1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ০৭:২৬ পূর্বাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

রাণীগঞ্জ সেতু উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী : সেতু পেয়ে উচ্ছ্বসিত সুনামগঞ্জবাসী

  • আপডেট সময় সোমবার, ৭ নভেম্বর, ২০২২

বিশেষ প্রতিনিধি::
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুনামগঞ্জের ‘দক্ষিণের দুয়ার’ খ্যাত জগন্নাথপুর উপজেলার কুশিয়ারা নদীর ওপর নির্মিত রাণীগঞ্জ সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে হাওর-ভাটির যোগাযোগে নতুন দিনের উন্মোচন করেছেন। পাগলা, জগন্নাথপুর, রাণীগঞ্জ ও আউশকান্দি সড়ক ও রাণীগঞ্জ সেতুর ফলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে ৫৫ কিলোমিটার দূরত্ব কমেছে। এতে অর্থ ও সময় অপচয় রোধের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি এই সেতুসহ সুনামগঞ্জের আরো ১৬টি সেতু উদ্বোধন করেন। এই সেতুগুলো আঞ্চলিক যোগাযোগের উন্নয়নেও বিরাট ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এদিকে রাণীগঞ্জ সেতু উদ্বোধনের ফলে জেলাবাসীসহ স্থানীয় ভীষণ আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত। উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে সেতু এলাকার গ্রামগুলোতে। বিভিন্ন এলাকা থেকে সেতুতে এসে ভিড় করছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে সেতুটি উদ্বোধনের পর পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান আনুষ্ঠানিকভাবে টোল দিয়ে সেতুর টোল কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
সোমবার বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি সেতুগুলোর প্রত্যেকটির নাম বলে বলে সেতুগুলো উদ্বোধন করেন। সুনামগঞ্জের সেতুগুলোর নাম বলা হলে উপস্থিত সাধারণ মানুষ করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। অভিনন্দনের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সুনামগঞ্জবাসীকে অভিনন্দন জানান। সেতুর উদ্বোধন শেষে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনকে সঞ্চালনা করতে আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। সঞ্চালনার সময় জেলা প্রশাসকপ্রধামন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। এসময় জেলা প্রশাসক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সুনামগঞ্জের লোক মহাজন রাধারমণ দত্তের ধামাইল ‘জলে গিয়েছিলাম সই’ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত বাউল স¤্রাট শাহ আবদুল করিমের লেখা গান দলীয়ভাবে পরিবেশন করে শুনানো হয়।
ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে রাণীগঞ্জ প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ড. মোশারফ হোসেন, সিলেটের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহমদ, সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. এহসান শাহ, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা সিদ্দিক আহমদ, সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাড. শামছুন নাহার বেগম শাহানা রব্বানী, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত, জেলা আ.লীগের সহ-সভাপতি নোমান বখত পলিনসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। উদ্বোধন অনুষ্ঠান দেখতে দূর দূরান্ত থেকে কয়েক হাজার মানুষ উপস্থিত হন রাণীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে।
সরেজমিন উদ্বোধনের পর দুপুর সাড়ে ১২টায় রাণীগঞ্জ সেতুতে গিয়ে দেখা যায়, সিলেট দীর্ঘ সেতুটির দুই দিকে এবং আড়াই কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ জুড়ে সারি সারি রঙিন নিশানা টাঙানো হয়েছে। মাইলফলকগুলোকেও করা হয়েছে রঙিন। দুপুরের কড়া আলোয় রঙিন হয়ে ওঠেছে সেতুর দুই দিক। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা ব্যানার ও ফেস্টুন টাঙিয়েছেন। হাজারো মানুষ হেঁটে পারি দিচ্ছেন স্বপ্নের সেতু। তরুণ তরুণীরা সেলফিসহ নানা ভঙ্গিতে ছবি তুলছেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত নেতাকর্মীরা করেছেন আনন্দ মিছিল।
এসময় অবাক বিস্ময়ে সেতুটি দেখছিলেন সেতু এলাকার বাসিন্দা খাগাউড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদিন। তার পরনে মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রশাসনের দেয়া মুজিব কোট। দুপুরের আলো তার মুখায়বকে আরো উজ্জ্বল করেছে। আনন্দের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তাই আনন্দে শরিক হতে এসেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন বলেন, বিএনপির সরকার ২০০১ সালে আমাদের রাণীগঞ্জ সড়ক ও সেতুর প্রকল্প কেটে দিয়েছিল। তারপর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ এসে আবারও একনেকে পাস করে কাজ শুরু করে। আজ আমাদের স্বপ্নের সেতুটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করলেন। আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, বয়স হয়েছে, আগের মতো বেরুতে পারিনা। কিন্তু এই আনন্দ দিনে ঘরে বসে থাকতে পারিনি। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আনন্দ উদযাপন করতে ছুটে এসেছি। সেতুটি পেয়ে আমাদের সব বয়সের মানুষ আনন্দিত।
জগন্নাথপুর উপজেলার যাত্রাপাশা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা নিশিকান্ত ঘোষও সেতু দেখতে এসেছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নিশিকান্ত বলেন, আমাদের জীবনে এখন পড়ন্ত বেলা। আমাদের শেষ বয়সে এসে সবচেয়ে বড়ো একটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখলাম। এখন আমাদের জগন্নাথপুর তথা জেলার মানুষ সহজে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দ্রুত সময়ে যোগাযোগ করতে পারবেন। আমাদের কৃষিপণ্যের সহজ বাজারও তৈরি হবে। ব্যবসাবাণিজ্যসহ সার্বিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসবে এই সেতুটি। আমরা ভীষণ খুশি।
জগন্নাথপুর উপজেলার ইছগাঁও গ্রামের মুরুব্বী লেবাছ মিয়া (৭২) এসেছেন সেতু দেখতে। তার সামনে পিছনে শত শত মানুষ সেতু দেখছে আর ছবি তুলছে। তিনি বিস্ময়ে তাদের দেখছেন। লেবাছ মিয়া বলেন, ‘আমরারে ই সেতু দিছইন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর আমরার মন্ত্রী এমএ মান্নান সাব। অনে আমরা তাড়াতাড়ি ঢাকা যাইতাম পারমু। আমরা রাস্তার চলাচলে সুবিধা অইছে। ঢাকা তনি ব্যবসায়ীরা দ্রুত মাল আনা নেওয়া করতা পারবা। আমরার বহুত উপকার করছে ই সেতু।’
গন্ধর্বপুরের তরুণ হারুন মিয়া এসেছেন সেতু দেখতে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে তিনি ছুটে এসেছেন সেতুতে। এসে জনতার সঙ্গে মিশে আনন্দ উদযাপন করছেন তিনি। এই তরুণ বলেন, ‘এটি আমাদের স্বপ্নের সেতু। স্বাধীনতার ৫১ বছর পর আমরা জগন্নাথপুরবাসী এত বড় বাজেটের উন্নয়ন পাইনি। এই সেতু আমাদের এলাকায় কলকারখানা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আমাদের জমি-জামারও মূল্য বাড়বে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের দুয়ারও খুলবে সেতুটি।’
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম প্রাং বলেন, ২০১৪ সালের ২৫ জুন একনেকসভায় সেতুর জন্য ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্প পাস করা হয়। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ-চায়নার যৌথ প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রেলওয়ে ২৪ ব্যুরো গ্রুপ কম্পানি লিমিটেড ২৪ বি এবং বাংলাদেশের এমএম বিল্ডার্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড যৌথভাবে কাজ শুরু করে। ২০১৭ সালের ১৪ জানুয়ারি সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। করোনার কারণে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেতুর কাজ বিলম্বিত হয়। তিনি আরো জানান, চিনা প্রতিষ্ঠানটি করোনার কারণে তাদের সেতু বিশেষজ্ঞদের না পাঠানোয় প্রায় এক বছরের অধিক সময় থমকে ছিল কাজ। পরে দ্রুত কাজ শেষ করতে সড়ক বিভাগ পদ্মা ও মেঘনা-গোমতি নদীতে সেতু নির্মাণে যুক্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দেশীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কাজ বাস্তবায়ন শুরু করে। এই সেতুর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দেশে একসঙ্গে ‘আই গার্ডার’ ও ‘বক্স গার্ডারের’ সমন্বয় করা হয়েছে। ৬০টি আই গার্ডার, ১২টি স্ল্যাব এবং ১৫ স্প্যানের সমন্বয়ে ৭০২.৩২০ মিটার দৈর্ঘ্য ১০.২৫ মিটার প্রস্থ এই সেতুটি সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বড়ো সেতু। সেতু নির্মাণ প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সেতুটি উদ্বোধনের পর পরিকল্পনামন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুতে টোল দিয়ে টোল কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। তিনি বলেন, এই সেতুর ফলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সুনামগঞ্জবাসীর ৫৫ কিলোমিটার পথ কমেছে।
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, রাণীগঞ্জ সেতু আমাদের হাওরাঞ্চলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই অঞ্চলে আরো বড়ো বড়ো প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি হাওরবাসীর উন্নয়নের প্রতি আন্তরিক। তিনি যতদিন আছেন আমাদের উন্নয়ন নিয়ে ভাবতে হবেনা। তবে এ কারণে তাকে আমাদের সাহস ও সমর্থন দিতে হবে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com