রাজনীতি বনাম দলীয় রাজনীতি

আপলোড সময় : ০৮-০৬-২০২৬ ১১:৪৫:৫১ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৮-০৬-২০২৬ ১১:৪৭:৪৪ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ আব্দুল হক::
রাজনীতি সকলে কতোটা বুঝতে পারি কিংবা সামান্যও বুঝতে পারছি কি না তারচেয়ে বড়ো সত্য হলো আমরা কোনো-না কোনোভাবে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে থাকি। দেশে দেশে আমাদের যে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ঘটে বিভিন্ন বিষয়ে তা রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে নয়। বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি রাজনীতি কেন্দ্রিক। যদিও সামরিক শক্তি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির একটা শক্তিশালী ভূমিকা রাজনীতির বিশাল ক্যানভাসে দাপটের সাথে কখনও কখনও রাজনীতিকে প্রভাবিত করে চলেছে, তবুও কৌশলে রাজনীতিই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। এখানে ‘রাজনীতি’ ও ‘দলীয় রাজনীতি’ একটি থেকে অপরটির দূরত্ব কতোটুকু আবার মিল কতোটুকু তা খুঁজে নিতে চেষ্টা করবো। রাজনীতিতে জনগণতো আছেই। জনগণের জন্য রাজনীতির দরকার আছে। তা না-হলে কেবলই নানামুখী বিশৃঙ্খলায় উন্নত প্রাণী হিসেবে পশু পাখি সরীসৃপ থেকে মানুষের আলাদা বৈশিষ্ট্য ফুটে না। এখানে জটিলতার দিকে না-গিয়ে দেখি রাজনীতির সংজ্ঞা আমাদেরকে কি বলতে চায়। আধুনিক বিশ্বে জ্ঞানী মানুষের কথা গ্রহণ করে এগুতে হয়। যেভাবে পাই, বহুল আলোচিত শব্দ ‘রাজনীতি’ (চড়ষরঃরপং) শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ চড়ষরং (পলিস) থেকে, যার অর্থ ‘নগর-রাষ্ট্র’। সাধারণ অর্থে, সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি, কৌশল এবং প্রক্রিয়াই হলো রাজনীতি। তবে ব্যাপক অর্থে, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ এবং সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসন ও সমন্বয় সাধনের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকরণকে রাজনীতি বলা হয়। সহজ কথায়, কার হাতে ক্ষমতা থাকবে আর সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং এর মাধ্যমে নাগরিকরা কী সুবিধা কতোটুকু পাবে তা সঠিকভাবে নির্ধারণের ব্যবস্থাপনাই হলো রাজনীতি। বর্তমানে রাজনৈতিক দল ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করা কল্পনা করা যায় না। কাজেই রাজনীতি ও দলীয় রাজনীতি নিয়ে সাধারণ আলোচনা করে বিষয়টি নিয়ে সাধারণ ধারণা পেতে পারি। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে রাজনীতির সংজ্ঞা আমাদের সামনে এসেছে। আমরা যাতে রাজনীতিকে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি সেজন্য বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিখ্যাত চিন্তাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা দিয়েছেন। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তিনি মনে করেন, ‘মানুষ স্বভাবগতভাবেই একটি রাজনৈতিক জীব।’ এখানে তিনি রাজনীতিকে মানব কল্যাণের সর্বোচ্চ একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন, যা সমাজের সবার জন্য একটি সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক জীবন নিশ্চিত করে। আবার আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড ইস্টনের মতে, ‘রাজনীতি হলো মূল্যের কর্তৃত্বস¤পন্ন বরাদ্দ।’ অর্থাৎ সমাজের সীমিত সম্পদ এবং সুযোগ-সুবিধা নাগরিকদের কার মধ্যে কীভাবে বণ্টন করা হবে তার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াই হলো রাজনীতি। জানতে পারি, হ্যারল্ড লাসওয়েলের একটি বিখ্যাত বইয়ের নামেই রাজনীতির সংজ্ঞা লুকিয়ে আছে, ‘রাজনীতি হলো কে, কী, কখন এবং কীভাবে পায় তার নির্ধারণ।’ আমাদের আলোচনায় রাজনীতি ও দলীয় রাজনীতি প্রসঙ্গ। যদিও আমরা ‘রাজনীতি’ ও ‘দলীয় রাজনীতি’ বিষয় দুটিকে আমরা দৈনন্দিন জীবনে অনেক সময় এক করে ফেলি, কিন্তু তত্ত্বগত দিকে এবং বাস্তবিকভাবে এদের মধ্যে গভীর ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সংক্ষেপে ও সহজ কথায় বোঝার জন্য বলতে পারি, রাজনীতি হলো একটি বিশাল ক্যানভাস, আর দলীয় রাজনীতি হলো সেই বিশাল ক্যানভাসের একটি খুবই ছোটো অংশ। দলীয় রাজনীতির মতো ছোটো মাধ্যমে রাজনীতির অল্প জ্ঞান নিয়ে অধিকাংশ শ্রেণি পেশার চতুর মানুষকে শুধু দলের নেতা ও দল নিয়ে লম্ফঝম্প করতে দেখা যায়। এরা প্রকাশ্যে খুব দেশের কথা বললেও বাস্তবে এরা বিভিন্নভাবে দলের নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দলীয় পদ পদবী এবং আর্থিক ও ক্ষমতার সুবিধা পেতে মিছিল স্লোগান ইত্যাদি কর্মে ব্যস্ত থাকে। তবে বাক্যের দ্বারা রাজনীতি ও দলীয় রাজনীতির কিছু পার্থক্য দেখতে পাই - পরিধি বিবেচনায় নিলে দেখা যায় ‘রাজনীতি’ শব্দের পরিধি অনেক বিস্তৃত। এখানে রাজনীতি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতি নির্ধারণ, নাগরিক অধিকার রক্ষা করা, সমাজসেবা সর্বোপরি সামষ্টিক কল্যাণের একটি প্রক্রিয়া হলো রাজনীতি। এভাবেই একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে রাজনীতিতে। আর দলীয় রাজনীতির পরিধি ততোটা বিস্তৃত নয়। বরং দলীয় রাজনীতি হলো কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ, কর্মসূচি বাস্তবায়নের লড়াই। মূলত দলীয় রাজনীতির উদ্দেশ্য থাকে দলকে শক্তিশালী করে নির্বাচন কিংবা অন্য কোনো উপায়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা অর্জন করা। দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ‘রাজনীতি’ কোনো বিশেষ একক ব্যক্তি বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থকে নয় বরং সাধারণ জনগণের স্বার্থকে সবকিছুর উপরে রাখা হয়। এক্ষেত্রে একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদের আনুগত্য থাকে রাষ্ট্রের সংবিধান ও জনগণের প্রতি। পাশাপাশি দলীয় রাজনীতিতে অনেক সময়ই দেশের চেয়ে দলের স্বার্থ বা দলীয় শৃঙ্খলা বড়ো হয়ে উঠে এবং দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রধান আনুগত্য থাকে দলের প্রধান বা দলের সিদ্ধান্তের প্রতি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটাই দেখা যায় যে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলেও দলের প্রধানের সিদ্ধান্তের বাইরে দলের সমর্থকরা সোচ্চার হন না। এভাবে আরও অনেক বিষয় আছে। যেমন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন বা দুর্নীতি রোধ করার জন্য নীতি তৈরি করা এবং তা নিয়ে ভাবা হলো রাজনীতি। আর সেই নীতিটিকে নিজের দলের কৃতিত্ব হিসেবে প্রচার করা বা বিরোধী দলের নীতিকে অন্ধভাবে সমালোচনা করা হলো দলীয় রাজনীতি। এ বিষয়টি খুব প্রকাশ্যে আলোচনায় আসে। একেবারে সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে পারি, ‘রাজনীতি’ শব্দের মূল হলো একটি মহান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, যার উদ্দেশ্য জনকল্যাণ। আর ‘দলীয় রাজনীতি’ হলো সেই ক্ষমতা ও আদর্শ বাস্তবায়নের একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম। যদিও দলীয় রাজনীতি ছাড়া আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কল্পনা করা খুবই কঠিন, কিন্তু সংঘাত সেখানেই প্রকট আকার ধারণ করে, দলীয় স্বার্থ যখন জাতীয় স্বার্থকে ছাড়িয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে যখন ঘটে তখনই ব্যাপক বিস্তৃত রাজনীতি তার আসল সৌন্দর্য ও উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে। যে কথাটি সত্য বলে জানতে হবে, একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদ দলের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের দেশের কথা ভাবেন। আর একজন দলীয় কর্মী সবসময় ব্যস্ত থাকেন তার দলের ইশতেহার নিয়ে আর তার ব্যস্ততা থাকে তার দলের নেতার নির্দেশ পালনে। স্বাভাবিকভাবে মনে হবে ‘রাজনীতি’ এবং ‘দলীয় রাজনীতি’ মনে হয় একই। কিন্তু একটু গভীরে খুঁজে দেখা যায় এদের গভীরতা, উদ্দেশ্য এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশাল বড়ো পার্থক্য থেকে যায়। সম্পূর্ণ রাজনীতি বা দলীয় রাজনীতি সম্পর্কে এখানে এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তুলে ধরা সম্ভব নয় এবং আমার লেখার উদ্দেশ্য সেটা না। মূলত ‘রাজনীতি’ ও ‘দলীয় রাজনীতি’ বিষয় দুটি যে এক নয় সেটাই বুঝতে হবে এই লেখার মাধ্যমে। সহজ কথায়, রাজনীতি যদি হয় একটি বিশাল আকাশ, তবে দলীয় রাজনীতি হলো সেই আকাশের এক টুকরো মেঘ। আবার এভাবেও বলা যায়, ‘রাজনীতি’ যদি হয় মহাসাগর, তবে ‘দলীয় রাজনীতি’ সেখানে এক কলসি জল। এ সম্পর্কিত ধারণা আমাদের যতো তাড়াতাড়ি স্পষ্ট হবে, ততো তাড়াতাড়ি আমাদের রাজনীতি ও দলীয় রাজনীতি সমৃদ্ধ হবে এবং দেশ সমৃদ্ধ হবে।
[লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com