1. [email protected] : admin2017 :
  2. [email protected] : Sunam Kantha : Sunam Kantha
  3. [email protected] : wp-needuser : wp-needuser
সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ০২:৪৩ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২ মার্চ, ২০২৩

মোহাম্মদ আব্দুল হক
ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৯৭১ খ্রিস্টিয় সালের ৭ই মার্চ বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক দিন। ৭ই মার্চ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠার আগের যেমন রয়েছে ঘটনাবহুল দীর্ঘ সংগ্রামের পথ, তেমনি পরবর্তীকালে দেখতে পাই সেই পথেই বাঙালি জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির সংগ্রাম। এই সংগ্রামী পথের বাঁকে বাঁকে আছে তিলে তিলে হয়ে উঠা জনতার নেতার কণ্ঠের বজ্র ধ্বনি এবং আছে নেতার সাহসী তর্জনী উঁচু করে বঞ্চিত মানুষকে মুক্তির পথ নির্দেশক এক জ্বালাময়ী ভাষণ। সেদিনের সেই ভাষণ ছিলো বাঙালি জাতির মুক্তির জন্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা। এই দিনেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে রোপণ করা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ আলোর পথে উত্থিত হতে শুরু করে।
ভাষা আন্দোলনের কথা না-বলে বাংলাদেশ হয়ে উঠার ঠিক আগের বা পরের কথা বলতে শুরু করলে ঠিকভাবে বুঝতে পারা যায় না। অস¤পূর্ণ থেকে যায়। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেবের ঘোষণা, “উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।” সাথে সাথে ছাত্ররা তাঁর সামনেই “না, না, না” বলে চিৎকার দিতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে আছে, “জিন্নাহ প্রায় পাঁচ মিনিট চুপ করেছিলেন, তারপর বক্তৃতা করেছিলেন। আমার মনে হয়, এই প্রথম তাঁর মুখের উপরে তাঁর কথার প্রতিবাদ করল বাংলার ছাত্ররা। এরপর জিন্নাহ যতদিন বেঁচেছিলেন আর কোনদিন বলেন নাই, উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।” এরপর ১৯৫২ খ্রিস্টিয় সালের ২১-এ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলার ভাষা আন্দোলন সফল হয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এর প্রাণের বিনিময়ে। মূলত ১৯৪৭ খ্রিস্টিয় সালে পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরে থেকেই শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক টানাপোড়েন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ খ্রিস্টিয় সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের লাহোরে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেছিলেন। এরপর ৬ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু; বাংলার সর্বস্তরের জনগণের কাছে ৬ দফা ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিলো। ৬ দফা ছিলো অবহেলিত বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ। সেই সাথে আন্দোলন চলতে থাকে। আসে ১৯৭০ খ্রিয়িয় সালের সাধারণ নির্বাচন। ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা করে। ওই বছর ১মার্চ পাকিস্তানি মিলিটারি শাসক ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্যে জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত করে। এমন অন্যায় সিদ্ধান্তে সারা বাংলায় তখন প্রতিবাদ হয় এবং ৩ মার্চ হরতাল পালিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের কাছে দাবি জানান অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। কিন্তু; তারা তা মানেনি।
বঙ্গবন্ধু বাংলার জনগণের সামনে আসেন সশরীরে ৭মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে যা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে তিল ধারণ করার মতো জায়গা আর খালি ছিলো না। পুরো ময়দান হয়ে উঠে লোকে লোকারণ্য। জনতা এসেছে এখানে নেতাকে সরাসরি দেখবে এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরেও বাঙালির নেতাকে ক্ষমতায় বসতে না দেয়ার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী দিকনির্দেশনা মূলক বক্তব্য শোনার জন্যে। সেদিন যথাসময়ে নেতা আসেন এবং মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।” সেদিন বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ বক্তৃতায় জাতির দুর্যোগ মোকাবেলায় কি কি করতে হবে তা জনসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সাহসী কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এখনই শৃঙ্খল মুক্তির পথে বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের প্রতিটি বাক্য তেজোদ্দীপ্ত এবং সময়োপযোগী। তিনি ঘোষণা করলেন, “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।” বঙ্গবন্ধুর ভাষণে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনতা উত্তেজিত হচ্ছিলো এবং সেদিকে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী দৃষ্টি রাখছিলো। তাঁর ভাষণে এমন সব কথা ফুটে উঠেছিলো যা সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে বুঝতে পারা যায়, মূলত বাংলাদেশের মানুষের চূড়ান্ত মুক্তির আন্দোলনের ঘোষণা সেদিনই বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে। তিনি বললেন, “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।” দেশের প্রতি কতোটা ভালোবাসা থাকলে এবং দেশের মানুষের প্রতি কতোটা আস্থা রাখতে পারলে একজন নেতার কণ্ঠের এমন আওয়াজ পাওয়া যায়, এটা সত্যি সত্যিই বিস্ময়কর ব্যাপার। সেই সাথে তাঁর ছিলো মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ ভরসা, তাই তাঁর বক্তব্যে ‘ইনশাল্লাহ’ উচ্চারিত হয়েছে সেদিনের ভাষণে।
বাঙালির শত্রুদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান এবং একই সাথে তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন থেকেই বাংলাদেশের মানুষ অফিস, আদালত, ব্যাংক, বীমা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কারখানাসহ সবখানেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনেই চলতে থাকেন। এরপর ১৬মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয় নিয়ে ঢাকায় মুজিব – ইয়াহিয়া বৈঠক হয় এবং ২৪মার্চ ইয়াহিয়া – মুজিব – ভুট্টো মিলে আলোচনা হয়। অতঃপর; আলোচনা ব্যর্থ হলে ২৫মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান ঢাকা ছেড়ে চলে যান। তিনি যে এমনি এমনি চলে যাননি; বরং; যাবার আগে এক কঠিন সিদ্ধান্ত দিয়ে গিয়েছিলেন তার অনুগত মিলিটারিকে; তা বুঝতে পারা যায় সে রাতেই তার ঢাকা ত্যাগের পরে। সে রাতেই অর্থাৎ ২৫মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভারী অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালি ছাত্র – জনতার উপর। তারা প্রথমেই আক্রমণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর, পিলখানার রাইফেল সদর দফতরে ও রাজারবাগ পুলিশ সদর দফতরে। বঙ্গবন্ধু বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ, বুঝতে পেরেছিলেন উপযুক্ত সময় এসে গেছে, তাই সে রাতে ১২টা ২০মিনিটে বাংলার জনগণের উদ্দেশ্যে তাঁর ডাকা স্বাধীনতার বার্তা বাংলাদেশের সর্বত্র ওয়্যারলেস, টেলিফোন ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছিলো। সেই বার্তাটি বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী গ্রন্থে উল্লেখ আছে, “ঞযরং সধু নব সু ষধংঃ সবংংধমব, ভৎড়স ঃড়-ফধু ইধহমষধফবংয রং রহফবঢ়বহফবহঃ. ও পধষষ ঁঢ়ড়হ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ভ ইধহমষধফবংয যিবৎবাবৎ ুড়ঁ সরমযঃ নব ধহফ রিঃয যিধঃবাবৎ ুড়ঁ যধাব, ঃড় ৎবংরংঃ ঃযব ধৎসু ড়ভ ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ ঃড় ঃযব ষধংঃ. ণড়ঁৎ ভরমযঃ সঁংঃ মড় ড়হ ঁহঃরষ ঃযব ষধংঃ ংড়ষফরবৎ ড়ভ ঃযব চধশরংঃধহ ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ ধৎসু রং বীঢ়বষষবফ ভৎড়স ঃযব ংড়রষ ড়ভ ইধহমষধফবংয ধহফ ভরহধষ ারপঃড়ৎু রং ধপযরবাবফ.”
১৯৭১ খ্রিস্টিয় সালের ২৫মার্চের কালরাতের পরে ২৬মার্চের ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বাঙালি যার যা-কিছু আছে প্রাথমিক পর্যায়ে তাই নিয়েই সংগঠিত হতে থাকে এবং শুরু হয়ে যায় শত্রুদের আক্রমণ মোকাবেলা করা। খুব দ্রুত সময়ে আমরা বন্ধুও পেয়ে যাই। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সহায়তায় আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ট্রেনিং নিয়ে এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে শত্রু মোকাবেলা করার পাশাপাশি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এখানে আছে দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম এবং ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ ও দুই লক্ষ বাঙালি নারীর সম্ভ্রম হারানোর বেদনাদায়ক ইতিহাস। সে সময়ে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রের প্রধান নেতা করে গঠিত অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে এবং আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী ও এগারোটা সেক্টরের কমান্ডারদের দক্ষ পরিচালনায় যে যুদ্ধ চলে তার সফল সূর্যোদয় হয় ১৬ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। সেদিন প্রায় ৯২হাজার সৈন্য নিয়ে পাকিস্তান আর্মি আত্মসমর্পণ করে নির্লজ্জভাবে। বিশ্ববাসী দেখেছে বাঙালির কাছে পাকিস্তানের মাথা নোয়ানো পরাজয়।
পৃথিবীর মানচিত্রে সেদিন আরো অনেক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হয় নতুন এক স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এই বিজয়ের পিছনে আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। এজন্যেই ৭ই মার্চ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ১৯৫২ খ্রিস্টিয় সাল থেকে শুরু হওয়া বাঙালির সংগ্রামের বিজয়ের পথ ধরে হেঁটে হেঁটে ১৯৭১ খ্রিস্টিয় সালের ৭ই মার্চে এসে যে শক্ত মাইলফলক বাংলাদেশের মাটিতে গেঁথে আছে; সেই মাইলফলক আমাদের মুক্তির গর্জন, আমাদের অর্জন এবং এই ৭ই মার্চ হচ্ছে আমাদেরকে খোঁজে পাওয়ার দিন। এই তারিখে বিশ্ববাসী দেখেছে বাঙালি জাতি সময়ে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে ভুল করে না এবং হ্যাঁ, বাঙালি সঠিক নেতা পেয়েছিলো।
[লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও সাহিত্যিক]

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com