1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
মঙ্গলবার, ২১ জুন ২০২২, ১২:২৭ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

‘জাতীয় শুদ্ধাচার চর্চা’ সফল হোক

  • আপডেট সময় সোমবার, ৩০ মে, ২০২২

:: লতিফুর রহমান রাজু ::
বর্তমান সমাজবাস্তবতায় ‘শুদ্ধাচার’ বলে কোনও কিছু আছে বলে মনে হয় না। কারণ যে-সমাজে মসজিদের ভেতরে ইমামকর্তৃক দশ বছরের নাবালিকা ধর্ষিত হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে সিনহা হত্যাকারী অনুপ্রবিষ্ট হয়ে পড়ে, ক্যান্টনমেন্টের ঝোপের ভেতরে গরল তরলে মাখা তনুর লাশ পড়ে থাকে, দুর্নীতির অপ্রতিরোধ্যতাকে ব্যবহার করে পি কে হালদার টাকা পাচার করে, বিশেষ বাহিনীর উচ্চমর্যাদার একটি সশস্ত্রদল একজন মাফিয়ার নির্দেশে সাতসাতটি খুন করে পার পাওয়ার তালে থাকে, মাদকব্যবসায়ী জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের আসন অলঙ্কৃত করে, স্বাধীনোত্তর কাল থেকেই কৃষকবান্ধবতার নামে কৃষকসমাজের উপর কাঠামোগত সহিংসতা অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলছেই, সমাজতন্ত্রের চালে দেশ চালানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করলে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে সপরিবারে গুলি খেয়ে মরতে হয় এবং হ্যাঁ-না ভোট-এর মাধ্যমে ‘গণতন্ত্রের সূত্রপাত’ সূচিত হয় এমন একটি দেশে ‘শুদ্ধাচার চর্চা’র বিষয়টি সত্যি একটি অবাক করার বিষয় তো বটেই এমনকি শুনতেই কেমন আজগুবি মনে হয়। কিন্তু তারপরও বাস্তবে এই কর্মসূচি বাংলাদেশের প্রতিটি প্রশাসনিক পরিসরে চলছে বিগত কয়েক বছর যাবৎ।
সুনামগঞ্জের প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভিন্ন পদবি ও গ্রেড অনুসারে গত চার বছরে মোট আটজন ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার’ লাভ করেছেন। তাঁরা হলেন, ২০১৮ সনে জনাব কামরুজ্জামান [অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), সুনামগঞ্জ], জনাব শাহীনুর রহমান (সাঁটলিপিকার কাম ক¤িপউটার অপারেটর); ২০২০ সনে জনাব মোহম্মদ শরীফুল ইসলাম, [অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), সুনামগঞ্জ], জনাব সমীর বিশ্বাস (উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বিশ্বম্ভরপুর), জনাব মিন্টু রঞ্জন ধর (লাইব্রেরিয়ান); ২০২১ মনে জনাব মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী [উপপরিচালক, স্থানীয় সরকার ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), অতিরিক্ত দায়িত্ব, সুনামগঞ্জ], জনাব জেবুন নাহার শাম্মী (উপজেলা নির্বাহী অফিসার, শান্তিগঞ্জ), জনাব সাগর তালুকদার (অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক)। বোধ করি করোনা বিপর্যয়ের কারণে ২০১৯ সনে কাউকে পুরস্কার দেওয়া যায় নি বা দেওয়ার দরকার পড়ে নি।
এই ‘শুদ্ধাচার কৌশল’টি কী? এর সংজ্ঞার্থ কী বা কাকে বলে? এই শুদ্ধাচার কে কার প্রতি করবেন, এর চর্চাক্ষেত্রের সীমা কী, অর্থাৎ কারা এই শুদ্ধাচারের লক্ষ্য বা কারা এর সঙ্গে সম্পর্কিত থাকবেন? মনের ভেতরে এইসব প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উপজিত হয়, যে-কারও ক্ষেত্রে এমন হতে পারে, হওয়াটাই স্বাভাবিক। এইসব প্রশ্নের সব ক’টির সরাসরি উত্তর না পেলেও এর আদর্শ ও উদ্দেশ্য কী, তার যৎকিঞ্চিৎ হদিস পাওয়া যায় ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর-এ প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের বিবরণীতে। সেখানে প্রসঙ্গটিকে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে বলা হয়েছে, “সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়: জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল” এবং আরও বলা হয়েছে, “শুদ্ধাচার চর্চার জন্য নির্বাহী বিভাগের কর্মচারীদের প্রণোদনা ও পারিতোষিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শুদ্ধাচার চর্চায় উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে সরকার ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদান নীতিমালা ২০১৭’ প্রণয়ন করেছে।”
বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালে এই কৌশলপত্রের মধ্যে ‘কৌশল’ যে মাত্রায় প্রকটিত হয়েছে সেই মাত্রায় আধুনিক ধারণামতে কল্যাণরাষ্ট্রের নীতি প্রতিভাত হয় নি, সেখানে নীতিগতভাবে বিচ্ছিন্নতা থেকে বিরত থাকা সম্ভব হয়ে উঠে নি এবং এই সত্যটি যৎকিঞ্চিৎ সততাসংরক্ষণের স্বার্থে একান্ত অপারগ হয়েই স্বীকার করে নিতে হয়। অর্থাৎ বিষয়টিকে নিয়ে এমনভাবে, এই যাকে বলে, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে যে-কেউ ভাবতেই পারেন এবং তেমন করে ভাবার তাঁর স্বাধীনতা আছে। কিন্তু এইভাবে নেতিবাচকতার দিকে প্রথমেই ঝুঁকে না পড়ে, আগে ভাবতে হবে ‘শুদ্ধাচার চর্চা’র ধারণাটিতে নিজেকে বদলে ফেলার একটি প্রত্যয় আছে এবং এই প্রত্যয়টি সকল প্রকার অশুদ্ধতাকে জীবন থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্যে একজন মানুষকে মানসিক দিক থকে প্রস্তুত হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করছে এবং এই মানুষটি প্রশাসনের কোনও না কোনও স্তরে কাজ করেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে দেখলে, ‘শুদ্ধাচার চর্চা’র গুরুত্ব অনুধাবন করা যায় বা সম্ভব হতে পারে, অন্যথায় কিছুতেই নয়, অর্থাৎ সম্যক বিচার-বিশ্লেষণে নামার আগে এইটুকু ছাড় এখানে দিয়ে রাখতে হবে। এভাবে বলার একটাই উদ্দেশ্য, সেটা হলো, প্রথমেই সমালোচনার দৃষ্টিতে পরখ না করে ‘শুদ্ধাচার চর্চা’র বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে চাই, কেন না এমন দুর্মুখের অভাব এই সমাজে একেবারেই নেই যে এমন নয়, যিনি গলা বাড়িয়ে বলে ফেলতেই পারেন, “এই নীতির মধ্যে দুর্নীতি দুর্লক্ষ্য নয়”। কারণ তিনি বলবেন, “সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন, তাঁরা বিশেষ বিশেষ কাজ চালাবার ভারপ্রাপ্ত ও সুবিধাভোগী একটা বিশেষ শ্রেণি, যাঁরা প্রশাসন চালান ও চালানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকেন। তাঁদের বৈশিষ্ট্যই হলো বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা, নিষ্প্রাণতা, ছলচাতুরী।” তারপর এককাঠি আগ বাড়িয়ে হয় তো তিনি বলে বসবেন, “১৮৩৫ সালে মেকলে মিনিট অনুসরণে ভারতীয় উপমহাদেশে গড়ে তোলা ঔপনিবেশিক ও জনবিচ্ছিন্ন ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রেরই উত্তরাধিকার বহন করছেন বর্তমানের আমাদের বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ। তাঁরা এখনও মেকলে উল্লেখিত খালে চামড়ার ভারতীয় হলেও মনমগজে, চিন্তা-চেতনায়, আদর্শে, জনগণের সঙ্গে আচরণে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পূর্ণ ইংরেজ হয়েই আছেন। এইসব যুক্তিকে একদম পাত্তা না দিয়ে হুট করে বাতিল করে দেওয়া যায় না, রাখা যায় না এক পাশে সরিয়ে। তারপরেও এও তো সত্য যে, “ভারতীয় দেহের ভেতরে ‘ব্রিটিশ আত্মার বাস’ ইংরেজ শাসনের অবসানের এতোদিন পরে সেটাকে তড়িঘড়ি, একটুও পরখ না করে, এমনিতে মেনে নেওয়ার কাল বোধ করি শেষ হয়েছে। এখন আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক এবং অন্তত শুদ্ধাচার চর্চার কৌশলপত্র তো প্রণীত হয়েছে এবং এর কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। উন্নয়নের জোয়ারের ঢেউয়ের অভিঘাতে দেশ এগিয়ে চলেছে উত্তরোত্তর অগ্রগতির দিকে, এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা পিছিয়ে পড়বেন তা তো হতে পারে না, তাঁদেরকে অবশ্যই ঔপনিবেশিকতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে, শরিক হতে হবে সাধারণ মানুষের দলে। তাঁরা তো দেশের সাধারণ মানুষের দলেই প্রতিনিধি, তাঁরা সাধারণ মানুষজনের থেকে আলাদা হতে যাবেন কেন?
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা তাঁদেরকে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে জনগণ থেকে আলাদা করে তৈরি করেছিল, এখন তো আর সে সময় নেই, ইংরেজ এখানে সশরীরে আর শাসন করে না। অপ্রত্যক্ষ ইংরেজের ঔপনিবেশিক শাসননীতির কবর রচনা করতে ও তার বিপরীতে স্বাধীন দেশের শাসননীতি প্রবর্তন করতেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের আচরণবিধি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের সম্মান সমুন্নত করার উপযুক্ত হতে হবে এবং প্রশাসনের কর্মী হিসেবে নিজেরা কোনও ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট কেরানি নন, প্রমাণ করতে হবে সেটাও। বলা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে শুদ্ধাচার চর্চা প্রবর্তনের মাধ্যমে সে-প্রচেষ্টারই একটি প্রাথমিক প্রয়াস শুরু হয়েছে মাত্র। পাকিস্তান আমলে বা ব্রিটিশ আমলে বস্তুতপক্ষে এমনটা হওয়ার বা কারও পক্ষে এমনটা কল্পনা করারও অবকাশ ছিল না।
ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা-কর্মচারিরা কেমন ছিলেন তাঁর একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। সেটা এই জন্যে দেওয়া যে, এতে করে অন্তত ঔপনিবেশিক সরকারি কর্মচারিরা কতটা বিদঘুটে ও ভয়ঙ্কর হতে পারেন তার স¤পর্কে যৎকিঞ্চিৎ ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এখানে একজন পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তার উদাহরণ টানছি। তিনি ১৯৪৭-উত্তর কালপর্বে পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের অধীনে রাজশাহী অঞ্চলের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সেখানে থানা-হেফাজতে নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের কমিউনিস্ট নেত্রী ইলা মিত্রের উপর যে-নারকীয় অত্যাচার করা হয়, তার নেপথ্যনায়ক ছিলেন এই ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর আদেশেই ইলা মিত্রের গোপনাঙ্গে সিদ্ধগরম ডিম ঢুকিয়ে দিয়ে নির্যাতনের মাত্রাকে চূড়ান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সকলের শ্রদ্ধেয়, মহৎ লেখক ও সাবেক বিখ্যাত আমলাপ্রবর আকবর আলি খান তাঁর এক লেখায় ওই ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘নিপাট ভদ্রলোক’ বলে উল্লেখ করেও পরে পাশ্চিম পাকিস্তানি এই উচ্চপদের আমলার স¤পর্কে এই বর্ণনা দাখিল করেছেন এবং বলেছেন বাঙালি বলে তিনি আকবর আলি খানকে ঘৃণার চোখে দেখতেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডের – গল্প বলতে শুরু করলে তা শেষ হবার নয়, তা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিসহ দেশের সকলেই জানেন। গণমাধ্যমে অসংখ্য গল্প ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তাছাড়া সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকার সময়ের ঘটনা বর্ণনা করে লিখিত স্মৃতিকথাগুলোতে সেসব জমাটি আমলাতান্ত্রিক গল্পের কমতি হবার কথা নয় এবং আন্তর্জালে তো তার দেদার ছড়াছড়ি। বর্তমান অস্থির সময়ের নিরিখে এইসব ঘটনার উদাহরণ এখানে সন্নিবেশনের কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। সোজাকথায় অনেক অনেক উদাহরণ পাওয়া যেতে পারে বা পাওয়ার অবকাশ আছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। যেমন কোনও কর্মকর্তা হয় তো বিজ্ঞের ভান করে একটি জেলার অর্ধেক লোক মারা যাওয়ার পর সেটা দুর্গত এলাকা বলে ঘোষণার তত্ত্ব হাজির করবেন, বলবেন আমজনতার কেউ এ স¤পর্কে কিছুই জানে না একবারেই যাকে বলে অজ্ঞ। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে হয় তো কোনও মাছওয়ালা তাঁর লোকায়তিক সহজ আচরণের বশবর্তী হয়ে স্বাভাবিকভাবে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করে ফেলেছেন, সে-কারণে সে-মাছওয়ালার উপর ভীষণ চটে গিয়ে তাঁর মাছের ঝুড়ি পদাঘাতে নর্দমায় ফেলে দিলেন রাগে রণমূর্তি ধারণ করা কর্মকর্তা মহোদয়া।
সে যাই হোক, স্বাভাবিক বিবেচনার নিরিখে এইসব ক্ষেত্রে অবশ্য অবশ্যই শুদ্ধাচার চর্চার প্রয়োজন আছে বলে সকলেই স্বীকার করবেন। কারণ এই কর্মকর্তা ব্যতীত তাঁর স্বজন-বন্ধুবান্ধবদের সবাই হয় তো সাধারণ মানুষের অন্তর্ভুক্ত, তাঁরা তাঁদের কোনও স্বজন সরকারি কর্মচারির দ্বারা এমন অমানবিকতার শিকার হয়ে বিব্রতকর অবস্থায় নিপতিত হতে চান না, এটা যতোটাই অশোভনীয় হোক না কেন, তার চেয়েও বেশি অমানবিক। এমনটা সভ্যজগতের আধুনিক মানুষ হিসেবে কারও পক্ষেই বরদাস্ত করা উচিত নয়। যদি কেউ এটাকে বরদাস্ত করেন, তবে ধরে নিতে হবে তিনি আধুনিক জগতের বাসিন্দা হয়েও একজন বর্বর অমানুষের নামান্তর মাত্র। এতোটুকু আলোচনার পর, সোজা কথায় এই বোধোদয় হচ্ছে যে, এর অন্যথা হলে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে বাধ্য। আর সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে সমাজটা আর কোনও সভ্য সমাজের মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত থাকবে না, বরং অসভ্য বর্বর হয় উঠবে, একেবারেই বাসযোগ্য থাকবে না এবং সমাজটা বাসযোগ্যতা হারাক এটা কেউ চাইতে পারেন না বা চাওয়া কোনও অর্থেই সমীচীন নয়।
বর্তমান আধুনিক সময়টা আর আধুনিক নেই, সেটাকে অনেকেই আর আধুনিক বলছেন না। বর্তমান কালে যখন হাতে হাতে মোবাইল থাকছে, প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে এমন কি নিতান্ত ভিখারির হাতেও মোবাইল ফোন শোভা পাচ্ছে এবং বাইডেন-পুতিন থেকে শুরু করে সানি লিওনের নাম পর্যন্ত নিমিষেই মানুষের ঠোঁটস্ত হয়ে যাচ্ছে, তখন এই কালটা যে একটা অধুনিক কাল, সেটা অনেকেই স্বীকার করছেন না। তাঁরা বর্তমান সময়টাকে বলছেন আধুনিকের চেয়েও আরও আধুনিক, অর্থাৎ আধুনিকের উত্তর বা পরের কালÑ আধুনিকোত্তর সময়। এরকম একটি আধুনিকোত্তর সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা মেকলে আমলে থেকে যেতে পারেন না। ইংরেজ রাজকর্মকর্তা ব্যাবিংটন টমাস মেকলে ১৮৩৫ সনে ভারতে ব্রিটিশ ঔনিবেশিক শাসন পরিচালনায় সাফল্য অর্জনের অভিপ্রায়ে ভারতীয়দের মধ্যে এক শ্রেণির শিক্ষিত কেরানি তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি সনাতন শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে মেকলে মিনিট প্রস্তাব করেন এবং তা তৎকালের বড় লাট কর্তৃক গৃহীত হয় এবং কালক্রমে ব্রিটিশ ভারতের বশংবদ আমলাতান্ত্রিক শ্রেণি তৈরি হয়, যাঁরা ব্রিটিশের হয়ে নিজের দেশের সাধারণ মানুষের উপর সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-নির্যাতন চালোনোর যন্ত্র হতে কসুর করেন না। সেটা মূলত মেকলের পক্ষ থেকে ছিল ‘ভারতীয় মন’কে ‘ব্রিটিশ মন’-এ রূপান্তর করার শিক্ষাকর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং ইংরেজরা তাতে শতভাগ সফল হয়েছিলেন। সে-সফলতার সবচেয় বড় প্রমাণ হলো আজ স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের প্রশাসনকে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, এর খোল নলচে বদলে ফেলার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনকে জনবান্ধব করার লক্ষ্যে, ঔনিবেশিক মানসিকতার শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে ‘শুদ্ধাচরণ চর্চা’র প্রচলন করতে হচ্ছে, নিজেদেরকে মনেমগজে বদলে দেওয়ার জন্য, সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার জন্যে, মাটির মমতা অঙ্গে মাখার জন্যে।
জানা কথা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের ছাপ-চিহ্ন এখনও একবারে মুছে যায় নি বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রবলাকারে বিদ্যমান আছে। উদাহরণ দিয়ে প্রবন্ধের বহর বাড়ানোর কোনও দরকার আছে বলে মনে করি না। এখন একটাই প্রত্যাশা এই কর্মসূচি অব্যাহত থাক এবং উত্তরোত্তর সফল হয়ে উঠুক।
[লেখক : সভাপতি, সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটি, জেলা প্রতিনিধি: দৈনিক সংবাদ, দৈনিক শ্যামল সিলেট]

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com