1. [email protected] : admin2017 :
  2. [email protected] : Sunam Kantha : Sunam Kantha
  3. [email protected] : wp-needuser : wp-needuser
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ০১:০৬ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

রাসেল ভাইপার : হাওরের গ্রামে সাপ ও জীবজন্তু মারার ‘অমানবিক’ উৎসব নিয়ে স্মৃতিচারণ

  • আপডেট সময় বুধবার, ২৬ জুন, ২০২৪

শামস শামীম ::
হাওরাঞ্চলে বর্ষায় নানান উৎসব হয়। পৌরাণিক কেচ্চা, পালা-পার্বণ, কুস্তি, হাডুডুডুসহ রঙিন খেইড়ের জমাট আসর বসে। এসব মানবিক উৎসবের সঙ্গে ‘অমানবিক’ উৎসবও হয়। হাওর অঞ্চল থেকে সেইসব স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি। বিশেষ করে গ্রামীণ মানুষজন এখনো নীরবে এই সময়েÑ সেই সময়ের স্মৃতির জাবর কাটেন। আশির দশকে জন্ম নেওয়া আমাদের স্মৃতিও সেইসব দিনের লাই খেলে মনের নদীতে।
সম্প্রতি মিডিয়ায় রাসেল ভাইপার নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটছে। কেন্দ্র থেকে প্রান্ত সাংবাদিক ও কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাংবাদিকও মওকা বুঝে রাসেল ভাইপার নিয়ে আজগুবি গল্পগুজব ফাঁদছে। অথচ বর্ষা বা বন্যার সময় হাওরাঞ্চলের নদী-নালায় বাড়ির আঙ্গিনায় সাপÑজীবনের সঙ্গে সাপলুডু খেলায়। বন্যার পানি নামার শুরুর পরই ভ্যাপসা গরম দেয়। উৎকট গন্ধ নাকে লাগে। বাসাবাড়ির স্যাঁতস্যাঁতে অবস্থা দূর হয় গরমে। এসময় সাপ ভেসে বেড়ায় হাওরে, কান্দায় বাড়ির জলথৈথৈ আঙ্গিনায়। মূলত সাপের যে নির্দিষ্ট আবাসস্থল আছে সেটাও বানের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেরিয়ে পড়ে সাপ। সাপের সঙ্গে গ্রামীণ জঙ্গলের জীবজন্তুও বাস্তুসংস্থান হারিয়ে মানুষের েেখড়ের ঘর, পতিত ঘরে আশ্রয় নেয়।
বর্ষায় বসতবাড়ির আঙ্গিনায় টিনের ঘণ্টা রাতে বাজিয়ে সাপ তাড়ানোর চেষ্টা করেন লোকজন। রসুনও ছিটিয়ে দিতেন। সারারাত তারা এভাবে থেমে থেমে সাপ যাতে বাড়িতে এসে হানা না দেয় সেই চেষ্টাই করেন। নিয়তিবাদী মানুষের মধ্যে লোকায়ত নানা বিশ্বাসও কাজ করতো। মসজিদের আঙ্গিনায়, গোরস্থানে বা পবিত্র স্থানে বিষধর সাপ দেখলেও মানুষজন মারতো না। বলতেন এগুলো ‘ফর দেয়’ বা প্রহরীর কাজ করে। তার বাদেও বর্ষা মওসুমে অসাবধানে সাপের কামড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটতো। এখনো ঘটে। তবে সেই আচারাদি আছে কি না জানিনা।
বর্ষার ওই সময় আরেকটি চিত্র লক্ষণীয় ছিল। লাঠি সোটা, ঝাটা, সুলফি, কুছা নিয়ে ছেলে বুড়ো সবাই সাপ মারতে বের হতেন। একটি সাপ পানিতে নেচে নেচে ভাটিতে বা উজান কেটে আসতে চাইলে নাও নৌকায় দল বেঁধে সাপের উপর হামলা চলতো। আমি নিজেও কৈশোরে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে এভাবে সাপ মারার উৎসবে শরিক হয়েছি। নানান জাতের সাপ বানের সময় প্লাবিত এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। আলদ সাপ, নগাই সাপ, অজগর সাপ, ডোরা সাপ, উলুবুড়াসহ বিষধর ও কম বিষধর সাপ বন্যার সময় দেখতাম। তখন উৎসবের আমেজে মানুষজন সাপ মারতো। ঝাটার আগায় বিদ্ধ করে নারকীয় উল্লাস করতো। এমন উল্লাসের কয়েকটি তরতাজা স্মৃতি এখনো আমার আছে। তবে আগের মতো এখন আর সাপ নেই, তাই এমন অমানবিক উৎসবও দেখা যায়না। তবে বর্ষায় চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী এখনো সাপ সাঁতার কাটে, থৈথৈ পানিতে ভেসে বেড়ায়।
বন্যার সময় বাস্তুসংস্থান হারিয়ে মেছোবাঘ, শিয়াল বিপন্ন হয়ে পড়তো। বিড়ালের মতো দেখতে ভয়ানক প্রাণীকে আমরা শৈশবে ‘টলা’ ডাকতাম। প্রতিটি গ্রামেই বনজঙ্গল ছিল। দিনে সেসব স্থানে যেতে ভয় পেতো মানুষ। ভয় ও মিথের নানা গল্প আছে এমন বনজঙ্গল ঘিরে। তবে গ্রামীণ সেইসব বাগান বনবিভাগ ও প্রশাসনের উদাসীনতায় বিলীন হয়ে গেছে। প্রতি বছর মসজিদ, মন্দিরের নামে অলিখিত ইজারা দিয়ে ওয়াটারলর্ডদের কাছে জঙ্গল বিক্রি করা হয়। তারা নির্বিচারে বৃক্ষ কাটে, বৃক্ষ নিধন করে। মসজিদ, মন্দির ও আখড়ার নামে জঙ্গল উজাড় করে। যাক হাওরের এই চিত্রটি অন্য আলাপ। অন্য কোন লেখায় বলা যাবে।
বর্ষা বা বন্যায় গ্রামীণ সেই ভূতুড়ে জঙ্গল ডুবে গেলে বনজঙ্গলে থাকা পশুরা বিপন্ন হয়ে পড়তো। তারা সাময়িক বাস্তুচ্যুত হতো। তাই আশ্রয় নিতে খড়ের ঘরে, পরিত্যক্ত ঘরসহ মানুষের আবাসস্থলের গোপন স্থানে। সেই বিপন্ন দশা প্রত্যক্ষ করে গ্রামের মানুষ দেশিয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জঙ্গলে দঙ্গল বেধে হানা দিতো। পিটিয়ে, সুলফি ও কোচের আঘাতে হত্যা করতো পশুদের। পরে সেগুলো সুলফির আগায়, বর্ষার মাথায় বেঁধে গ্রামে প্রদর্শন করতো। আমরা শিশুরা সেই দৃশ্য দেখে পুলকিত হতাম। যারা এসব করতো তাদের আমরা ‘বীর’ হিসেবে ভাবতাম। তাদের আলাদা সম্মানও ছিল। তাদের মধ্যে হিরোইজমও কাজ করতো। দুই তিন দশক আগে আমার গ্রামে ও আশপাশের গ্রামে এমন একাধিক দানবীয় উৎসবের সাক্ষী ছিলাম আমি।
এখন আর আগের বন জঙ্গল নাই, নাই পশুপাখি সাপ বিচ্ছু। তাই বর্ষাকালীন দানবীয় উৎসব আগের মতো দেখা যায়না। তবে দুই বছর আগে টাঙ্গুয়ার হাওরে বর্ষায় এমন একটি দৃশ্য দেখা গেছে। শাল্লার একটি আখড়ায় বনজঙ্গল কেটে পশুপাখি হত্যা করতে দেখা গেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে মেছো বাঘ পনির কারণে লোকালয়ে আসায় ২০২১ সালের জুন মাসে উৎসব করে পিটিয়ে মেরেছিল জনতা। মারার পর প্রাণীকে বর্ষাবিদ্ধ করে প্রদর্শন করে উল্লাস প্রকাশ করেছিল তারা। ঐতিহ্য রক্ষা করতেই তারা নতুন প্রজন্মকে নিয়ে এমন উৎসবে মেতেছিল।
এক গবেষণায় জানা গেছে বাংলাদেশে আবাসন, শিল্পায়নসহ নানা কারণে বনজঙ্গল গাছ কাটায় দেশীয় বণ্যপ্রাণী হুমকিতে পড়েছে। দুই যুগে ২২ প্রজাতির বণ্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্য মতে দেশের ৫১টি সংরক্ষিত বনাঞ্চল আছে। বণ্যপ্রাণী রক্ষায় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার জন্য প্রস্তাবনা দিয়েছে তারা।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও বাংলাদেশের ১৪ গবেষকদলের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে- বাংলাদেশের সংরক্ষিত বন নিয়মিত সংকুচিত হচ্ছে। আগের মতো সংরক্ষিত এলাকায় বণ্যপ্রাণী দেখা যাচ্ছেনা। এই গবেষণা উদ্বেগের।
এখন রাসেল ভাইপার নিয়ে যে মাতামাতি চলছে এটা মূলত মূল মিডিয়া ও সামাজিক মিডিয়ার তাৎক্ষণিক ইভেন্ট। জাতিগতভাবে আমরা হুল ও স্থুল কর্মকা-ে ঝাপিয়ে পড়ি। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগায় সুযোগসন্ধানীরা।
গ্রাম বাংলার বর্ষায় সাপের এমন বিচরণ আগেও ছিল। লাইভ প্রচারের বিকাশ ছিলনা বলেই আমাদের কাছে নতুন ঠেকছে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com