1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৪২ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

তাহিরপুর সীমান্তে পাহাড়ি ঢলের তাণ্ডব : সড়ক এখন খাল!

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২১

বিশেষ প্রতিনিধি ::
আগস্ট মাসে তিনদফা অতি বর্ষণে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ও বালু পাথরের স্রোতে তাহিরপুর সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক এখন খালে রূপ নিয়েছে। বড়গোপ-টেকেরঘাট সড়কের চানপুর-রজনী লাইন নামক স্থানে অন্তত ৫শ মিটার ওই পাকা সড়ক সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ফলে বড়ছড়া, চারাগাও ও বাগলি শুল্কস্টেশনে যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। ওই সড়ক ব্যবহার করেই ব্যবসায়ী-সাধারণ মানুষজন মোটর সাইকেল, ট্রলি, অটোরিকসায় যাতায়াত করেন। শুধু সড়কটিই বিলীন হয়নি তীব্র ঢলের তোড়ে কয়েকটি বাড়িঘরও ভেঙে গেছে। এ ঘটনায় সীমান্তে বসবাসকারী মানুষজন এখন উদ্বিগ্ন। তাদের এই উদ্বেগের কথা অবগত হয়ে গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছে। তারা জানিয়েছে ভারতের খাসিয়া পাহাড় থেকে বালি ও পাথর আসা বন্ধ না হলে অচিরেই টাঙ্গুয়ার হাওরসহ এলাকার বিস্তৃত জলাভূমি ও হাওর ভরাট হয়ে যাবে।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১২ আগস্টে প্রথম পাহাড়ি ঢলের এই তাণ্ডব শুরু হয়। এই সময় থেকে বর্ষা মওসুমে মেঘালয় পাহাড় থেকে বালু-পাথর নেমে আসছে তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে। নয়াছড়া, রাজাই ছড়া, বুরুঙ্গাছড়া, বড়ছড়া, লাকমাছড়াসহ বিভিন্ন ছড়া বা নালা হয়ে তীব্র পাহাড়ি স্রোত বয় ওই সময়। এতে রাজাই, রজনী লাইন, চানপুর, কড়ইগড়া, বড়ছড়াসহ কয়েকটি গ্রামের কৃষি ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাওরের জমি ও আমনজমিসহ খাল, বিল, জলাশয়, পুকুর, নদী ভরাট হয়ে এখন ধুধু বালুচরে রূপ নিয়েছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত সেতুগুলোর নিচও বালুতে চাপা পড়ে এখন পাহাড়ি ঢলের পানি সড়কের উপর দিয়ে বয়ে চলে। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ ও তৃতীয় সপ্তাহে কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ি ঢল তীব্র স্রোত হয়ে ওই এলাকা দিয়ে নামছে। এতে চানপুর ও রজনী লাইনের কয়েকশ মিটার পাকা সড়ক সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে এখন খালে রূপ নিয়েছে। সড়কের দুই পাশে বসবাসকারী কয়েক’শ পরিবার ঢলের তাণ্ডব থেকে বাঁচতে বালু-ভর্তি বস্তা ফেলে নিজেদের বসতভিটা রক্ষার চেষ্টা করছে। গত সপ্তাহে এই অবস্থা অবগত হয়ে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণাসিন্ধু চৌধুরী বাবুল সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এলাকায় পাহাড়ি ঢলের এই তাণ্ডবের খবর পেয়ে গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিলের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছে। তারাও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ভুক্তভোগীরা তাদের জানিয়েছেন ভারত সীমান্তে সেদেশের সরকার পাহাড় কেটে রাস্তাঘাট ও স্থাপনা তৈরি করায় এবং এর আগে মেঘালয়ে অপরিকল্পিত কয়লা খনি খননের ফলে পাহাড় ধসের ঘটনায় বাংলাদেশের কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিনদিন এই অবস্থা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছলেও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সুনামগঞ্জে সফরে আসলে তার কাছে এলাকাবাসী স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। পরে সরেজমিন কৃষি উপদেষ্টা এসে দেখে গিয়েছিলেন। এরপরে আর কোন সরকার কৃষিজমি, লোকালয় ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা রক্ষায় কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
চানপুর গ্রামের দিনমজুর নারী রঞ্জনা বেগম বলেন, দশ বছর ধরে আমি একটি খুপড়ি ঘর করে বসবাস করতাম। পাহাড়ি ঢল এসে কয়েকদিন আগে আমার ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। ঘরের সব জিনিসপত্র ঢলের তোড়ে ভেসে গেছে। আমি দ্রুত দুই বাচ্চাকে নিয়ে ঘর থেকে বের না হলে বালু-পাথরের নিচে চাপা পড়ে মারা যেতাম। তিনি বলেন, এখন আমি ঘরবাড়ি হারিয়ে আরেকজনের বাড়িতে থাকি।
চানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মুজিবুর রহমান বলেন, মেঘালয়েরে পাহাড় ধসে স্কুল, মসজিদ মাদরাসা, মাঠঘাট রাস্তাঘাট নষ্ট হচ্ছে। সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাবে। একই সঙ্গে পাহাড়ি ছড়াগুলো খনন করে দেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
আদিবাসী নেতা এন্ড্রু সলোমার বলেন, আমার সব ফসলি জমি বালুতে চাপা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। আমার পরিবার এখন খাদ্য সংকটের মুখে। এই এলাকার ফসলি জমির সঙ্গে রাস্তাঘাট, খাল-বিল-পুকুর সব ভরাট হয়ে এখন বালুভূমিতে রূপ নিয়েছে। পাহাড়ি ছড়ায় নির্মিত পানি নিষ্কাশনের সেতুর নিচ ভরাট হয়ে এখন ঢল রাস্তার উপর দিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েকদিনের পাহাড়ি ঢলে চানপুর রজনী লাইন পাকা সড়কের বেশ কিছু অংশ খালের মতো হয়ে গেছে। আমরা বাপার নেতৃবৃন্দকে সরেজমিন দেখিয়েছি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, আমরা সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয়দের উদ্বেগ আতঙ্ক লক্ষ করেছি। ভারতের খাসিয়া পাহাড় থেকে বালু ও পাথর আসা বন্ধ না হলে অচিরেই টাঙ্গুয়ার হাওরসহ এলাকার বিস্তৃত জলাভূমি ও হাওর ভরাট হয়ে যাবে। আর জলাভূমির কোন চিহ্ন থাকবে না। দীর্ঘদিন থেকে পাহাড়ি ঢলের এই আগ্রাসনে কৃষিজমি ও টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো বিরল জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকায় এই ধ্বংসযজ্ঞ চললেও সরকারের নীরবতায় সাধারণ মানুষজন হতাশ। তিনি বলেন, এই অঞ্চলকে রক্ষা করতে হলে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের অপরিকল্পিত এবং অনিয়ন্ত্রিত খনিজ সম্পদ আহরণ, বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়া ও পাহাড়ধস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ভারতের সাথে বিশেষ ব্যবস্থায় আলোচনা শুরু করা জরুরি।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণাসিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, রাজাই, কড়ইগড়া, চানপুর, রজনী লাইনসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ পাহাড়ি ঢলের তাণ্ডবে এখন অসহায়। প্রতি বছর জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত এই তাণ্ডব চলে। কৃষি জমি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাট-সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা এখন হুমকির মুখে। আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করেছি।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমি খবর পেয়েছি সম্প্রতি তাহিরপুর সীমান্তে পাহাড়ি ঢলে আসা বালু-পাথরে কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা শিঘ্রই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাব এবং এ বিষয়ে আন্তরাষ্ট্রিক উদ্যোগ নেওয়া যায় কিনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করব।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com