1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০২ পূর্বাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

থামে না ভাঙন, কমছে আয়তন

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ৩১ আগস্ট, ২০২১

শামস শামীম ::
বিপুল সম্পদের আধার ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের জলাভূমি হাওর। বছরের প্রায় মাস হাওর পানি ভর্তি থাকে। শীতকালে পানি কমলে লাগানো হয় বোরো ধান। একই সময়ে নিচু ভূমি হিসেবে পরিচিত জলাশয় থেকে আহরণ হয় মিঠাপানির নানা প্রজাতির মাছ। কিন্তু এই হাওর বর্ষায় আগ্রাসী হয়ে ওঠে। হাওরে সৃষ্ট আফালে (উত্তাল ঢেউ) ভেঙে নেয় গ্রামের পর গ্রাম। প্রতিবছরই আফালে কমছে হাওরের গ্রামের আয়তন। এতে নিম্নআয়ের কৃষিজীবী পরিবারের লোকজন বসতবাড়ি রক্ষা করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষা শেষে শুকনো মৌসুমে ভেঙে যাওয়া ভিটায় আবার মাটি ফেলার সংগ্রাম করছে যুগযুগ ধরে। দুর্গম হাওরের গ্রামগুলোকে প্রতিরক্ষা দেয়ালের আওতায় নিয়ে আসতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ ভুক্তভোগী মানুষজন বিভিন্ন ফোরামে দাবি জানিয়ে আসছেন।
হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের মতে, দেশে ৪১৪টি এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতে বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭টি হাওর জেলায় প্রায় ৪২৩টি হাওর রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দেড় শতাধিক হাওরের অবস্থান সুনামগঞ্জ জেলায়। দেশের হাওরগুলোর সম্মিলিত আয়তন প্রায় ৮০০০ বর্গ কি.মি. এবং এগুলো সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৪৮টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত। দেশের মোট আয়তনের ছয় ভাগের একভাগ আয়তনের হাওরাঞ্চলে দুই কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব জমা দিচ্ছে হাওর।
বর্ষায় হাওরগুলোতে উত্তরে অবস্থিত ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসে পাহাড়ি ঢল। তখন ভয়ঙ্কর বন্যা দেখা দেয়। জলে ভরে যায় হাওর। এসময় ঝড় এলে হাওরে আফাল ওঠে। সেই আফালের তাণ্ডবে সৃষ্ট ঢেউ আছড়ে পড়ে হাওরের গ্রামগুলোতে। গ্রামগুলোর চারদিকে হাওর থাকায় চারদিক থেকেই ঢেউয়ের শিকার হয় গ্রামগুলো। ফলে তীব্র ঢেউয়ে গ্রামগুলো ভাঙে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা হাওর থেকে কচুরিপানা, বিভিন্ন প্রজাতির বনসহ বাঁশ দিয়ে আড় বেঁধে ভিটা রক্ষা করেন। যাদের এই সামর্থ্য নেই তাদের ভিটা ভেঙে যায়। হেমন্তে মওসুমে তারা আবার মাটি কেটে ভরাট করে ভিটা। এভাবে যুগের পর যুগ ধরে তাদের ভিটা রক্ষার সংগ্রাম চলে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বিভিন্ন সময়ে দাতা সংস্থা ও এনজিওদের মাধ্যমে কিছু দুর্গম গ্রাম প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করে দেওয়ায় সেই গ্রামগুলো অরক্ষিত আছে। তবে দুর্গম হাওরের সবগুলো গ্রামেই প্রতিরক্ষা জরুরি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
টাঙ্গুয়ার হাওরের কেন্দ্রের গ্রাম গোলাবাড়ি। দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এখানেই নোঙর গেড়ে আনন্দ করেন। হেমন্তে হিজল-করচের দীঘল বাগের নিচে ক্যাম্প করে অবস্থান করলেও বর্ষায় লঞ্চ, স্পিডবোট, বাহারি নৌকাসহ ইঞ্জিন চালিত নানা ধরনের বোট নিয়ে তারা ভ্রমণ করেন। তখন ইঞ্জিনচালিত নৌ-বাহনের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ে গোলাবাড়ি, জয়পুর, ছিলাইন তাহিরপুর, মন্দিআতাসহ নিকটের গ্রামগুলোর বসতভিটা ভেঙে দিচ্ছে বলে এলাকার লোকজন জানিয়েছেন। এই আঘাতের কারণে প্রতি বছর ভাঙছে টাঙ্গুয়ার হাওরের গ্রামগুলো। তাই আয়তন কমছে এ গ্রামগুলোর। হাওরের আফালে সৃষ্ট ঢেউয়ের তাণ্ডবে ১৯৮৮ সালে তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউপির মারালা গ্রাম এবং পার্শ্ববতী মদক গ্রামটিও বিলীন হয়ে গেছে। প্রতি বছরই এভাবে বিভিন্ন গ্রামের মানুষ বসতভিটা হারিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
গোলাবাড়ি গ্রামের আশি ঊর্ধ্ব প্রবীণ ব্যক্তি গোলাম মোস্তফা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘হেরা (পর্যটকরা) ঢাকা থাইক্যা আবার উল্টাবায় আইয়া টেকাপয়সা রুজি কইরা যায়। আমরার ঘরবাড়ি ভাইঙ্গা যায় ইঞ্জিনের ঢেউয়ে। আর আমরা দিন দিন গরিব অইতাছি। ভিটা আরাইয়া এলাকা ছাইড়া যাইতাছি।’ তিনি জানান, টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার সাইট ঘোষিত হওয়ার পরই পর্যটকদের মিছিল শুরু হয়। হেমন্তে এই মিছিল গ্রামের কোন ক্ষতি না হলেও বর্ষায় ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের উত্তাল ঢেউ গ্রামগুলোতে আছড়ে পড়ে ভিটা ভেঙে দিচ্ছে।
শাল্লা উপজেলার বাহারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিধান চৌধুরী বলেন, প্রতি বর্ষায় শাল্লা উপজেলার প্রতিটি গ্রামেরই কিছু ঘরবাড়ি ঢেউয়ে ভাঙে। ভিটা হারিয়ে অনেক মানুষ আমাদের কাছে সাহায্য নিতে আসে। কিন্তু এ খাতে কোন বরাদ্দ না থাকায় আমরা দিতে পারিনা। তিনি বলেন, হাওরের গাছপালা ও বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় আফাল এখন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠছে। ঢেউয়ে ভাঙনও বেড়েছে।
ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইর রাজাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমানুর রাজা চৌধুরী বলেন, সাগরের ঢেউ এসে একদিকে লাগে। কিন্তু হাওরের গ্রামগুলোতে চারদিকে ঢেউ আঘাত করে। যখন বর্ষায় ঝড় আসে তখন ঢেউ আছড়ে পড়ে গ্রামগুলোতে আর ভাঙতে থাকে মানুষের ভিটা। গরিব মানুষ ভিটা হারিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যায়।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণাসিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, বর্ষায় আফালের তাণ্ডবে গ্রামগুলোর ভিটা ভাঙার দৃশ্যটি করুণ। প্রতিবছর ভাঙতে ভাঙতে হাওরের গ্রামগুলোর আয়তন কমছে। আমি বিভিন্ন সভায় হাওরের সব গ্রামে প্রতিরক্ষা দেয়াল দেবার দাবি জানিয়ে আসছি।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, হাওরের গ্রামগুলোর কিছু ভিটা প্রতি বছর বর্ষায় ঢেউয়ে বিলীন হয়ে যায়। তখন হাওরের অন্যান্য গ্রামগুলোর বাড়িঘরও ঝুঁকির মুখে থাকে। গ্রামগুলো রক্ষায় তাই প্রতিরক্ষা দেয়াল করা জরুরি। তিনি বলেন, ইতোপূর্বে স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে ও এনজিও’র মাধ্যমে কিছু প্রতিরক্ষা দেয়াল হয়েছে। এখন স্থানীয় সরকারের ইএলজি প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা আরও কিছু প্রতিরক্ষা দেয়াল দেয়ার চিন্তা করছি।

 

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com