1. [email protected] : admin2017 :
  2. [email protected] : Sunam Kantha : Sunam Kantha
রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৭:৩২ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে গেলে কী লাভ?

  • আপডেট সময় রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২২

আমীন আল রশীদ
সংবিধান এক জায়গায় স্থির থাকার বিষয় নয়। কোনও রাষ্ট্র যখন সংবিধান প্রণয়ন করে, তখনই সংশোধনের বিধান রাখে এ কারণে যে, যেকোনও সময় যাতে এখানে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন করা যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলেই চারবার সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছে। এরপর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধান মোট ১৭বার সংশোধন বা পরিবর্তন করা হয়েছে।
প্রতিবেশী ভারতের সংবিধান প্রণীত হয় ১৯৫০ সালে এবং পরের বছরই বেশ কয়েকটি সংশোধনী আনা হয়। ভারতের সংবিধানে এ পর্যন্ত মোট ১০৫ বার সংশোধনী আনা হয়েছে। সবশেষ সংশোধনী আনা হয় গত বছরের ১০ আগস্ট সমাজের অনগ্রসর বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তালিকা করার বিষয়ে রাজ্য সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর বিধান করতে।
অন্যদিকে ১৭৮৯ সালে কার্যকর হওয়ার পরে গত ২৩৩ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সংশোধন আনা হয়েছে মাত্র ২৭বার। সবশেষ সংশোধনী আনা হয় ১৯৯২ সালে, যে সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছিল ১৭৯১ সালে, অর্থাৎ সংবিধান কার্যকর হওয়ার দুই বছরের মাথায় এবং এই সংশোধনী আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারগুলো সময় নিলো দুইশো বছর! (বাংলাদেশের সংবিধান নানা প্রসঙ্গ, পৃষ্ঠা ১৫৯)।
জাপানের সংবিধান এক্ষেত্রে আরও কঠিন। ১৯৪৭ সালে কার্যকর হওয়ার পরে এখন পর্যন্ত একবারও সংশোধন হয়নি। ২০১৯ সালে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে (নিহত ৮ জুলাই, ২০২২) সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিলে তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। কিন্তু যখনই বাংলাদেশের সংবিধানে বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন আনা হয়েছে, তখনই বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়ার দাবি উঠেছে। প্রশ্ন হলো বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া অর্থ কী? ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত হওয়ার সময় সংবিধানের যে চেহারা ছিল, সেটি ফিরিয়ে আনা কি বাস্তবসম্মত বা প্রয়োজনীয়? কিংবা সেটি কি আদৌ সম্ভব?
বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার অর্থ কি সংবিধানের মূলনীতিতে ফিরে যাওয়া? ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি (জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু সেইসাথে পঞ্চম তফসিলে ৭ মার্চের ভাষণ, ষষ্ঠ তফসিলে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সপ্তম তফসিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র যুক্ত করা হয়। ৪(ক) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে জাতির পিতার প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বিধান করা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি-ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের বিধান করা হয়েছে। সংগঠনের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ৩৮ অনুচ্ছেদে নতুন দফা যুক্ত করে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে কোনও সংগঠন গড়ে তোলা যাবে না বলে বিধান করা হয় – যেগুলো বাহাত্তরের সংবিধানে ছিল না। সুতরাং এখন যদি বাহাত্তরের সংবিধান ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়, তাহলে কি এইসব বিধান বাতিল করা হবে? কারণ এগুলো বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ছিল না।
রাজনৈতিক ফোরামে অনেক দিন ধরেই বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন যে তারা বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে চান। সবশেষ গত ৫ নভেম্বর রাজধানীর ধানমন্ডিতে জাতীয় সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের ব্যাপারে অবশ্যই চিন্তা-ভাবনা আছে। তার কারণ হচ্ছে আমরা ৭২ এর সংবিধানে ফিরে যেতে চাই। কখন কোন সময় বাস্তবতার নিরিখে করা হবে বা করা হবে না এটা দল এবং সরকার সিদ্ধান্ত দেবে।’ (বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, ৫ নভেম্বর ২০২২)।
তার মানে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার তর্কটি আসলে ঘুরপাক খাচ্ছে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহ’ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইস্যুতে। যারা বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলেন বা দাবি জানান, তারা এই দুটি বিষয়ে বাইরে অন্য অনুচ্ছেদগুলো বিবেচনায় নেন না। এখন প্রশ্ন হলো, সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ ও রাষ্ট্রধর্ম বাদ দেয়া কি সম্ভব?
বাহাত্তরের মূল সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ‘রাষ্ট্রধর্ম’ বলে কোনও অনুচ্ছেদ ছিল না। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহ’ অন্তর্ভুক্ত করেন এবং অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে আরেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন।
অবশ্য সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ লেখার আইডিয়াটা যে জিয়াউর রহমানের মাথা থেকে এসেছে, বিষয়টা এমনও নয়। বরং ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার সময়ই এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য এ কে মোশাররফ হোসেন আকন্দ (ময়মনসিংহ ৬, জাতীয় পরিষদ ৮১)। যদিও গণপরিষদ এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বিসমিল্লাহ যুক্ত করেন। (অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, বাংলাদেশের সংবিধান নানা প্রসঙ্গ, পৃষ্ঠা ১১৭)।
অর্থাৎ দুজন সামরিক শাসকই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সুদৃষ্টি বা অনুক¤পা পাওয়ার জন্য যে দুটি ধর্মীয় বিষয় সংবিধানে যুক্ত করেছেন সে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু পরবর্তীতে সংবিধান সংশোধন করে অনেক বিষয় যুক্ত ও বিযুক্ত করা হলেও কোনও সংসদই সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের সাহস দেখায়নি। এমনকি সর্বোচ্চ আদালত পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনী অবৈধ বলে রায় দিলেও বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্মের ব্যাপারে কিছু বলেননি। মানে এগুলো সংবিধানে বহাল রয়েছে।
স্মরণ করা যেতে পারে, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত করার সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন দেশের ১৫ জন বরেণ্য ব্যক্তি। এর ২৩ বছর পরে ২০১১ সালের ৮ জুন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুল জারি করেন। কিন্তু রুল জারির প্রায় পাঁচ বছর পরে ২০১৬ সালের ৮ মার্চ হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চ রিট আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন।
রাষ্ট্রধর্ম ইস্যুতে আওয়ামী লীগের অবস্থানও পরিষ্কার। ২০১১ সালের ২৭ এপ্রিল সংসদ ভবনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে (ওই সংবাদ সম্মেলনে এই লেখকও উপস্থিত ছিলেন) দলের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘মানুষের ধর্ম থাকলেও রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকা উচিত নয়।’ তিনি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এখানকার সমস্যা হচ্ছে যাদের ধর্মে-কর্মে মন নেই, তারাই বেশি বেশি ধর্মের কথা বলেন। তবে ধর্ম বিষয়ে মানুষের অনেক আবেগও জড়িত। কাজেই রাষ্ট্রধর্মের বিষয়টি সংবিধান থেকে বাদও দেওয়া যাবে না।’
এখন প্রশ্ন হলো, ২০১১ সালে রাষ্ট্রধর্মের ব্যাপারে যেখানে দলের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন সভানেত্রী শেখ হাসিনা, সেখানে ১১ বছর পরে এসে কেন আইনমন্ত্রী বলছেন যে তাদের মধ্যে এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা আছে? এটি কি শুধুই সাংবাদিকদের প্রশ্নের কৌশলগত জবাব নাকি সত্যি সত্যিই এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগের অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে? রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করে সংবিধানকে ধর্মীয় আঁচড়মুক্ত করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ কি কোনও চাপের মধ্যে রয়েছে? আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যখন রাজনীতির মাঠ গরম হচ্ছে এবং নিত্যপণ্যের দাম, অর্থনৈতিক সংকট, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারসহ নানা ইস্যু নিয়ে সরকার যখন চাপে আছে, সে মুহূর্তে রাষ্ট্রধর্ম ইস্যুতে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে যে পরিস্থিতি আরও বেশি নিজেদের প্রতিকূলে নেবে না-সেটি বোঝাই যায়।
কিন্তু তারপরও ধরা যাক রাষ্ট্রধর্ম ইস্যুতে আওয়ামী লীগের চিন্তায় সত্যিই পরিবর্তন এসেছে এবং তারা সংবিধান সংশোধন করে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করে দিলো। এরপর যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হবে, সেটিও না হয় তারা মোকাবিলা করলো। কিন্তু তারপর কী হবে? দেশের মানুষ অনেক বেশি ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যাবে?
সংবিধান সংশোধন করে মানুষকে ধর্মনিরপেক্ষ বানানো যায়? বরং একটি জাতিকে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষাঙ্গনে যে ধরনের সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করার কথা ছিল- রাষ্ট্র গত ৫০ বছরে তার কতটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছে? রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করলেই কি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যাবে?
তারও চেয়ে বড় প্রশ্ন, বাহাত্তর সালের সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও ইসলাম না থাকলেও যদি আমরা মুসলমান থাকতে পারি, তাহলে এখন যদি সংবিধানে এ দুটি জিনিস না থাকে, তাহলে কি আমাদের মুসলমানিত্ব খর্ব হয়ে যাবে? মহানবীর (স.) রাষ্ট্রে কি কোনও রাষ্ট্রধর্ম ছিল? যদি না থাকে তাহলে আমাদের সংবিধানকে যে দুজন সামরিক শাসক ধর্মীয় রঙ দিলেন, তাতে তাদের নিজেদের ভোটের রাজনীতির বাইরে দেশ ও জনগণের কী লাভ হয়েছে?
তারও চেয়ে বড় প্রশ্ন, যেসব দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম নেই, সেখানে ধর্ম চর্চা হয় না? ধর্ম যে যার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে ঠিকই চর্চা করবেন এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও থাকবে। বরং বাহাত্তর সালে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপক্ষেতা যুক্ত করা হয়েছিল যে সুদূরপ্রসারি চিন্তা ও দর্শন থেকে, সেই চিন্তা ও দর্শন থেকে যে আমাদের রাজনীতিবিদরা, এমনকি মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান প্রণয়নে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগও সরে গেছে, সেটিই বড় ট্র্যাজেডি। অর্থাৎ যে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে যুক্ত করেছিলেন, সেই রাজনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় কিংবা সুবিধা গ্রহণের কথা বিবেচনায় রেখেই পরবর্তী কোনও সংসদই সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করেনি। অথচ সংবিধানের যে মূলনীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা – তার সঙ্গে রাষ্ট্রধর্মের বিধান সু¯পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।
রাষ্ট্রধর্ম বাদ দেওয়া যে কঠিন, সেটা সব রাজনৈতিক দলই জানে। সবশেষ আইনমন্ত্রী যখন বললেন যে ‘সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বাদ দেওয়ার অবশ্যই চিন্তা-ভাবনা আছে’ – তার পরদিনই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব ইউনুছ আহমাদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম একটি মীমাংসিত বিষয়। এ নিয়ে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি সুখকর হবে না। বাহাত্তরের সংবিধান ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আছে, থাকবে।’
তিনি ১০ নভেম্বর সকাল ১০টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমবেত হয়ে সেখান থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে গণমিছিল সফলের জন্য সবাইকে আহ্বানও জানান। (কালের কণ্ঠ, ৭ নভেম্বর ২০২২)। দেখা গেলো এদিন অর্থাৎ ১০ নভেম্বর সকালে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেট থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয় এবং এটি সচিবালয়ের দিকে যেতে থাকলে জিপিওর মোড়ে পুলিশ তাদের আটকে দেয়।
অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, আওয়ামী লীগের আমলে যদি সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বাদ দেয়া হয়, তখন ইসলামি দলগুলো যে আন্দোলন শুরু করবে, সেখানে বিএনপিও সমর্থন দেবে। জাতীয় পার্টিও দেবে। কারণ তাদের নেতা এইচ এম এরশাদই সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত করেছেন। তার মানে এই একটি ইস্যু নিয়ে পুরো দেশ গরম হয়ে যাবে। তাহলে সরকার সেই ঝুঁকিটা কেন নেবে? মূলত এই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়েও রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা হয়নি বা সম্ভব হয়নি। ফলে এটি ধারণা করাও অমূলক নয় যে, ভবিষ্যতেও কোনও সরকার সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বাদ দিতে পারবে না। আর যদি না পারে তাহলে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলাও কোনও অর্থ বহন করে না।
সমস্যা আরও আছে। যেমন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় (২০১১) নতুন একটি অনুচ্ছেদ (৭খ) যুক্ত করে ৫০টিরও বেশি অনুচ্ছেদকে মৌলিক কাঠামো হিসেবে ঘোষণা করে এগুলো সংশোধনের অযোগ্য করা হয়েছে- যেখানে বলা হয়েছে ১৪২ অনুচ্ছেদে যা কিছুই থাকুক না কেন, মৌলিক কাঠামো হিসেবে ঘোষিত এই অনুচ্ছেদগুলো সংশোধন করা যাবে না। এর মধ্যে রাষ্ট্রধর্মের বিধানসম্বলিত ২ক অনুচ্ছেদও রয়েছে। তার মানে সংবিধানের এই বিধান মানতে গেলে রাষ্ট্রধর্মস¤পর্কিত অনুচ্ছেদ সংশোধনের সুযোগ সাংবিধানিকভাবেই নেই।
আবার এ প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যে, ১৫৩টি অনুচ্ছেদের মধ্যে ৫০টিকেই সংশোধন অযোগ্য ঘোষণা করা কতটা যৌক্তিক এবং ভবিষ্যতে কোনও সংসদ যদি দুই তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদটিই বাতিল করে দেয়, তখন মৌলিক কাঠামো হিসেবে ঘোষিত এই অনুচ্ছেদগুলো সংশোধনের পথে কোনো বাধা থাকবে কি না? [সংকলিত]
লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com