1. [email protected] : admin2017 :
  2. [email protected] : Sunam Kantha : Sunam Kantha
  3. [email protected] : wp-needuser : wp-needuser
বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২৩ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

উজ্জ্বল মেহেদীর মউজ, মজে মউজ : বেদনার হালখাতা : অহী আলম রেজা

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০২৪

বিদ্যুতের লোডশেডিং মোকাবিলায় কৃত্রিম আলোর ব্যবহারে প্রতি পূর্ণিমা রাতে নিভিয়ে ফেলা হতো স্ট্রিট লাইট। নব্বই দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের একটি পৌর শহরে পূর্ণিমা উপভোগে সেই অভিনব উদ্যোগটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হিসেবে প্রচার পায়। ১৯৯৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এ নিয়ে একটি প্রতিবেদনের সুবাদে উদ্যোগটি ছড়িয়ে পড়ে দেশে-বিদেশে। ‘আকাশ ভাইঙ্গা জোছনা পড়ে’ কথার প্রচলনে সেই থেকে শহরের নতুন পরিচিতি জলজোছনার শহর।
সুনামগঞ্জ শহরে প্রায় ২৭ বছর আগের সেই উদ্যোগকে উপজীব্য করে সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী তাঁর জলোপাখ্যান সিরিজের ‘মউজ, মজে মউজ’ গ্রন্থে তুলে এনেছেন।
জলজোছনার রূপকার ছিলেন জোছনাবাদী কবি ও জনপ্রতিনিধি অকালপ্রয়াত মমিনুল মউজদীন। তাকে নিয়ে মউজ ও মজে থাকার জলজোছনা-কাহিনি। এ কাহিনি থেকে পূর্ণিমা রাতে শহরের স্ট্রিট লাইট নিভিয়ে চন্দ্রালোকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হওয়ার শাণিত আহবান প্রাধান্য পেয়েছে।
মরমী কবি হাসন রাজার প্রপৌত্র মমিনুল মউজদীন ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ ফেরার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী, এক পুত্র ও গাড়িচালকসহ নিহত হন। তার মৃত্যুর পর থেকে পৌর শহরে পূর্ণিমা রাতে স্ট্রিট লাইট নিভিয়ে জোছনা উপভোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সেই উদ্যোগটি বন্ধ রয়েছে।
মূলত একটি অঞ্চল ও একটি পরিবারের ঘটনা নিয়ে গড়ে উঠেছে এ উপাখ্যান। এ উপাখ্যানের ‘নায়ক’ কবি মমিনুল মউজদীন। ২০০৭ সালে তিনি প্রয়াত হন। জীবিত মউজদীনের বেড়ে উঠা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, জনপ্রতিনিধি হওয়ার কাহিনি ফুটে উঠেছে। তাঁর বয়ানেই তৈরি হয়েছে এ আখ্যান। কাহিনির বিভিন্ন অংশে লেখক নায়কের সংলাপে লিপ্ত হন। তাদের দু’জনের কথোপকথনে আরো অনেক চরিত্র ভিড় করে।
মমিনুল মউজদীন সময়কে অতিক্রম করেছেন। রাজনীতিতে সফল, জীবনে কোনো অপূর্ণতা ছিলনা তাঁর। পৌর চেয়ারম্যান হয়ে সুদর্শন রোমান্টিক কবি মমিনুল মউজদীন জোছনা রাতে শহরের সবক’টি বাতি নিভিয়ে শহরবাসীকে জোছনা দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে কথাটি স্ত্রী তাহেরা চৌধুরীকে বলেন। স্ত্রী চাপ দিতে থাকেন। মউজদীন পরামর্শ নেন ভক্তকুলের। বাঁধা আসে। ওই সময় মার্কিন একদল গবেষক দাবি করেন- ‘কৃত্রিম আলো মানুষের ঘুম ও জেগে থাকার চক্রে আঘাত হানছে। এতে মানুষের শরীরবৃত্তীয় কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। প্রতিকার হিসেবে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার কমানো আর মৃদু আলো অথবা প্রাকৃতিক আলোর প্রযুক্তির উদ্ভাবন করতে হবে।’ মউজদীন বিষয়টি লুফে নেন।
সব বাঁধা কাটিয়ে মউজদীন বিরল এ কাজটি করেন। বাংলাদেশে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। কথা সাহিত্যিক হাসনাত আব্দুল হাই তখন স্থানীয় সরকার সচিব। তিনি পৌর চেয়ারম্যানদের সভায় বিষয়টি উত্থাপন করেন। বলেন, আপনারাও এটি অনুসরণ করতে পারেন। এতে প্রকৃতির নান্দনিক রূপ উপভোগের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়।
মউজদীন ভক্তরা বলেন, “তিনি কবিতা লেখেন তবে কবিদের মতো না, রাজনীতি করেন তবে রাজনীতিবিদদের মতো না। পৌর পিতা তবে, পিতৃত্বের কর্তৃত্বপরায়ণ নন। শুধু রক্তে নন মননেও এ যুগের- হাছন রাজা।”
মউজদীন ভোটের মাঠে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী-অপরাজেয়। ভোট এলেই একদিকে মউজদীন, অন্যদিকে মউজদীন বিরোধীরা। তারপরও কবি পরাজিত হননি। একবার, দুইবার, তিনবার অপরাজিত। এ কারণে রাজনীতির বটবৃক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদও মমিনুল মউজদীনকে সমর্থন দিয়েছেন। বলয় ভারী করতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও কাছে টেনেছেন।
কৈশোরে বন্ধুদের পড়ার বিষয় যখন ছিল রূপকথা, মউজদীনের তখন পড়া হয়ে গেছে চীনের লং মার্চের কাহিনী। ধীরে ধীরে হয়ে যান মাও সেতুং-এর অন্ধভক্ত। ফিদেল কাস্ত্রো, চেগুয়েভারার ভালোবাসা থেকে মাধ্যমিক পড়াকালে ছাত্র ইউনিয়নে নাম লেখান। তরুণ বয়সে নির্বাচিত হন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ স¤পাদক। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও তাঁর চিন্তা-চেতনা কখনো পুঁজিবাদী হাঙ্গরের রূপ ধারণ করেনি। সামন্ত আভিজাত্যবোধের দেয়াল ডিঙ্গিয়ে হয়েছিলেন উদার মানবতাবাদী।
শহরে সৃজনশীল যারা তারা ছিলেন মউজদীনের ছায়াসঙ্গী। আড্ডায়, গানে রাত ভোর হত। মা-বাবার আদরের সন্তানটি যখন রাত করে বাড়ি ফিরতো তখন মউজদীনের সাথে ছিল বললেই শাসন থেকে রেহাই পেতো। জীবনের শেষ নির্বাচনে ভক্তরা পরামর্শ দেন এইবার আর গৎবাধা স্লোগান নয়। ভোট দিন, ভোট চাই-এরকম হবে না। স্লোগান হবে ব্যক্তিকে নিয়ে। জনগণের মউজদীন/ভুলবোনা কোনোদিন। উন্নয়নের মউজদীন/ ভুলবোনা কোনোদিন।
‘সত্য যে বড় কঠিন কঠিনেরে আমি ভালোবাসিলাম’। এই কঠিনেই মুগ্ধ মউজদীন ও তাঁর ভক্তকুল। পৌর বিপণির সামনে পিছনে হাজার হাজার মানুষ। মাইক্রোফোন হাতে মউজদীন দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। আহ্বান আর ঘোষণার মধ্য দিয়ে জানান দিলেন নতুন স্লোগান আর নতুন প্রচার হবে এ নির্বাচনে।
টান টান উত্তেজনার মধ্যে শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভোট। বিজয় আসে। তৃতীয় দফা পৌর নির্বাচন শেষে তিনি ঘোষণা করলেন- আর স্থানীয় নির্বাচন নয়। জাতীয় নির্বাচনে প্রয়োজনে স্বতন্ত্র লড়বেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেন মউজদীন। নেত্রী সেদিন আগ বাড়িয়ে বলেছিলেন, দলীয় ও অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টে মমিনুল মউজদীন অনেক এগিয়ে। ভোটের ট্রেন্ড দেখে মুগ্ধ তিনি। আসন পুনরুদ্ধারে নতুন মুখের সন্ধান করছেন। ভোটের ট্রেন্ড এগিয়ে থাকা শুনে মউজদীনের মনোবল চাঙ্গা। হাতে থাকা ‘এ শহর ছেড়ে পালাবো কোথায়’ কাব্যটি নেত্রীর হাতে তুলে দেন। বই হাতে নিয়ে নেত্রী বলেন, বলতে গেলে বই-ই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যত ব্যস্ত থাকিনা কেন বই পত্রপত্রিকা পড়ার অভ্যাসটা ধরে রেখেছি। কবির হাত থেকে কবিতার বই উপহার নির্মলেন্দু গুণের পর সরাসরি আপনার হাত থেকে পেলাম। তো শহর ছেড়ে পালাবেন কেন? পালালে হবে না। লড়তে হবে, লড়ে জিততে হবে। বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে এসব কথা বলেন নেত্রী।
একদম মুখোমুখি মউজদীন। মুখের কথা যে ভেতর থেকে উৎসারিত তা এক পলকেই বুঝা যাচ্ছিল। নেত্রীর নেত্র এবার মউজদীনের দিকে। আদুরে আহ্বানে বললেন, ভোটের ট্রেন্ডে এগিয়ে থাকা কবি ও জনপ্রতিনিধি আপনি। আমার জানা মতে, আপনিই বোধ হয় বাংলাদেশের একমাত্র। মূলমন্ত্রটা কী? কবি না কবিতা। কবিতায় তো দেখি নৌকা ছাড়াই বৈঠা বেয়ে চলেছেন। নৌকা ছাড়া আর বৈঠা বাইতে হবে না। নৌকা দেবো। তবে এবার কিন্তু জয় এনে দিতে হবে। আগেরবার কেন্দ্র থেকে আব্দুস সামাদ আজাদ ভূমিকা রেখেছিলেন। স্থানীয় কোন্দল এড়াতে তিনি হাছন রাজার ঘরে নৌকা এনে দিয়েছিলেন। তখন স্লোগান উঠেছিল- সামাদ আজাদের নৌকা, হাছন রাজার নৌকা। সেবার মউজদীনের বড় ভাই দেওয়ান শামসুল আবেদীন নৌকা পেয়েও বিজয় আনতে পারেননি।
২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি হবে নির্বাচন। তবে, আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকা বদলে যায়। চাউর হয়- দল নিরপেক্ষ স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন মউজদীন। ভোটার করবেন বড় ছেলে কফলিল জিবরানকে। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ ফেরার পথে সরাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় সেই স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়।
মউজ, মজে মউজ উপাখ্যানে এই দৃশ্যটি বার বার এসেছে। যতবার পড়তে গেছি বুক ছিড়ে গেছে। এড়িয়ে গেছি অনেক বার। মউজদীনের মৃত্যু হতে পারে না। এখনো মনে হয় মউজদীন আছেন, সুনামগঞ্জের ট্রাফিক পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন। সামনে পিছনে হাজার হাজার মানুষ।
জলোপাখ্যান সিরিজের দ্বিতীয় বই জলজোছনার জলোপাখ্যান : মউজ, মজে মউজ। বইটির প্রকাশ করেছে চৈতন্য প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন খ্যাতিমান প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ। জলজোছনা-চিত্র এঁকেছেন নাওয়াজ মারজান। জলজোছনা সচিত্রকরণ করেছে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া শিশুশিল্পী নওশীন আজিজ।

 

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com