1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

টাঙ্গুয়ার প্রাণ-প্রকৃতি পুনরুদ্ধার কাজ শুরু

  • আপডেট সময় শুক্রবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২২

শামস শামীম ::
চার বছর অরক্ষিত থাকার পর আবারও টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু করেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো। গত ২৭ অক্টোবর বাস্তবায়নকারী সংস্থার বিশেষজ্ঞরা এলাকা পরিদর্শন করেছেন। মতবিনিময় করেছেন এই অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে কাজ করেন এমন লোকজনের সঙ্গে। তবে স্থানীয় অভিজ্ঞজন জানিয়েছেন, ২০০৩-২০১৮ সন পর্যন্ত সুইস দাতা সংস্থা, আইইউসিএন ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনার পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষার বদলে আরো সংকটাপন্ন হয়েছে। স্থানীয় মানুষজন সচেতনতার বদলে যে কোন উপায়ে টাঙ্গুয়ার সম্পদ অবৈজ্ঞানিকভাবে ও নির্বিচারে ভোগে তৎপর হয়েছেন। টাঙ্গুয়ার হাওরের মাছের লোভে হাওরের জলমহাল পকেটগুলোতে গড়ে ওঠেছে নতুন নতুন বাসস্থান। তাই টাঙ্গুয়ার হাওরে গড়ে ওঠা জনবসতিকে লোকালয়ে নিয়ে এসে হাওরকে কয়েক বছর বিশ্রামে রাখলেই জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে বলে তারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইউএসএআইডি ইকোসিস্টেমস, প্রতিবেশ অ্যাকটিভিটি বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ দুটো প্রধান এলাকায় প্রতিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নমূলক এই কাজ কাজ করবে ‘কেমোনিক্স ইন্টারন্যাশনাল’। সহযোগী হিসেবে থাকবে ‘আরণ্যক ফাউন্ডেশন’, ‘সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস), ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইসিসিসিএডি)’। এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি খাত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও জনসমষ্টি এবং অন্যন্য অংশীজন এ কার্যক্রমে যুক্ত থাকবেন। ৫ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কাজ চলতি বছর থেকে শুরু হয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের পাশাপাশি এই প্রকল্পে সিলেটের রাতারগুল, হাইল হাওর, হাকালুকি হাওর, খাদিমনগগর জাতীয় উদ্যান, সাতছড়ি উদ্যান, রেমা কালেঙ্গা, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান নিয়েও কাজ করা হবে। এই ব্যবস্থাপনায় পলিসি লীড হিসেবে কাজ করবেন ড. আজহারুল হাসান মজুমদার, মো. মাজহারুল ইসলাম জাহাঙ্গীর, স্পেশালিস্ট ওবায়দুর ফাত্তাহ তানভির, স্পেশালিস্ট মহিবুর রহমান সাগর বিন হাবিব, স্পেশালিস্ট মাসুদ সিদ্দিকী প্রমুখ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা গেছে, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রতিবেশভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবেশগত সুশাসনকে শক্তিশালী করা, লক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য এলাকায় জীববৈচিত্র্যের ওপর মূল হুমকিসমূহ নিরসন করা এবং টেকসই প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে উৎসাহিত করে বাজারনির্ভর প্রণোদনার প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যেই এ কাজ শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট জনসমষ্টি ও অংশীজনদের সক্ষমতা টেকসই পর্যায়ে উন্নীত করার মাধ্যমে প্রকল্প নির্ভরতা কমানোই এর অন্যতম লক্ষ্য। যাতে স্থানীয় অংশীজন ক্ষমতায়িত হয়ে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে পারেন।
৯ হাজার ৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত হাওরটি তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলায় বিস্তৃত। ১৯৯৯ সনে টাঙ্গুয়ার হাওর পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার পর ২০০০ সনের ২০ জানুয়ারি সুন্দরবনের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক রামাসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা ও প্রতিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার ৬০ বছরের ইজারাপ্রথা বিলোপ করে। হাওর এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি, সম্পদ সংরক্ষণ, টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাওরের জীব ও প্রাণীবৈচিত্র্য আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে হাওরটি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ২০০৩ সাল থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। ২০১৮ সনে শেষ হয়েছে ব্যবস্থাপনার কাজ। তবে বর্তমানে ২৪ জন আনসার চারটি ক্যাম্পে থেকে হাওর সুরক্ষার কাজ করছেন।
৫ বছর মেয়াদী নতুন প্রকল্প টাঙ্গুয়ার জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতেই আবারও নেওয়া হয়েছে। মাঠের কাজও শুরু হয়ে গেছে। তবে এর আগে হাওরের প্রাণ ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করেন, বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাদাভাবে মতবিনিময় করছেন প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ লোকজন। গত ২৭ অক্টোবর সুনামগঞ্জ শহরের জামতলায় প্রকল্পের বিশেষজ্ঞরা একটি মতবিনিময় করেছেন। মতবিনিময় সভায় স্থানীয় অভিজ্ঞজনরা জানিয়েছেন গত দেড় দশকে টাঙ্গুয়ার হাওর সম্পদ রক্ষার নামে নির্বিচারে সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। মাঠের কাজ বাস্তবায়নকারীরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় এবং স্থানীয়দের নির্বিচারে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে আর্থিকভাবে লাভবানের ফলে বিরান হয়েছে হাওরটি। এখন সুরক্ষায় সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হবে মানুষকে আস্থায় নিয়ে আসা।
মতবিনিময়ে উপস্থিত শাল্লা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা হিরন্ময় রায় প্রকল্পের বিশেষজ্ঞদের জানান, সম্পদ সুরক্ষার বদলে ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনায় টাঙ্গুয়ার হাওরের মানুষ আরো চতুর হয়েছেন। কিভাবে নির্বিচারে সম্পদ ভোগ করা যায় এই মানসিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের। মাছের লোভে অভয়াশ্রম এলাকায় গড়ে তুলেছেন আবাসন। টাঙ্গুয়ার হাওরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এসব লোকালয় উচ্ছেদ করে তাদেরকে অন্যত্র নিরাপদ স্থানে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তাহলেই সুরক্ষিত হবে সম্পদ। প্রতিবেশের সুরক্ষা হবে।
সাংবাদিক খলিল রহমান বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের বিশ্রাম দরকার। একদিকে পর্যটকদের অত্যাচার অন্যদিকে স্থানীয়দের লোভী মনোভাব টাঙ্গুয়ার হাওরকে বিপন্ন করেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরকে কেবল কয়েক বছর লকডাউনে রাখতে পারলেই স্বাভাবিকভাবেই আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের পরিবেশকর্মী রিপচান হাবিব বলেন, অপুষ্টিতে ভোগছে টাঙ্গুয়ার হাওর। মাছ, গাছ, পাখি শূন্য হয়ে পড়ছে হাওরটি। মানুষ দিনদিন লোভী হচ্ছে। সম্পদ রক্ষার চেয়ে সম্পদ অবাধে ভোগ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান দেওয়া হলে তাদের লোভ থেকে ফেরানো যাবে।
মতবিনিময়সভায় উপস্থিত হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেনরায় বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত এলাকা। কিন্তু এখানে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে হাওরকে পুকুর করা হয়েছে। এতে মাছের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অবৈজ্ঞানিকভাবে কাজ করার ফলে শুধু টাঙ্গুয়ার হাওর নয় সুনামগঞ্জের সবগুলো হাওরই ঝুঁকিতে আছে।
শিক্ষক মোদাচ্ছির আলম বলেন, মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থানের ফলে পলিমাটি, সালফার, ক্রাশার মেশিনের ডাস্ট হাওরের প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সংরক্ষিত এলাকায় এসব থাকার কথা নয়। তারপরও দিনদিন এসব হচ্ছে। এতে প্রকৃতি বিনষ্ট হচ্ছে। এসব কাজে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে।
বাস্তবায়নকারী সংস্থা কেমোনিস্টের পলিসি লীড ডা. আজহারুল হাসান মজুমদার বলেন, এই প্রতিবেশ প্রকল্পের মূল কর্মপন্থা হলো সহযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। বাংলাদেশে প্রতিবেশ সংরক্ষণের জাতীয় কৌশল হিসেবে সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিটি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে সহ-ব্যবস্থাপনার মূল সীমাবদ্ধতাগুলি নিরসনের মাধ্যমে পদ্ধতিটি যাতে সফলভাবে কাজ করতে পারে সে লক্ষ্যেই টাঙ্গুয়ায় নতুন এই উদ্যোগ। পাশাপাশি অংশীজনদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বহুবিধ হুমকিসমূহ মোকাবিলায় পারদর্শী করে তুলতে চেষ্টা করবো আমরা। এর মাধ্যমে অংশীজনদের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হবেন; তাঁদের মানসিকতা ও আচরণগত পরিবর্তন উৎসাহিত হবে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com