1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
বুধবার, ১১ মে ২০২২, ০৬:২১ পূর্বাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

আজীবন শিক্ষার্থী প্রতিদিনের পরীক্ষার্থী, একজন আইনজীবী

  • আপডেট সময় রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২২

:: অ্যাডভোকেট শহীদুজ্জামান চৌধুরী ::
সকল সভ্য সমাজেই আইনজীবীর গুরুত্ব সমধিক। বাংলাদেশে আইনজীবীর গুরুত্ব এতটা সার্বজনীন না হলেও এই পেশার গুরুত্ব ও মহত্ব খোলামেলাভাবে প্রদর্শিত হয়েছে এক-এগারো সরকারের সময়ে। অন্য কথায় সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে। সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীকে দ্বারস্থ হতে হয়েছে আইনজীবীর। দুই বিপরীতমুখী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে আইনীপ্রতিকার দিয়েছেন আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক। এজন্য তিনি ইতিহাসের পাতায় দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়েই অনেক মামলার আসামি হন। আশ্রয়স্থল ছিল আইনজীবীর সহায়তা। কোন কোন মামলায় শাস্তি হলে মুক্ত থাকেন আপীল আদালতের জামিনে। কোন কোন মামলা অনিষ্পত্তিকৃত অবস্থায় এরশাদ ইহলোক ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রনায়কদের এহেন নাজুক পরিস্থিতি মোকাবেলায় অব্যর্থ সহায়ক একমাত্র আইনজীবী। কাজেই আইনজীবীর সম্মান নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ। বাম দর্শনে আইন পেশাকে অনুৎপাদনশীল খাত হিসেবে দেখা হলেও আইনের শাসনবেষ্টিত সভ্য সমাজে আইনজীবীর প্রয়োজনীয়তা বলে শেষ করার নয়।
বাল্যকালের পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতায় মনে একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, ল’ পাস মানে পড়াশোনার চূড়ান্ত পাস। এরপর বুঝি আর না পড়লেও চলে। কারণ তখন বি,এ পাস করে ল’ পড়তে ঢাকা কিংবা বড় শহরে যেতে হতো। বাস্তবে দেখছি ল’ পাস করে সনদ নিয়ে আইনজীবী হয়ে গেলেই পড়াশোনার ল্যাটা চুকে যায় না। বলা যায়, আইনজীবী হয়ে আইনের জগতে পা রেখে জীবনব্যাপী পড়াশোনার গেইট পাস নেয়া হয়। এই সূত্রে বাংলাদেশে আইনাঙ্গনের নক্ষত্র বলে খ্যাত প্রয়াত এস,আর (সবিতা রঞ্জন) পাল সাহেবের প্রসঙ্গ স্মরণ করা যায়। আইনজীবী হিসেবে এত উচ্চতর স্থানে অধিষ্ঠিত হবার মন্ত্র সম্পর্কে বলতে যেয়ে অ্যাডভোকেট মনসুর হাবিব (এক/এগারো আমলের এডিশন্যাল এটর্নি জেনারেল)কে বলেন, “আরে বাবারে! কী আবার,পড়াশোনা করে।” কী ধরনের বই পড়তেন এমন প্রশ্নের জবাবে পাল সাহেব বলতেন, “তবে শুনো, উকিল হয়ে যোগ দিলাম সিলেট বারে। সিলেট বার লাইব্রেরিটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। অনেক বড় লাইব্রেরি, বহু বই। আমি যে পাঁচ বছর সিলেটে ছিলাম সব ক’টা বই প্রায় শেষ করে ফেলেছিলাম।”
পাল সাহেব পঠিত বইয়ের নাম লেখকের নাম শুদ্ধভাবে বলে দিতে পারতেন। সিলেট বার লাইব্রেরিতে তার পড়াশোনার উল্লেখযোগ্য বই ছিল ‘ট্যাগর ল লেকচার।’
ভাল আইনজীবী হতে হলে শুরুতেই পথিকৃৎ আইনজীবীদের জীবন ও জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে জানতে পারলে পথচলা সহজ হয়। সে রকম বাসনা থাকা সত্বেও সময়মতো হাতের নাগালে কার্যকর বই না পাওয়ায় সে বাসনা অপূরণই থেকে গেছে বলা যায়। তখনকার সময় চাইলেই উপাদেয় বই বাজারে সহজলভ্য ছিল না। আমি বিংশ শতাব্দীর নব্বই দশকের কথা বলছি। বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে খুলনার অ্যাডভোকেট এ এফ এম আব্দুল জলিল লিখিত “আমার দেখা আইন আদালত” নামক একটি ছোট বই প্রকাশ করে খুশরোজ কিতাব মহল। আইনের ছাত্র থাকাবস্থায় ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বইটি সংগ্রহ করি। ১১১ পৃষ্ঠার বইটিতে রয়েছে মোট ১১টি প্রবন্ধ। আইনের শাসন ও আইনের ত্রুটি, নামক প্রবন্ধে রয়েছে এই দূরদর্শী আইনজীবীর উপলব্ধি ও স্বপ্নের কথা।
তিনি লিখেছেন, বিচার ব্যবস্থাকে সহজলভ্য করতে হলে থানা আদালত স্থাপন করা প্রয়োজন, তেমনি প্রত্যন্ত এলাকায় অর্থাৎ রাজধানী হতে দূরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের কোন শাখা স্থাপন করা উচিত। জলিল সাহেবর এ লেখা বা স্বপ্নের কথা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হয় ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক স্বাধীনতার সাধ পূরণে নূতন কিছু প্রদর্শনের ইচ্ছায় প্রথমে মান উন্নীত (আপগ্রেডেট) থানা করা হয়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেয়া হয় পুলিশ ইন্সপেক্টর পদবীধারীকে। আগে এ পদে থাকতেন সিনিয়র এসআই। পুলিশ প্রশাসন সংস্কারের পরপরই গঠন করা হয় আপগ্রেডেট থানা ম্যাজিস্ট্রেট ও থানা মুন্সেফ কোর্ট, অতঃপর নাম ধার্য হয় উপজেলা।
ঐ সমসাময়িক সময়ে ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ করা হয় ছয়টি। রংপুর, যশোর, বরিশাল, চিটাগাং, কুমিল্লা, সিলেট তথা মফস্বল শহরে স্থাপন করা হয় এগুলো। শ্রেণী স্বার্থের কারণে প্রচলিত ব্যবস্থায় ধারণ ক্ষমতা না থাকায় সেগুলো আর টেকসই হয়নি। বিচার অঙ্গনের জাতীয় দুর্ভোগ যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে যায়। আমি হলফ করে বলতে পারি, উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ও উপজেলা মুন্সেফ কোর্ট হঠকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রত্যাহার করে জেলা সদরে না আনা হলে আজকে সর্বত্র মামলার এমন অলংঘনীয় জট সৃষ্টি হতোনা। উপজেলা শহরগুলো আরও জনমুখর ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো। রাজধানীমুখী জনসংখ্যার চাপ কমতো। অকারণে রাজধানীমুখী হবার মানসিকতা কমে যেত।
বলছিলাম হাত বাড়ালেই আইনজীবী ও আদালত বিষয়ক বই না পাবার কথা। শংকর লিখিত ‘কত অজানারে’ এ স¤পর্কিত উপন্যাস আলোকে কলকাতা কেন্দ্রীক আকর গ্রন্থ বলা যায়। সেতো অনেক পুরানো। বিষয়বস্তু কলকাতাকেন্দ্রিক। আমরাতো এখন আর কলকাতাকেন্দ্রিক নই।
নব্বইয়ের দশকে বাজারে আসে গাজী শামসুর রহমানের ‘বিচারক জীবনের স্মৃতিচারণ’। গাজী সাহেব আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সুযোগ না পেয়ে আইনজীবী এবং বিচারকের মন, মনন, মানসিকতা সাংস্কৃতিক মান কেমন থাকা উচিত সে বিষয়ে বিস্তর লিখেছেন। বাংলা একাডেমী হতে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তার লিখিত ‘বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থা’ নামক পুস্তিকায় ‘ওকালতির সপক্ষে’ শিরোনামীয় আইন পেশা অনুকূলে একটি ইতিবাচক বলিষ্ঠ প্রবন্ধ লিখেন। কোন আইনজীবী কর্তৃক এরকম বাস্তব লেখা এখনও চোখে পড়েনি। নব্বই দশকের শেষে অর্থাৎ ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে দীনেশ চন্দ্র দেবনাথ একটি সুখপাঠ্য আত্মজীবনী লেখেন। নাম ‘কত স্মৃতি কত কথা’। দেবনাথ বাবু প্রথমে ছিলেন আইনজীবী। তরপর মুন্সেফ হতে সাব জজ। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক। সহজ করে বেশ কয়েকটি আইন বই লিখেন তিনিও আইনাঙ্গনের দিকপাল হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার বইগুলো আইনজীবী মাত্রই পাঠ করা উচিত। আপীল বিভাগের বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ তার কনিষ্ঠ কন্যা।
আইনজীবীর মৌল কর্তব্য হলো আইন স¤পর্কে জ্ঞান অর্জন। তিনি যে সবজান্তা হবেন এমন কথা নয়। মূল আইন বা তার ব্যাখ্যা কোন বইয়ের কোথায় লিখা আছে সে জ্ঞান থাকতে হবে তার। আইনের বিষয়বস্তু বিশাল এবং এর ক্ষেত্র ব্যাপক। সেজন্যে বলা হয়েছে, A lawyer is he, who knows where the law is. আইন পড়ায় অধিক মনোনিবেশ সৃষ্টি হয় সফল আইনজীবীর জীবনী জানলে। সফল আইনজীবীর জীবন বৃত্তান্ত বা জীবনী পাওয়া খুবই দুরূহ। আমাদের পথিকৃৎ আইনজীবীদের জীবনী সমৃদ্ধ কোন একক পুস্তিকা এখনও বাজারে আসেনি। ইচ্ছে করলে বার কাউন্সিল এই অভাবটুকু পূরণ করতে পারে, অন্তত ২৫ জন খ্যাতিমান আইনজীবীর জীবনী নিয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করতে পারে। যেমনভাবে পথিকৃৎ সাংবাদিকদের নিয়ে বই প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট। সম্প্রতি বাজারে একটি ছোট আকারের বই এসেছে নাম ‘কিংবদন্তি বিচারকদের যাপিত জীবন’। লেখক একজন সহকারী জজ। নাম কাজী শরীফুল ইসলাম। বইয়ের শিরোনামে বিচারকদের জীবন উল্লেখ করা হলেও দশটি চরিত্রের আট জনেরই জীবন শুরু আইনজীবীর যাপিত জীবন দ্বারা। অন্য দুইজন বিচারকের পথ ধরে অগ্রসর হয়ে গন্তব্যে পৌঁছান।
আইনজীবী থেকে বিচারক, উল্লেখিত বইয়ের আটজন হলেন শ্রী দীনেশচন্দ্র দেবনাথ, বিচারপতি আমিন আহমদ, বিচারপতি লতিফুর রহমান, বিচারপতি গোলাম রাব্বানী, বিচারপতি মোস্তফা কামাল, কাজী এবাদুলহক, বিচারপতি গোলাম রাব্বানী, বিচারপতি এ.টি.এম ফজলে কবীর, এ.কে.এম জহিরআহমদ, ¯্রফে বিচারক অপর দুইজন হলেন বিচারক গাজী শামছুর রহমান (প্রস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান) ও বিচারপতি হামিদুল হক। তাঁদের প্রত্যেকের লেখা আত্মজীবনীমূলক পুস্তক রয়েছে। ক্রমানুসারে তাদের পুস্তকগুলোর নাম ‘কত কথা কত স্মৃতি’। A PEEP INTO THE PAST’ ‘আমার কিছু বলা’ ‘আত্মকথা’ ‘ফেলে আসা সেইসব দিনের কথা’ ‘ওকালতি ও জজিয়তি জীবনের জলরেখা’ ‘বিচারক জীবনের কিছু স্মৃতি’ ‘আমার কিছু কথা’ ‘বিচারক জীবনের স্মৃতি চরণ’ ‘বিচার বিভাগে ৪৫ বছর’। নবীন আইনজীবীরা চুম্বক বিবরণ সম্বলিত এই বইগুলো পড়লেও অনেক উপকৃত হবেন।
ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলামের আইন পেশায় ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘আঠারো তার জীবনের ধ্রুব তারা’ প্রকাশিত হয়েছে সদ্য প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খাঁনের স¤পাদনায়। খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমদকে কেন্দ্র করে প্রকাশনা আাছে YEARS OF GLORY নামে। টাংগাইল বারের আইনজীবী কামাক্ষা নাথ সেন ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ হতে ‘আদালত’ নামে একটি ত্রৈমাসিক প্রকাশ করেছেন বহু বছর। এই প্রকাশনাটিতে দেশের অনেক আইনজীবীর লেখা ও জীবনী পাওয়া যেত। ২০০২ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বিজ্ঞ আইনজীবী মারা গেলে ত্রৈমাসিকটি বন্ধ হয়ে যায়। ‘লিগ্যাল এইড’ নামক একটি সাময়িকী বেশ কিছুদিন প্রকাশ হয়। স¤পাদক ছিলেন অ্যাডভোকেট খাজা গোলাম মুরশিদ। এছাড়া প্রায়ই নানান নামে আইনবিষয়ক ম্যাগাজিন সাময়িকী ইত্যাদি প্রকাশ হলে সুপ্রিম কোর্ট বারের প্রবেশমুখে, বর্তমানে ভিতরের যেস্থানে বইমেলা হতো স্থায়ীভাবে সেখানের বুকস্টলে সেগুলো পাওয়া যায়।
খুশীর কথা, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ হতে অপারতথ্য সম্মৃদ্ধ, গবেষণামূলক, মানস¤পন্ন, সুশ্রী, আইন-আদালত বিষয়ক একটি প্রকাশনা প্রকাশ হচ্ছে ঢাকা থেকে। নাম ‘লিগ্যাল ইস্যু’। স¤পাদক আরিফ খাঁন। এ পর্যন্ত ১৮টি সংখ্যা বের হয়েছে। আগে ছিল ম্যাগাজিন সাইজ। করোনার পরে ১৮তম সংখ্যা প্রকাশ পায় বুকসাইজে। প্রকাশনাটি বিষয়ে মনের তাগিদেই সম্যক বলতে ইচ্ছে করছে। লিগ্যাল ইস্যু প্রকাশনায় খ্যাতিমান আইনজীবীদের জীবনী প্রকাশকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। ১ম সংখ্যায় ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমদ, ২য় সংখ্যায় এস,আর পাল, ৩য় সংখ্যায় বিচারপতি এস,এম মুর্শেদ, ৪র্থ সংখ্যায় বাংগালী ব্যারিস্টারদের হতিহাস, ৫ম সংখ্যায় প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী, ৬ষ্ঠ সংখ্যায় প্রধান বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, ৭ম সংখ্যায় সুপ্রিম কোর্টের ২৪২ বছরের ইতিহাস, ৮ম সংখ্যায় স্মৃতি-বিস্মৃতির প্রধান বিচারপতিগণ, ৯ম সংখ্যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১০ম সংখ্যায় সংবিধান সাধক মাহমুদুল ইসলাম, ১১তম সংখ্যায় ডি এল আরের ৭০ বছর, ১২তম সংখ্যায় গাজী শামছুর রহমান, ১৩তম সংখ্যায় সুচিত্রা সেনের পাবনার বাড়ী নিয়ে মামলা, ১৪তম সংখ্যায় বি, এন, চৌধুরী গণমানুষের আইনজীবী, ১৫তম সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের আইনজীবীরা, ১৬তম সংখ্যায় কোর্ট রিপোর্টিং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৭তম সংখ্যায় ৩৫ লাখ ঝুলন্ত মামলার খতিয়ান-মামলাতন্ত্র, বুক সাইজের ১৮তম সংখ্যায় আইনমন্ত্রীগণ শিরোনামে আইনজীবী-বিচারকের জীবনকাহিনীসহ আইন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিষয় কেন্দ্রিক প্রচ্ছদকাহিনী প্রকাশ করা হয়। এ প্রকাশনাটি গবেষণামূলক বিরল কিছু কর্ম সম্পাদন করে যাচ্ছে যা আইন অঙ্গনের প্রকাশনা ইতিহাসে ঝলঝলে আকারে লিখিত থাকবে।
পূর্বোক্ত “আমার দেখা আইন আদালত”-এর লেখক এ,এফ,এম আব্দুল জলিল চেম্বারশীপ পরীক্ষা পাস করার পর ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা হাইকোর্টে কয়েক মাস প্র্যাকটিস করেই জুন মাসে খুলনা বারে যোগদান করেন। সে হিসেবে দেশভাগের প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর ওকালতি শুরু হয়। তাঁর লেখায় পাওয়া যায়, অনেক আইনজীবী শুরুতেই দেওয়ানী মোকদ্দমায় ভিড়ে যান। কারণ, এদিকে মোকদ্দমার সংখ্যা অনেক বেশি। তাই অ্যাডভোকেটের সংখ্যাও বেশি। ফৌজদারি আইনজীবীর সংখ্যা ছিল অপেক্ষাকৃত কম। নি¤œ পর্যায়ে ছিল মুক্তার সাহেবদের আধিক্য ও প্রাধান্য। পদ্ধতিগত দীর্ঘসূত্রতা ফৌজদারি অপেক্ষা দেওয়ানিতে অনেক বেশি। তাঁর মতে ফৌজদারি বিচারে বিচারককে চিন্তা-ভাবনা করতে হয় অনেক বেশি। এই বিষয়ে তিনি ইংল্যান্ডের কোর্ট অব আপিলের প্রধান বিচারপতি লর্ড এ্যাটকিনের মন্তব্য তুলে ধরেন “Don’t forget that the most important and often the most difficult of the work is the criminal work for a judge.” অর্থাৎ এ কথা ভুললে চলবে না যে, একজন বিচারকের পক্ষে সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে ফৌজদারি বিচারকার্য। বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতায় ফৌজদারি আইনজীবীর সংখ্যা বেশি। মামলার সংখ্যাও বেশি। বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচার এখন আর দ-বিধিতে সীমাবদ্ধ নেই। স্বাধীনতার পর দেশে অনেক বিশেষ আইনের জন্ম হয়েছে এবং প্রতিনিয়তঃ হচ্ছে। যেমন -দি বাংলাদেশ প্রিন্টিং প্রেস পাবলিকেসন্স এ্যাক্ট-১৯৭৩, বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪, ক্রুয়েলটি টু ওমেন (ডিটারেন্ট পানিসমেন্ট) অর্ডিনেন্স-১৯৮৩, তৎপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-১৯৯৫, তৎপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন -২০০০, এসিড অপরাধ দমন আইন-২০০২, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪, সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২, আইন শৃংখলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন – ২০০২,পরিবেশ আদালত আইন-২০১০, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০১৩, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন-২০১৩, ডিএনএ আইন-২০১৪, যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন -২০১৮, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮, ওজন ও পরিমাপ মানদ- আইন ২০১৮, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট আইন-২০১৮, সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল আইন-২০১৮, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮। এছাড়া নিগোসিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট -১৮৮১ এর সংশোধিত সপ্তদশ অধ্যায়, যে অধ্যায় অনুসরণে চেক ডিজঅনারের অপরাধ সংক্রান্তে মামলা হয় প্রভৃতি।
স্বাধীন বাংলাদেশে দেওয়ানি বিচার প্রক্রিয়ায় সংযোজিত হয়েছে পারিবারিক আদালত অর্ডিন্যান্স-১৯৮৫, অর্থঋণ আদালত আইন -২০০৩, শ্রম আদালত আইন -২০০৬ এর একাংশ ব্যতীত দেওয়ানী অধিক্ষেত্রে তেমন বিশেষ আইন সংযোজিত হয়নি।
আইনজীবীগণের কোন পেনশন নেই। নেই বয়সের সময়সীমা। ৫৯ বৎসর উত্তীর্ণ হবার পর নিজেকে অক্ষম ভেবে হাটাহাটি আর পায়চারী করে সময় কাটিয়ে মৃত্যুর জন্য প্রহর গুণার আগাম তাগিদ শুরু হয় না। আইনজীবী কোর্টে যেতে সক্ষম হলে মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত কর্মব্যস্ত থাকতে পারেন। যেমনটি থেকেছিলেন ৮৯ বছর বয়সী সবিতা রঞ্জন পাল, শতবর্ষী টি,এইচ খান।
আইনজীবীদের প্রতিদিনের রুটিন ওয়ার্ক থাকে শুনানী করার। বিচারক এজলাসে উঠার পর শুরু হয় একের পর এক শুনানী। আইনজীবীর সে মুহূর্তটা হয় পরীক্ষার্থীর খাতা প্রাপ্তির পূর্বক্ষণের প্রতীক্ষার মতো। খাতা প্রাপ্তির পর যেমন প্রতীক্ষার অবসান ঘটে, শুরু হয় লিখা তেমনিভাবে মামলার নম্বর ডাকে উঠলে অবসান ঘটে প্রতীক্ষার। শুরু হয় শুনানী। ভালো প্রস্তুতি থাকলে অবশ্যই সুফল নিয়ে ফেরা যায়।
[লেখক- শহীদুজ্জামান চৌধুরী, অ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, সিলেট]

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com