1. [email protected] : admin2017 :
  2. [email protected] : Sunam Kantha : Sunam Kantha
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৪:৪১ পূর্বাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

কেন কাঁদলেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু? : আমীন আল রশীদ

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১০ আগস্ট, ২০২৩

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাবেক মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে- যেখানে দেখা যাচ্ছে দেশ নিয়ে তিনি খুবই হতাশ। রাজনীতি নিয়ে তো বটেই। আগামী জাতীয় নির্বাচনে সংঘাত হবে বলেও তার শঙ্কা। নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে একপর্যায়ে কেঁদেও ফেলেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। বলেন, ‘এই দেশ চালানো অত্যন্ত কঠিন। অত্যন্ত জটিল। এখানে অনেক জিনিস লুকায়িত আছে। দিস ইস নট আ নরমাল কান্ট্রি।’
প্রশ্ন হলো, দেশ নিয়ে কেন হতাশ একাধিক সরকারের আমলে প্রভাবশালী মন্ত্রী থাকা এই রাজনীতিবিদ? কেন তিনি মনে করেন এই দেশ চালানো অত্যন্ত কঠিন? কী এমন জিনিস এখানে লুকায়িত, যা তিনিও বলতে চান না বা বলতে ভয় পান? কেন তার মতো একজন মানুষ নিজের দেশ স¤পর্কে বলছেন: ‘দিস ইস নট আ নরমাল কান্ট্রি?’ এটি কি শেষ বয়সে এসে নিজের না পাওয়ার বেদনা জনিত ক্ষোভ, নাকি তিনি যা বোঝাতে চাইছেন, সেটি ¯পষ্ট নয়?
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু একাধিক সরকারের আমলে মন্ত্রী ছিলেন। নিজে একটি দলের প্রধান। বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন সফল মানুষ। স¤পদশালী মানুষ। অথচ দেশ ও রাজনীতি নিয়ে কেন তার এই উপলব্ধি? এই হতাশা?
বললেন, ‘আমি রাজনীতি করি। একটা সুন্দর দেশ হবে। একসময় সরকারি দল আমাদের পেটায়। এখনও পেটায়’ বলেই কেঁদে আবার হেসে দেন। পরিহাসের হাসি। ‘সেজন্য বলি দেশে নির্বাচন হবে, লোকে অংশগ্রহণ করবে, হার হবে জিত হবে, আমি না মানতে পারি, আমার এলাকার মানুষ তো জানবে আসলে ঘটনাটা কী ঘটেছে। তারা জানে না এই মিয়া কেমন করে এমপি হইলো। তারা আমারে জিগায় আপনে নাকি এমপি হইছেন শুনলাম?’ (হাসি)। ‘তারা শুনেছে আমি এমপি হইছি। এই অবস্থাটার পরিবর্তন চেয়েছিলাম। এখন তা চাওয়ার সময় নাই। এখন নতুন জেনারেশন কী করে। তারাও আমার মতো আশা করবে। ফাইট করবে। পরে হতাশ হয়ে মারা যাবে।’
মঞ্জু যেসব বাস্তবতা মাথায় রেখে বলছেন যে ‘দিস ইস নট আ নরমাল কান্ট্রি’ – তার মধ্যে একটি কি এই যে এখানে নেতা হওয়া খুব সহজ? ধরা যাক তার নিজের নির্বাচনি এলাকার কথাই। গত ১৭ জুলাই তার নিজের বাড়ি পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া পৌরসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে হেরে গেছেন তার দলের প্রার্থী মহিবুল ইসলাম মাহিম। যিনি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর চাচাতো ভাই। অথচ ভান্ডারিয়াকে বলা হয় জাতীয় পার্টির (জেপি) আঁতুড়ঘর। এখানে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী ফাইজুর রশিদ খসরু – যার পেছনে ছিলেন পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম স¤পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ। মহাজোট সরকারের মন্ত্রী থাকাকালীন মঞ্জুর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ছিলেন এই মহারাজ। অথচ সময়ের ব্যবধানে তিনিই এখন রাজনীতিতে সাবেক বসের প্রতিদ্বন্দ্বী।
এটি হয়তো বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা। জনাব মঞ্জু নিশ্চয়ই আরও অনেক গভীর কারণ মাথায় রেখে কথাটি বলেছেন। কী সেই কথা? বলেছেন, এখানে অনেক কিছু লুকায়িত আছে। কী লুকায়িত আছে যা তিনিও বলছেন না?
আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর এই কথার সঙ্গে আমরা আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদের একটি বক্তব্যকে মিলিয়ে পাঠ করতে পারি। ২০১৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে এক শোকসভায় তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই।’ একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘বর্তমান রাজনীতি লুটেরাদের হাতে। আজকের রাজনীতি এমন সব বড়লোকের হাতে, যারা দেশের মানুষের স্বার্থরক্ষা করে না।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনিও বলেন, ‘আগে রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। আর এখন রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করছে।’
তাহলে জনাব মঞ্জু কি এটিই ইঙ্গিত করেছেন যে রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই? এটা বেহাত হয়ে গেছে? যদি বেহাত হয়ে যায় তাহলে তার জন্য রাজনীতিবিদদের নিজেদের দায় কতখানি – সেই আত্মসমালোচনা কি তারা করবেন? আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বা তোফায়েল আহমেদরা করবেন?
কেন একটি জেনারেশন ‘উই হেইট পলিটিকস’ – এ অভ্যস্ত হলো? কেন তাদের কাছে ‘এই দেশে থেকে কিচ্ছু হবে না’ জাতীয় বাক্যটি জনপ্রিয় হতে হতে তারা উচ্চমাধ্যমিকের পরে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পেরোনোর পরে আর দেশে থাকতে চায় না? কেন মোটামুটি সচ্ছল মানুষেরাই তাদের সন্তানদের পড়ালেখা ও ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে দিতে চান? কেন গত অর্ধ শতাব্দীতেও এমন একটি দেশ গড়ে তোলা গেলো না, যে দেশটি নিয়ে দলমত নির্বিশেষে সব মানুষ সন্তুষ্ট থাকবেন, আত্মতৃপ্তিতে থাকবেন? সেই কাজটি করার মূল দায়িত্ব ছিল তো রাজনীতিবিদদেরই। বিশেষ করে যারা ক্ষমতায় ছিলেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও দীর্ঘদিন সেই ক্ষমতা বলয়ের ভেতরেই ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। সব সরকারপ্রধানের সঙ্গে তার সুস¤পর্ক ছিল। তাহলে এখন তিনি কেন কেঁদে ফেলছেন? কেন মনে করছেন, নতুন প্রজন্মও দেশ বদলানোর স্বপ্ন দেখবে। কিন্তু তারাও একটা পর্যায়ে হতাশ হয়ে মারা যাবে? কেন এরকম একটি হতাশার কথা তিনি ক্যামেরার সামনে বললেন? দেশটা যে এরকম একটি খারাপ জায়গায় এসে দাঁড়ালো, এ জন্য তার নিজের কোনও দায় নেই?
নতুন প্রজন্মও যে দেশ বদলাতে পারছে না, তার বড় প্রমাণ ২০১৮ সালে সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ওই আন্দোলনের সময় সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর গাড়িও নিয়ম ভাঙার দায়ে রাস্তায় আটকে দিয়েছিল শিক্ষার্থীরা। জনাব মঞ্জুও তাদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। কিন্তু তারপর কী হয়েছে? কার্যত ওই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, আন্দোলনের ফলে সড়ক পরিবহন আইন হলেও ওই আইন সড়ক নিরাপদ করার ক্ষেত্রে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে – তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। উপরন্তু এই আইনে সড়কে নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি আছে অত্যন্ত মামুলি আকারে। আইনটির শিরোনামেও ‘নিরাপত্তা’ কথাটি নেই। বরং চাপের মুখে আইনটি করা হলেও এখানে পরিবহন মালিক শ্রমিকদের প্রভাব ছিল দারুণভাবে।
যাদের রাজনৈতিক দলগুলো ভয় পায়। তোয়াজ করে। সুতরাং তরুণরা জাগলেই যে সবকিছু বদলে যায়- সেই ধারণাটিও এই ক্ষেত্রে সঠিক প্রমাণিত হয়নি। সম্ভবত এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই জনাব মঞ্জু বললেন, নতুন প্রজন্মও হতাশ হয়ে মরে যাবে। যদি তাই হয়, তাহলে তার জন্য দায়ী কে?
আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর হতাশার একটি বড় জায়গা দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা। পরিহাসের সঙ্গে বললেন, তিনি যে কীভাবে এমপি হলেন, সেটিই লোকে জানে না। কারণ, ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
বস্তুত সব দলই গণতন্ত্রের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে এবং ক্ষমতার বাইরে গেলে গণতন্ত্র ও নির্বাচন ইস্যুতে তাদের অবস্থান স¤পূর্ণ বিপরীত। ফলে এখানে কোনও সিস্টেম দাঁড়ায় না। ক্ষমতায় গেলে আর কেউ নামতে চায় না। যেভাবেই হোক আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। তখন জনগণের ভোটাধিকারও কেড়ে নেয়। অথচ সংবিধান বলছে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু জনগণের সেই মালিকানা প্রয়োগের একমাত্র জায়গা যে ভোটাধিকার, সেই অধিকার থেকেই তাদের বঞ্চিত করা হয় সংবিধান, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে। ফলে জনাব মঞ্জু যখন বলেন ‘দিস ইস নট আ নরমাল কান্ট্রি’ – সেটিকেই যৌক্তিক মনে হয়। কেননা, রাজনীতিবিদরাই অপার সম্ভাবনাময় দেশটিকে অ্যাবনরমাল করে রেখেছেন। কোনও সিস্টেম গড়ে তোলেননি। তুলতে দেননি। কোনও প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশই দলীয় কার্যালয়। তারা হয়তো পর¯পরের ওপর দায় চাপাবেন। আমলাদের দায়ী করবেন। কোনও কোনও বাহিনীকেও দায়ী করতে পারেন। কিন্তু দিন শেষে দায়টা তাদেরই। সুতরাং বিপুল অব্যবস্থাপনার মধ্যেও যে ১৭-১৮ কোটি লোকের দেশটি এখনও টিকে আছে, সেটিই বরং বিস্ময়ের! অতএব, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কান্নাটা অস্বাভাবিক নয়। বাকিদেরও কান্না করা উচিত। সেই কান্নার ভেতর দিয়ে যদি নতুন কোনও দিনের সূচনা হয়, সেটিই মঙ্গল।
লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

 

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com