1. [email protected] : admin2017 :
  2. [email protected] : Sunam Kantha : Sunam Kantha
  3. [email protected] : wp-needuser : wp-needuser
বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১১ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

ড. ইউনূস কি বিচারের ঊর্ধ্বে?: ড. সুলতান মাহমুদ রানা

  • আপডেট সময় শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০২৪

গ্রামীণ ব্যাংক বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যাংক। যার মালিক সরকার এবং ঋণ গ্রহীতা সাধারণ জনগণ। অথচ গ্রামীণ ব্যাংকের টাকায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস গড়ে তুলেছেন নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি প্রতিষ্ঠান। ২০০৬ সালে তিনি যখন নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, সমগ্র বাংলাদেশ আনন্দ প্রকাশ করেছিল। তিনি অর্থনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও গ্রামীণ ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তখন বাঙালি হিসেবে অমর্ত্য সেন কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে মিলিয়ে পত্রপত্রিকায় নানা সংবাদ বেশ আলোচিত ছিল। কিন্তু বছর পেরোতে না পেরোতেই দেশের রাজনীতিতে আবির্ভূত হয় ১/১১-এর সরকার। জরুরি অবস্থা জারি, রাজনীতি ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধসহ সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতির সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিতে শুরু করে। রাজনীতির মাঠ ফাঁকা করে মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের জোর প্রচেষ্টা শুরু হয়। তখনই সামনে চলে আসেন আলোচিত ড. ইউনূস। ওই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।
গত ২ মার্চ বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস প্রশ্ন রাখেন, “দশ সপ্তাহের সেই ঘটনার জন্য সারা জীবন আমাকে খেসারত দিতে হবে?” তিনি মূলত বিগত সময়ে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহের যুক্তি খ-ন করতে গিয়ে দাবি করেন, ১/১১-এর সেনা সমর্থিত (মইন-ইউ-আহমেদ) সরকারের অনুরোধের পরও তিনি সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেননি। পরবর্তীতে সবার অনুরোধে রাজনৈতিক দল খোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দশ সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সেখান থেকে সরে আসেন। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার রাজনৈতিক দল ‘নাগরিক শক্তি’ গঠনের উদ্যোগ ভুল ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধুই কি তার এক ভুল?
নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টে বিজ্ঞাপন আকারেও প্রকাশিত হয় একটি খোলা চিঠি। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ৪০ বিশ্বনেতার লেখা ড. ইউনূসের পক্ষে এক পৃষ্ঠার পক্ষপাতমূলক ‘সাফাই’, যা নতুনভাবে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয়। ২০১১ সালে ড. ইউনূসকে যখন দেশের অবসর আইন অমান্য করে ব্যাংকের এমডি পদ থেকে পদত্যাগ করার অনুরোধ এবং ‘উপদেষ্টা ইমেরিটাস’ হিসেবে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আপিল বিভাগে আইনি লড়াইয়ে নিজেকে প্রমাণিত করতে ব্যর্থ হন। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব বিষয়ে কী বলবেন বিদেশি ৪০ নাগরিক?
এ বিষয়ে কারও বুঝতে বাকি নেই যে ড. ইউনূস একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি একসময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রভাব এতটাই প্রখর যে বলা হয়ে থাকে তিনি মার্কিন সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশের পদ্মা সেতুতে প্রতিজ্ঞাকৃত ঋণ প্রদান থেকে বিশ্বব্যাংককে বিরত রাখতে সফল হয়েছিলেন। গোটা বিশ্বের কাছে ড. ইউনূসকে মার্কিন সরকারই পরিচয় করিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বদান্যতার কারণে তিনি জাতিসংঘেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করতে পেরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ইউনূসের সুস¤পর্ক অনেক পুরনো। সেই সুবাদে তিনি এর সুফল নিংড়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। হিলারি ক্লিনটনের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে বন্ধুকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাবও দিয়েছিলেন। এমনকি হিলারি ক্লিনটন যখন সব প্রটোকল ভেঙে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে আদালতের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ চান তখন সেটি আরও স্পষ্ট হয় যে ইউনূস কতটা প্রভাবশালী। মাঝখানে ডেমোক্র্যাটদের রিপাবলিকানরা হারিয়ে দিলে বেশ চুপচাপই ছিলেন ইউনূস। জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর ফের তৎপর হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু এই ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। যেগুলো এই এক লেখায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
তার প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের তদন্ত প্রথম করে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে ডেনমার্কের চলচ্চিত্র নির্মাতা টম হাইনম্যান তৈরি করেন ‘ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে’ (ঈধঁমযঃ রহ গরপৎড় উবনঃ) নামে এক প্রামাণ্যচিত্র। বিভিন্ন সময়ে দেশে বিদেশে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের যে ইতিবাচক চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল, এই চলচ্চিত্রটি স¤পূর্ণ তার বিপরীত একটি চিত্র তুলে এনেছে। দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য ভর্তুকি হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে ১৯৯৬ সালে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের (নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি) দেওয়া অর্থ থেকে ১০ কোটি ডলারেরও বেশি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে গ্রামীণ কল্যাণ নামে নিজের অন্য এক প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেন ইউনূস, যা নিয়মবহির্ভূত ও প্রকৃতপক্ষে গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থ।
প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরির সময়ে এর নির্মাতা ৬ মাস ঘুরে এই সম্পর্কে ড. ইউনূসের বক্তব্য নিতে পারেনি, উপরন্তু প্রতিবেদনটি প্রচার না করার জন্য চ্যানেল কর্তৃপক্ষকে চিঠি লেখেন ড. ইউনূস।
গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দাতাগোষ্ঠী অনুদান এবং ঋণ দেয় গ্রামীণ ব্যাংককে। অনুদানের সব অর্থ রাষ্ট্র এবং জনগণের জন্য ব্যয় না করে গঠন করেন সোশ্যাল ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ড (এসভিসিএফ)। ১৯৯২ সালের ৭ অক্টোবর ওই ফান্ড দিয়ে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালেই ‘গ্রামীণ ফান্ড’ নামের একটি লিমিটেড কো¤পানি গঠন করা হয়। তাতে ওই ফান্ডের ৪৯.১০ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়। সুতরাং গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়ে বিদেশ থেকে টাকা এনে তা সরিয়ে ফেলার চেষ্টা ছিল শুরু থেকেই।
মজার ব্যাপার হলো, গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে এবং বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ ফান্ড গঠিত হয়। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানগুলো গঠিত হয়েছে তা সবই আইনত গ্রামীণ ব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ফান্ড এবং গ্রামীণ কল্যাণের পরিচালনা পর্ষদে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি থাকলেও, ২০২১ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি নেই। গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত ব্যক্তি। কিন্তু ড. ইউনূস এখনও গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ ফান্ডের চেয়ারম্যান পদে বহাল আছেন।
নোবেল বিজয়ী বলে তাকে ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ ভাবা নিশ্চিতভাবে অযৌক্তিক। পাশের দেশ মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় আদালত অং সাং সুচিকে বিভিন্ন অপরাধের জন্য কারাদ- দিয়ে প্রমাণ করেছেন নোবেল বিজয়ী হওয়া মানে বিচারের ঊর্ধ্বে চলে যাওয়া নয় এবং নোবেল বিজয়ী হলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে তিনি অপরাধ করতে অক্ষম।
আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতও সুচির বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের তদন্তে নেমেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতসমূহে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিচার হয়েছে এবং হচ্ছে। অতীতে সে দেশেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ডমিনিক স্ট্রস কানের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে বিচার হয়েছে। প্রাক্তন ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাই সারকোজির বিচার প্রমাণ করছে যে বড়মাপের মানুষ হলেই তিনি অপরাধমুক্ত হবেন বা বিচারের ঊর্ধ্বে থাকবেন, এমনটি হতে পারে না।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com