1. [email protected] : admin2017 :
  2. [email protected] : Sunam Kantha : Sunam Kantha
  3. [email protected] : wp-needuser : wp-needuser
সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১০:৫৯ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

আজীবন শিক্ষার্থী প্রতিদিনের পরীক্ষার্থী একজন আইনজীবী 

  • আপডেট সময় রবিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৪
শহীদুজ্জামান চৌধুরী অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশে আইনজীবীর গুরুত্ব কার্যক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়েছে এক এগারো সরকারের সময়ে। সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ার তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে। সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীকে দ্বারস্থ হতে হয়েছে আইনজীবীর। দুই বিপরীতমুখী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে আইনী প্রতিকার দিয়েছে আইনজীবী। ব্যারিস্টার রফিকুল হক এজন্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন দীর্ঘকাল। সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়েই অনেক মামলার আসামি হন। আশ্রয়স্থল ছিল আইনজীবীর সহায়তা। কোনো কোনো মামলায় শাস্তি হলে আপিলে মুক্ত থাকেন, কোনো কোনো মামলা অনিষ্পত্তিকৃত অবস্থায় হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ইহলোক ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রনায়কদের এহেন পরিস্থিতির আলোকে নিঃসন্দেহে বলা যায় আইনজীবীর প্রয়োজন পদে পদে আইনজীবীর সম্মান সর্বোচ্চ। বাম দর্শনে আইনপেশাকে অনুৎপাদনশীল খাত হিসেবে দেখা হলেও আইনের শাসনবেষ্টিত সভ্য সমাজে আইনজীবীর প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা যায় না।
বাল্যকালে পারিপার্শ্বিকতায় মনে একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, ল’ পাশ মানে পড়াশুনার চূড়ান্ত পাশ। আর বুঝি লেখাপড়া না করলেও চলবে। বাস্তব জীবনে এসে দেখছি ল’পাশ করে সনদ নিয়ে আইনজীবী হয়ে গেলেই পড়াশুনার ল্যাটা চুকে যায় না। বলা যায়, আইনজীবী হয়ে আইনের জগতে পা রেখে আজীবন পড়াশুনার গেইট পাস নেয়া হয়। ‘আইনাঙ্গনের নক্ষত্র’ বলে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত প্রয়াত এসআর পাল সাহেবের প্রসঙ্গ স্মরণ করা যায়। সুপ্রিমকোর্টের অ্যাডভোকেট (১/১১ সময়কালের) অতিরিক্ত এটর্ণি জেনারেল মনসুর হাবিব সাহেবের প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী হিসেবে এত উচ্চতর স্থানে অধিষ্ঠিত হবার মন্ত্র সম্পর্কে জানিয়েছেন, ‘আরে বাবারে। কিভাবে আবার, পড়াশুনা করে।’ কী ধরনের বই পড়েছেন সে প্রশ্নের জবাবে পাল সাহেব বলতেন, ‘তবে শুনো, উকিল হয়ে যোগ দিলাম সিলেট বারে। সিলেট বার লাইব্রেরিটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। অনেক বড় লাইব্রেরি, বহু বই। আমি যে পাঁচ বছর সিলেটে ছিলাম সব ক’টা বই প্রায় শেষ করে ফেলেছিলাম।’ পাল সাহেব পঠিত বইয়ের নাম লেখকের নামশুদ্ধ বলে দিতে পারতেন। সিলেট বার লাইব্রেরিতে তার পড়াশুনার উল্লেখযোগ্য বই ছিলো ‘ট্যাগর ল’ লেকচার।’ পাল সাহেব আইনের নীতিমালা অনুধাবনের চেষ্টা করতেন আগে।
ভালো আইনজীবী হতে হলে শুরুতেই পথিকৃত আইনজীবীদের জীবন ও জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে জানতে পারলে উত্তম হয়। সে রকম বাসনা থাকা সত্ত্বেও যথাসময়ে হাতের লাগালে উপযোগী বই না পাওয়ায় সে বাসনা অপূরণই থেকে গেছে বলা যায়। এক সময় চাইলেই উপাদেয় সেরকম বই বাজারে সহজলভ্য ছিল না। আমি আশির দশকের কথা বলছি।
খোশরোজ কিতাব মহল প্রকাশিত খুলনার অ্যাডভোকেট এএফএম আব্দুল জলিল লিখিত ‘আমার দেখা আইন-আদালত’ নামক একটি ছোট বই আইনের ছাত্র থাকাবস্থায় ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে সংগ্রহ করি। ১১টি প্রবন্ধ সমৃদ্ধ ১১১ পৃষ্ঠার বইটিতে ‘আইনের ত্রুটি ও আইনের শাসন’ নামক প্রবন্ধে রয়েছে এই দূরদর্শী আইনজীবীর উপলব্ধি ও স্বপ্নের কথা। তিনি লিখেছেন ‘বিচার ব্যবস্থাকে সহজলভ্য করতে হলে যেমন থানা আদালত স্থাপন করা প্রয়োজন তেমনি প্রত্যন্ত এলাকায় অর্থাৎ রাজধানী হতে দূরবর্তী কোন শহরে সুপ্রিমকোর্টের শাখা স্থাপন করা উচিত।’ জলিল সাহেবের এ লেখা ছাপা ব্য স্বপ্নের কথা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হয় ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ স্বাধীনতার সাধ পূরণে নতুন কিছু প্রদর্শনের একান্ত ইচ্ছায় প্রথমে মানউন্নীত (আপগ্রেডেড) খানা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে পুলিশ ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়। আগে সিনিয়র এস আই কে এ পদে দেয়া হত। থানা প্রশাসন সংস্কারের পরপরই গঠন করা হয় আপগ্রেডেড থানা ম্যাজিস্ট্রেট ও থানা মুনসেফ কোর্ট অতঃপর নাম ধার্য করে স্থাপিত হয় উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ও উপজেলা মুনসেফ কোর্ট। সমসাময়িক সময়ে হাইকোর্ট বিভাগের ৬টি বেঞ্চ রংপুর, যশোর, বরিশাল, চিটাগাং, কুমিল্লা, সিলেট তথা মফস্বল শহরে স্থাপন করা হয়। শ্রেণি স্বার্থের কারণে সেগুলো আর টেকসই হয়নি। আমাদের বিচারাঙ্গনের জাতীয় দুর্ভোগ যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে যায়। আমি হলফ করে বলতে পারি উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ও উপজেলা মুন্সেফ কোর্ট হঠকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রত্যাহার করে জেলা সদরে না আনা হলে আজকে সর্বত্র মামলার অলংঘনীয় জট সৃষ্টি হতো না। উপজেলা শহরগুলো আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো। রাজধানীমুখো জনসংখ্যার চাপ কমতো। মানুষের মাঝে অকারণে রাজধানীমুখী হবার মানসিকতা কমে যেতো।
বলছিলাম হাত বাড়াতেই আইনজীবী ও আদালত বিষয়ক প্রয়োজনীয় বই না পাবার কথা। শংকর লিখিত ‘কত অজানারে’ এ সম্পর্কিত উপন্যাস আলোকে কলকাতা কেন্দ্রীক আকর গ্রন্থ বলা যায়। সেতো পুরানো হয়ে গেছে। বিষয়বস্তু কলকাতা কেন্দ্রীক। আমরাতো এখন আর কলকাতা কেন্দ্রীক নই। নব্বই এর দশকে বাজারে আসে গাজী শামছুর রহমানের ‘বিচারক জীবনের স্মৃতিচারণ’। গাজী সাহেব আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সুযোগ না পেয়েও আইনজীবী এবং বিচারকের মন, মনন, মানসিকতা, সাংস্কৃতিক মান কেমন থাকা উচিত সে বিষয়ে বিস্তর লিখেছেন। বাংলা একাডেমি হতে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তার লিখিত ‘বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থা’ নামক পুস্তিকায় ‘ওকালতির স্বপক্ষে’ শিরোনামীয় আইন পেশা অনুকূলে একটি ইতিবাচক বলিষ্ঠ প্রবন্ধ লিখেন। কোনো আইনজীবী কর্তৃক এরকম বাস্তব লেখা এখনও চোখে পড়েনি। নব্বই দশকের শেষে অর্থাৎ ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে দীনেশ চন্দ্র দেবনাথ একটি সুখপাঠ্য আত্মজীবনী লেখেন। নাম ‘কত স্মৃতি, কত কথা।’ দেবনাথ বাবু প্রথমে ছিলেন আইনজীবী তারপর মুন্সেফ হতে সাব জজ, পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক। সহজ করে বেশ কয়েকটি আইন বই লিখে তিনি আইনাঙ্গনের দিকপাল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর বইটি আইনজীবী মাত্রই পাঠ করা উচিত। বিচারপতি কৃষ্ণা দেব নাথ তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা।
আইনজীবীর মৌল কর্তব্য হলো আইন সম্পর্কে জ্ঞানার্জন। তিনি যে সবজান্তা হবেন, এমন কথা নয়। আইন বা তার ব্যাখ্যা কোন বইয়ের কোথায় লিখা আছে সে জ্ঞান রাখতে হবে তাঁর। আইনের বিষয়বস্তু বিশাল এবং এর ক্ষেত্র ব্যাপক। সেজন্যে বলা হয়েছে, A lawyer is he, who knows where the law is. আইন পড়ায় অধিক মনোনিবেশ সৃষ্টি হয় সফল আইনজীবীর জীবনী জানলে। সফল আইনজীবীর জীবন বৃত্তান্ত বা জীবনী পাওয়া দূরুহ ব্যাপার। আমাদের পথিকৃত আইনজীবীদের জীবনী সমৃদ্ধ কোনো একক পুস্তিকা এখনও বাজারে আসেনি। বার কাউন্সিল এই অপূরণটুকু পূরণ করতে পারে, অন্তত ২৫ জন পথিকৃৎ আইনজীবীর জীবনী সংক্রান্ত পুস্তিকা প্রকাশ করে। যেমনভাবে সংবাদিকদের জন্যে বই প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট।
অতি-সম্প্রতি বাজারে একটি বই এসেছে। নাম ‘কিংবদন্তী বিচারকদের যাপিত জীবন’। লেখক একজন সহকারী জজ। নাম কাজী শরীফুল ইসলাম। বইটিতে আইনজীবী থেকে বিচারপতি হয়েছেন এমন আটজনের চুম্বক জীবনচরিত রয়েছে। আরও দুইজনের এমনতর জীবনচরিত আছে যারা কোনদিন আইনপেশায় ছিলেন না। ছিলেন বিচারকের আসনে। সবাই আইনাঙ্গনের আলোকবর্তিকা। আইনজীবী বিচারক আটজন হলেন শ্রী দীনেশ চন্দ্র দেব নাথ, বিচারপতি আমিন আহমদ, বিচারপতি মোস্তফা কামাল, বিচারপতি লতিফুর রহমান, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, বিচারপতি গোলাম রাব্বানী, বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর, একেএম জহির আহমদ এবং অপর দুইজন হলেন, বিচারক গাজী শামছুর রহমান ও বিচারপতি হামিদুল হক। তাঁদের প্রত্যেকের লিখা আত্মজীবনীমূলক পুস্তক রয়েছে। পুস্তকগুলোর নাম হলো যথাক্রমে ‘কত কথা কত স্মৃতি’, ‘A PEEP INTO THE PAST’, ‘আমার কিছু বলা’, ‘আত্মকথা’, ‘ফেলে আসা সেইসব দিনের কথা’, ‘ওকালতি ও জজিয়তি জীবনের জলরেখা’, ‘বিচারক জীবনের কিছু স্মৃতি’, ‘আমার কিছু কথা’, ‘বিচারক জীবনের স্মৃতিচারণ’, ‘বিচার বিভাগে ৪৫ বছর’। নবীন আইনজীবীরা চুম্বক বিবরণ সম্বলিত এই বইটি পড়লেও অনেক উপকৃত হবেন।
ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম এর আইনপেশায় ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘আঠারো তার জীবনের ধ্রুব তারা’ প্রকাশিত হয়েছে প্রখ্যাত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের সম্পাদনায়। খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমদ কেন্দ্রীক প্রকাশনা আছে Years of Glory নামে।
কামাক্ষ্যা নাথ সেন নামের আইনজীবী ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে টাঙ্গাইল থেকে ‘আদালত’ নামক একটি ত্রৈমাসিক প্রকাশ করতেন। এই প্রকাশনাতে অনেক আইনজীবীর লিখা ও জীবনী ছাপা হতো। দুরারোগ্য মরণব্যাধি ক্যান্সারে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে সম্পাদক মৃত্যুবরণ করায় ত্রৈমাসিকটি আর প্রকাশ পায় না। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দ হতে লিগ্যাল এইড নামক একটি আইন বিষয়ক মাসিক বেশ কিছু দিন প্রকাশ পায়। সম্পাদক ছিলেন অ্যাডভোকেট খাজা গোলাম মুরশিদ। সুখের কথা ২০১৬ হতে গবেষণামূলক, রুচিশীল, অতি প্রয়োজনীয় তথ্যসমৃদ্ধ একটি সুশ্রী ও অগ্রসরমান প্রকাশনা প্রকাশ পাচ্ছে ঢাকা থেকে। নাম-লিগ্যাল ইস্যু। সম্পাদক-আরিফ খান। ধারাবাহিকভাবে এ পর্যন্ত ১৭টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রকাশনায় পথিকৃৎ আইনজীবীদের জীবনী প্রকাশকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রথম সংখ্যায় ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদ, ২য় সংখ্যায় এসআর পাল, ৩য় সংখ্যায় বিচারপতি এসএম মোরশেদ, ৪র্থ সংখ্যায় বাঙ্গালী ব্যারিস্টারদের ইতিহাস, ৫ম সংখ্যায় প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী, ৬ষ্ঠ সংখ্যায় প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ৭ম সংখ্যায় সুপ্রিমকোর্টের ২৪২ বছরের ইতিহাস, ৮ম সংখ্যায় স্মৃতি-বিস্মৃতির প্রধান বিচারপতিগণ, ৯ম সংখ্যায় বিচারক বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১০ সংখ্যায় সংবিধান সাধক মাহমুদুল ইসলাম, ১১ সংখ্যায় ডিএলআর এর ৭০ বছর, ১২ সংখ্যায় গাজী শামছুর রহমান, ১৩ সংখ্যায় সুচিত্রা সেনের পাবনার বাড়ী নিয়ে মামলা, ১৪ সংখ্যায় বি,এন, চৌধুরী গণমানুষের আইনজীবী, সংখ্যায় ১৫ রবীন্দ্রনাথের আইনজীবীরা, ১৬ সংখ্যায় কোর্ট রিপোর্টিং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৭ সংখ্যায় ৩৫ লাখ ঝুলন্ত মামলার খতিয়ান-মামলাতন্ত্র শিরোনামীয় আইনজীবী, বিচারপতির জীবন কাহিনীসহ আইন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিষয় কেন্দ্রীক প্রচ্ছদ কাহিনী লিখা হয়। আইনজীবী ও বিচারকদের জন্যে প্রকাশনাটি বিরল কিছু কর্ম সম্পাদন করে যাচ্ছে যা আইনাঙ্গনের প্রকাশনা ইতিহাসে ঝলঝলে আকারে লিখিত থাকবে। প্রত্যেক আইনজীবী কর্তৃক এই প্রকাশনাটি সংরক্ষণ করা অপরিহার্য মনে করি।
আমার দেখা আইন আদালতের লিখক এ,এফ,এম আব্দুল জলিল চেম্বারশিপ পরীক্ষা পাশ করার পর ১৯৪৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টে কয়েক মাস প্র্যাকটিস করেই জুন মাসে খুলনা বারে যোগদান করেন। সে হিসেবে দেশভাগের প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর ওকালতি শুরু হয়। তাঁর লেখায় পাওয়া যায়, অনেক আইনজীবী প্রথম থেকেই দেওয়ানী মামলায় ভিড়ে যান কারণ এদিকে মামলার সংখ্যা অনেক বেশী এবং সবসময় আইনজীবীর সংখ্যাও অধিক। ফৌজদারী আইনজীবীর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম। পদ্ধতিগত দীর্ঘসূত্রতা ফৌজদারী অপেক্ষা দেওয়ানী আইনে অনেক বেশী। তাঁর কথায়, ফৌজদারী বিচারে বিচারককে চিন্তা-ভাবনা করতে হয় বেশী। ইংল্যান্ডের কোর্ট অব আপিলের প্রধান বিচারপতি রাইট অনারেবল স্যার আলফ্রেড ডেনিং ফৌজদারী মামলার অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি এ সম্পর্কে বিচারপতি লর্ড এ্যাটকিনের এই মন্তব্য তুলে ধরেন, “Don’t forget that the most important and often the most difficult of the work is the criminal work for a judge.” অর্থাৎ একথা ভুললে চলবে না যে, একজন বিচারকের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে ফৌজদারী বিচারকার্য। বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতায় ফৌজদারী আইনজীবীর সংখ্যা বেশী, মামলার সংখ্যাও বেশি। ফৌজদারী বিচার বাংলাদেশে এখন আর দণ্ডবিধি ও ফৌজদারী কার্যবিধিতে সীমাবদ্ধ নেই। দেশ স্বাধীনের পর ফৌজদারী ক্ষেত্রে অসংখ্য বিশেষ আইনের জন্ম হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত জন্ম হচ্ছে। যেমন বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪, Cruelty women to (Deterrent Punishment) Ordinance, 1983, নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন-১৯৯৫ এর পথ ধরে বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০, এসিড অপরাধ দমন আইন-২০০২, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪, সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২, পরিবেশ আদালত আইন-২০১০, আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ দ্রুত বিচার আইন-২০০২, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০১৩, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন-২০১৩, যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮, ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন-২০১৮, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট আইন-২০১৮, সংক্রমন রোগ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল আইন-২০১৮, নিগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস এ্যাক্ট-১৮৮১ এর সপ্তদশ অধ্যায় প্রভৃতি অনেক রকম দণ্ডমূলক আইন। দেওয়ানী ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর পারিবারিক আদালত অর্ডিনেন্স-১৯৮৫ এবং অর্থ ঋণ আদালত আইন-২০০৩ এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ অনুযায়ী অপরাধ ব্যতিত অন্যান্য প্রশ্নে ২১৬ ধারার অনুকূলে শ্রম আদালত কর্তৃক দেওয়ানী এখতিয়ারের কথা বলা আছে। এছাড়া দেওয়ানী অধিক্ষেত্রে তেমন বিশেষ আইন সংযোজন হয়নি।
আইনজীবীগণের কোনো পেনশন নেই। নেই বয়সের সময়সীমা। ৫৯ বছর উত্তীর্ণ হবার পর নিজেকে অক্ষম ভেবে হাটাহাটি আর পায়চারী করে সময় কাটিয়ে মৃত্যুর জন্যে প্রহর গুনার আগাম মানসিক তাগিদ শুরু হয় না। আইনজীবী কোর্টে যেতে সক্ষম হলে মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত কর্মব্যস্ত থাকতে পারেন। যেমনটি থেকেছিলেন ৮৯ বছর বয়সী সবিতা রঞ্জন পাল।
আইনজীবীদের প্রতিদিনের রুটিন ওয়ার্ক থাকে শুনানী করার। কোর্ট এজলাসে উঠার পর শুরু হয় একের পর এক শুনানী। মুহুর্তটা হয় পরীক্ষার্থীর পরীক্ষার খাতা প্রাপ্তির অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষার মতো। খাতা পাবার পর যেমন প্রতীক্ষার অবসান ঘটে, লিখা শুরু হয়, ঠিক তেমনি মামলার ডাক উঠলে অবসান ঘটে প্রতীক্ষার। শুরু হয় শুনানী। ভালো প্রস্তুতি থাকলে অবশ্যই সুফল নিয়ে ফেরা যায়।
লেখকঃ শহীদুজ্জামান চৌধুরী, আইনজীবী সিলেট সাবেক সভাপতি, জেলা আইনজীবী সমিতি সুনামগঞ্জ সাবেক সভাপতি, প্রেসক্লাব সুনামগঞ্জ সম্পাদক, সাপ্তাহিক স্বজন ও দৈনিক হাওর বার্তা সুনামগঞ্জ

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com