1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ০২:৩৬ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

সামনে ঝড় : আওয়ামী লীগ কতটুকু প্রস্তুত

  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২২

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ::
শেখ হাসিনা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিয়ে দেশকে যেভাবে বদলে দিতে পেরেছেন, সেটি তাঁর একক দেশপ্রেম এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার কারণেই ঘটেছে। আওয়ামী লীগ সে কারণে তাঁর কাছে ঋণী, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষীও। ১৫ নভেম্বর মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের ১০টি জেলার নেতাদের সঙ্গে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে বৈঠক করেছেন। গণমাধ্যমে এটিকে তৃণমূলের সঙ্গে দলীয় প্রধানের বৈঠক হিসেবে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে। যদিও তৃণমূল বলতে জনগণের মধ্যে যাঁরা অবস্থান করেন, সাধারণত তাঁদেরই বোঝানো হয়ে থাকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁরা প্রায় সবাই জেলার বা মহানগর পর্যায়ের কমিটির সভাপতি, সাধারণ স¤পাদক বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবির নেতা ছিলেন। শীর্ষ পর্যায়ের ৬০-৭০ জন জেলা নেতাই মূলত প্রথম দিনের বৈঠকে ছিলেন। প্রায় সাড়ে তিন বছর যাবৎ তাঁরা দলীয় প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু করোনার কারণে সেই সাক্ষাৎ বিলম্বিত হয়। তা ছাড়া, আওয়ামী লীগের সভাপতি যেহেতু সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন, তাই এ ধরনের বৈঠকের সময় বের করা তাঁর জন্য মোটেও সহজ কাজ নয়। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে অন্যান্য জেলার নেতাদের সঙ্গেও তিনি সামনের দিনগুলোতে সময় করে বৈঠকে বসবেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে যেহেতু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাই দলকে গোছানোর তাগিদ থেকে দলীয় প্রধান হিসেবে তিনি উদ্যোগটি নিয়েছেন। তা ছাড়া, বিএনপি, জামায়াত এবং ছোট ছোট দুই-তিন ডজন নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল আগামী নির্বাচন উপলক্ষে বেশ কিছু দাবি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিএনপি এরই মধ্যে তাদের দলকে মাঠপর্যায়ে উজ্জীবিত করার জন্য বেশ কিছু সমাবেশ করেছে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ও হতাশায় নিমজ্জিত বিএনপিকে এখন কিছুটা চাঙা হতে দেখা যাচ্ছে। যদিও সাংগঠনিকভাবে কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের তেমন কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি, তারপরও দলের নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগ ও সরকারের বিরুদ্ধে অনেকটাই এককাট্টা হয়ে উঠেছেন। এই মুহূর্তে যেহেতু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে বাংলাদেশেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানির সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি প্রভাব বিস্তার করেছে; তাই বিএনপিসহ বিরোধী শক্তিসমূহ সরকারকে কাবু করার জন্য বর্তমান সময়টিকে মোক্ষম বলে মনে করছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের মধ্যেও প্রায় সর্বত্রই দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং ও সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা চলছে।
আগামী নির্বাচনের আগে বিএনপি ও আওয়ামীবিরোধী অন্যান্য রাজনৈতিক দল মাঠ দখল করার চেষ্টা হাতছাড়া করতে চাইছে না। বিএনপির অন্যতম প্রধান দাবিই হচ্ছে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী থেকে মুক্ত করা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে দেশে ফিরিয়ে আনা। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে শুধু দলীয় কর্মী-সমর্থকদেরই নয়, অন্য আরও কিছু দলকে স¤পৃক্ত করার চেষ্টাও করছে। ওই সব দলের সঙ্গে বিএনপির নেতারা বৈঠকে বসেছেন। জোট কিংবা যুগপৎভাবে সরকার হটাও আন্দোলনে তাদের কাছে পাওয়ার কৌশল নিয়ে আলোচনা করছেন।
ভবিষ্যতে তাদের ক্ষমতার অংশীদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে নামানোর কাজ স¤পন্ন করে এনেছেন বলেও প্রচার করা হচ্ছে। যদিও রাজনৈতিক মহল খুব ভালো করেই জানে যে নামসর্বস্ব এসব রাজনৈতিক দলের তেমন কোনো গণভিত্তি নেই। তবে সংখ্যার একটি গুরুত্ব তো আছেই।
জামায়াত ও বিএনপির পার¯পরিক বিশ্বাস, আস্থা ও নির্ভরশীলতা প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও ভেতরে-ভেতরে সেটা বেশ সুদৃঢ়। তাই এটা মনে করা হয় যে সরকারবিরোধী জোটবদ্ধ বা যুগপৎ আন্দোলনের মূল শক্তিই হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। অন্যরা তাদের সংখ্যার ভার কিছুটা বাড়াবে। শিগগিরই এই সরকার উৎখাতে জোট মাঠে নামবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিএনপি আগে বিভাগীয় সমাবেশ করার মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের মনোভাব চাঙা করার চেষ্টা করছে। আগের তুলনায় তারা দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ, বিভেদ ইত্যাদিকে পাশে ঠেলে অনেকটাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ডাকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। সমাবেশগুলোতে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরাও অংশ নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতা থেকে দূরে থাকায় ভবিষ্যতে তাদের সামনে ‘কঠোর সংগ্রামে’ অবতীর্ণ হওয়ার বিকল্প নেই। সে কারণে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে আন্দোলনের মানসিকতা কমবেশি গড়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। এটিকেই বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব ডিসেম্বর শেষে বা পরবর্তী সময়ে যুগপৎ বা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মধ্যে যে ধরনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি তৃণমূল থেকেই নেওয়া প্রয়োজন বলে দলটির শুভানুধ্যায়ীরা মনে করেন, সে ক্ষেত্রে ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের মধ্যে গ্রাম থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত এখনো চুপচাপ পরিস্থিতি দেখার অবস্থা বিরাজ করছে। নিজেদের মধ্যে দলীয় সংহতি যেভাবে আশা করা গিয়েছিল, সেটি ১৫ বছরে খুব একটা ঘটেনি। বরং ক্ষমতায় থাকলেও জনগণের সঙ্গে দলের আশানুরূপ নৈকট্য বাড়েনি। স্থানীয় পর্যায়ে নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর চেয়ে পদ-পদবিপ্রত্যাশী নেতা-নেত্রীর প্রবল আধিক্য ঘটেছে। দলে ঐক্যের চেয়ে অনৈক্যই বেড়েছে। বিভিন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া না-পাওয়ার বিরোধ কোথাও কোথাও আত্মঘাতী বিসংবাদে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেই দলের নাম ব্যবহার করে নিজে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন। অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। একে অপরের মুখ দেখাদেখিও অনেক জায়গায় বন্ধ রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূলের এসব সমস্যার সমাধানে তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেননি। এই না পারার কারণও অনেক সময় বোধগম্য হয় না। ফলে সবকিছুর জন্য তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে দলীয় সভাপতির দিকে। এটা যে শুধু একা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বৈশিষ্ট্য তা নয়; বিএনপি, জাতীয় পার্টি এমনকি নামসর্বস্ব অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যেও প্রবলভাবে বিরাজ করছে।
দলীয় নেতারা বলার চেষ্টা করেন যে বড় দলে এ রকম সমস্যা থাকবেই। আসলে এর মাধ্যমে বড় দলগুলো সমস্যাকে জিইয়ে রাখার অবস্থান থেকে সরতে পারছে না। দলগুলোর মধ্যে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। দলে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের ন্যূনতম শাস্তি দেওয়ার উদাহরণও খুব বেশি দেখা যায় না। বহিষ্কারের ঘটনাও খুবই সামান্য। বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল থেকে বহিষ্কারের কথা বলা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে সেটা ঘটতে দেখা যায় কম। আওয়ামী লীগে তাই গত ১৪ বছরে অনেক আবর্জনা জমা হয়েছে। সে জন্যই দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বড় দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ মাঠপর্যায়ে এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। সেখানে অনেকেই অনেকের নিয়ন্ত্রণ মানেন না, কর্মসূচিও তাই নেওয়া যায় না, স্থিতাবস্থা বজায় রাখাই শ্রেয় বলে মনে করা হয়। কিন্তু যখনই দলের সভাপতির ডাক আসে, তখনই সবাই যে যার মতো করে ছুটে আসেন। এই আসাটাই অনেকটা লোক দেখানো। কিন্তু আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলের জন্য একান্তভাবে প্রয়োজন আওয়ামী লীগের আদর্শের প্রতি একাত্ম থাকা। আওয়ামী লীগের আদর্শ তো ’৭৫-পরবর্তী ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলগুলো কঠিন, জটিল এবং ¯্রােতের বিপরীতে নিয়ে গেছে। এসব মোকাবিলার জন্য যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সাংগঠনিক দৃঢ়তা প্রয়োজন, আওয়ামী লীগে তারও ঘাটতি রয়েছে।
বিপরীত দিকে বিএনপির জন্য রাজনীতি খুবই সহজ। ভারতবিরোধিতা, সাম্প্রদায়িকতা, অপপ্রচার, গুজব, ইতিহাস বিকৃতি, নিন্দার ছড়াছড়ি ইত্যাদিতে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারলেই অনেক সময় নির্বাচনেও বাজিমাত করা যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো সেভাবে নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে পারে না। ১৯৯৬, ২০০৮-এর নির্বাচনে জনগণকে বিএনপির রাজনীতির দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর বুঝিয়েই বিজয় লাভ করতে হয়েছে। ২০১৪ সালে জামায়াত-বিএনপি নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য যে অগ্নি-সন্ত্রাস করেছে, তা যদি আওয়ামী লীগ কোনো দিন করত, তাহলে আওয়ামী লীগের নাম-নিশানা এ দেশে অনেক আগেই মুছে যেত। এমনকি ২০০১-০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত আওয়ামী লীগকে যেভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে, সেই সব যদি আওয়ামী লীগ করত, তাহলে রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগ দাঁড়াতে পারত – এমনটি ভরসা করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বিএনপির পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব, কারণ সমাজ মনস্তত্ত্ব, রাজনৈতিক অনগ্রসর চিন্তা এবং ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার অপব্যবহার আমাদের দেশে সমাজমানসে রাজনীতির সমার্থক হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগেও এসবের ছায়া কমবেশি দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যেভাবে জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শে মানুষকে উজ্জীবিত করার প্রধান প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল, সেটি ’৭৫-এর পর থেকে অনেকের অজান্তে বিভাজিত ও দুর্বল হওয়ার প্রক্রিয়ায় ধীরগতিতে এগিয়ে গেছে। সে কারণে এখন আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে সকল পর্যায়ে রাজনীতির চর্চার চেয়ে ক্ষমতা ও ভোগদখলের মনোবৃত্তির বিস্তার ঘটেছে, ত্যাগের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে চাওয়া-পাওয়া। সমস্যার এই জায়গাটিতে যতক্ষণ হাত না দেওয়া হবে, ততক্ষণ তৃণমূল থেকে ওপর পর্যন্ত দলকে একশিলায় দাঁড় করিয়ে পরিচালনা করা খুব সহজ হবে না।
শেখ হাসিনা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিয়ে দেশকে যেভাবে বদলে দিতে পেরেছেন, সেটি তাঁর একক দেশপ্রেম এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার কারণেই ঘটেছে। আওয়ামী লীগ সে কারণে তাঁর কাছে ঋণী, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষীও। কিন্তু তিনি ছাড়া অন্যরা যে তৃণসম, সেটি অনেকে বুঝলেও তাঁর পথ ও আদর্শ কতজন ধারণ করতে চেষ্টা করেছেন, সেটিই মস্ত বড় প্রশ্ন। শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে দলের সবাইকে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার জন্য বলেছেন। তাঁরা কি সেটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন? সামনে ঝড় আসছে। সেই ঝড়ে তাঁরা উড়ে যাবেন, নাকি টিকে থাকবেন, সেটা নির্ভর করছে দলের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নেতা-কর্মীরা নেত্রীর নির্দেশ কতটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন, তার ওপর।
লেখক: মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী, অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com