বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদন, মৎস্যস¤পদ, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু সহনশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অথচ প্রতিবছর আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, যোগাযোগ সংকট ও দারিদ্র্যের মতো বহুমাত্রিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় এ অঞ্চলের লাখো মানুষকে। এমন বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে হাওরাঞ্চলের জন্য জলবায়ু অভিযোজন ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।
বাজেট দলিলে দেখা যায়, হাওর ও জলবায়ু সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষভাবে টাঙ্গুয়ার হাওরের সহব্যবস্থাপনা প্রকল্প পুনরায় চালুর ঘোষণা পরিবেশবিদ, গবেষক এবং স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিঠাপানির জলাভূমি হিসেবে টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবিকা ও সংস্কৃতির অংশ। অতীতে প্রকল্পটির ইতিবাচক প্রভাব থাকলেও পরবর্তীতে ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা ও অংশীজনদের সমন্বয়ের অভাব দেখা দিয়েছিল। নতুন করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ করা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ইকোসিস্টেমভিত্তিক অভিযোজন (ইবিএ) প্রকল্পে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হাওরে বন্যা, খরা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। তাই প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে অভিযোজনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ বর্তমান সময়ের দাবি। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, স্থানীয় জ্ঞান, গবেষণা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
হাওর অঞ্চলের জন্য জলবায়ু সহনশীল আবাসন, এলিভেটেড সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়ন, নদী পুনরুজ্জীবন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পগুলোও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে উন্নত করার পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত। কারণ প্রতিবছর বন্যার সময় হাওরের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
তবে বরাদ্দের অঙ্ক যত বড়ই হোক, সফলতার মূল চাবিকাঠি বাস্তবায়নে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, হাওর উন্নয়নের নামে অনেক প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি, নি¤œমানের কাজ এবং দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা অনেক সময় কাক্সিক্ষত সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই এবার প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাওর উন্নয়নকে কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। মৎস্যস¤পদ সংরক্ষণ, কৃষির আধুনিকায়ন, হাঁস পালন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে একটি সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় মৎস্যজীবী পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তও ইতিবাচক, তবে তা যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
জাতীয় বাজেটের এই বরাদ্দ হাওরবাসীর জন্য আশার বার্তা। কিন্তু কাগজে-কলমে বরাদ্দ নয়, প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন। হাওরকে দেশের উন্নয়নের মূলধারায় আনতে হলে প্রকল্পভিত্তিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার ভিত্তিতে এগোতে হবে। তাহলেই হাওর হবে শুধু দুর্যোগের প্রতীক নয়, বরং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নের এক সফল মডেল।