আন্দোলনে নেমেছেন। হাসপাতাল চালুর দাবিতে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বিষয়টি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি একটি জেলার স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা এবং হাজারো মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
২০২১ সালে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু হলেও পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কলেজ হাসপাতালের কার্যক্রম চালু হয়নি। অথচ একটি মেডিকেল কলেজের প্রাণই হলো তার শিক্ষণ হাসপাতাল। সেখানে রোগী, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে চিকিৎসা শিক্ষার বাস্তব ক্ষেত্র। হাসপাতাল ছাড়া মেডিকেল শিক্ষা অনেকটাই তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন এবং ভবিষ্যতে দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন নয়। গত বছরও তারা একই দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন। তখন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জুন ২০২৬ সালের মধ্যে হাসপাতাল চালুর আশ্বাস দিয়েছিল। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করে ক্লাসে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে এলেও হাসপাতাল চালুর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তারা আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও অনাস্থা সৃষ্টি করে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
অন্যদিকে শিক্ষক সংকটও সমানভাবে উদ্বেগের বিষয়। ৭৪টি পদের বিপরীতে মাত্র ৩৮ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন এবং কয়েকটি বিভাগে কোনো শিক্ষকই নেই। আধুনিক চিকিৎসা শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ অপরিহার্য। ভবন নির্মাণ করেই একটি মেডিকেল কলেজকে কার্যকর করা যায় না; প্রয়োজন প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি এবং হাসপাতালভিত্তিক সেবা কার্যক্রম।
সুনামগঞ্জ একটি হাওরবেষ্টিত ও ভৌগোলিকভাবে বিশেষ চ্যালেঞ্জপূর্ণ জেলা। এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নত চিকিৎসাসেবার জন্য সিলেটমুখী হতে বাধ্য হন। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি চালু হলে শুধু মেডিকেল শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবেন না, জেলার লাখো মানুষও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে রোগীদের দুর্ভোগ কমবে এবং স্বাস্থ্যখাতের ওপর জনসাধারণের আস্থাও বাড়বে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেবল দাবি আদায়ের কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত একটি ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবির বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তাদের শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করা।
আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালুর সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা। একই সঙ্গে শিক্ষক সংকট নিরসন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং ক্লিনিক্যাল শিক্ষা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমরা চাই, সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হোক। হাসপাতালের নির্মিত ভবন যেন আর অব্যবহৃত না থাকে। জেলার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের স্বার্থে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখনই চালু করা সময়ের দাবি।