1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি : বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

  • আপডেট সময় রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০২১

:: মোঃ শাহাদত হোসেন ::
বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,
মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।
কোনো কালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারি,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়-লক্ষ্মী নারী।
– কাজী নজরুল ইসলাম
বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও বঙ্গমাতা একসূত্রে গাঁথা, পরস্পর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির কথা কল্পনাও করা যায় না। বঙ্গবন্ধু ছাড়া যেমন বাংলাদেশ ভাবা যায়না, তেমনি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাফল্যের ইতিহাস রচনা করাও সম্ভব নয়। তাই বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও বঙ্গমাতা প্রায় সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঠিকই বলেছেন, পৃথিবীর কোন বড় কাজই পুরুষ একা একা করতে পারেনি। তাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে, সাহস দিয়েছে, অভয় দিয়েছে নারী। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পাশে যেমন ছিলেন হযরত খাদিজা (রা.), তেমনি শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে ছিলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। রাজনৈতিক ঝড়ঝাপ্টায়, পারিবারিক সমস্যায়, সিদ্ধান্তের দোলাচালে বঙ্গবন্ধুকে যিনি আগলে রেখেছেন, সঠিক পরামর্শ দিয়েছেন, সাহস জুগয়েছেন তিনি হলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।
মূলত শেখ মুজিবুর রহমানের নেতা হয়ে উঠা, বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠা এবং জাতির জনক হয়ে উঠার পিছনে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বিনিময়ে তিনি কিছুই চাননি। চাননি প্রচার, যশ, অর্থ ও খ্যাতি। দেশের প্রথম ফার্স্ট লেডি হওয়া সত্ত্বেও বিলাসী জীবন-যাপন করেননি। নীরবে-নিভৃতে তিনি বঙ্গবন্ধুর জন্যে, বাংলাদেশের জন্যে, বাংলাদেশের মানুষের জন্যে শুধু দানই করে গেছেন।
তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দানের কথা, অবদানের কথা কখনো ভুলেননি। তাইতো ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থের পরতে পরতে বঙ্গমাতার কথা লিখে গেছেন।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম ছিল রেণু। পিতার নাম শেখ জহুরুল হক ও মাতার নাম হোসনে আরা বেগম। অর্থাৎ শেখ পরিবারেরই সন্তান। সম্পর্কে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চাচাত বোন।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ওরফে রেণুর বয়স যখন তিন বছর তখন তার বাবা মারা যান। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স বার তের বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাবার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন যে, আমার সাথে তার এক নাতনির বিবাহ দিতে হবে। কারণ, তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাবেন। রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হল। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধ হয় তিন বছর হবে।’
পাঁচ বছর বয়সে রেণু তাঁর মাকেও হারান। সাত বছর বয়সে তাঁর দাদাও মারা যান। পিতা-মাতা মারা যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মা বেগম সায়রা খাতুন রেণুকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। নিজের স্নেহ-মমতা, আদর-ভালোবাসায় মানুষ করেন। নিজের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে শিক্ষাদীক্ষা, সামাজিকতা ও গৃহকর্মে বড় করে তুলেন।
অতঃপর ১৯৩৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা রেণুর শুভ বিবাহ স¤পন্ন হয়। এসময় শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স ছিল ১৮ বছর আর শেখ ফজিলাতুন্নেছা রেণুর বয়স ৮ বছর। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে জানা যায়, তাঁদের ফুলশয্যা হয় ১৯৪২ সালে। সেই থেকে শুরু হলো রেণুর শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হয়ে উঠার লড়াই, বঙ্গমাতা হয়ে উঠার লড়াই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। আর দশটা সাধারণ মানুষের মত ছিল না তার জীবন। রাজনীতিকে নিজের আদর্শ মেনে কারো বিপদে এগিয়ে যাওয়া, সত্যের পক্ষে অবিচল থাকা, পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত করা, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়া ছিল তাঁর লক্ষ্য। এমন মানুষের সাথে সংসার করা সহজ নয়। বঙ্গমাতা সেই দুরূহ কাজ মেনে নিয়েছিলেন, মানিয়ে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু যেন তাঁর আদর্শে অবিচল থাকেন, সংসারের চিন্তা বাদ দিয়ে মন দিয়ে নিজের কাজ করতে পারেন সেজন্যে তিনি নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছেন। একে তো বঙ্গবন্ধুকে সংসারে মনোনিবেশ করার জন্যে চাপ দেননি, উপরন্তু নিজের হাতখরচের জমানো টাকা বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিয়েছেন মানুষের জন্যে, বাংলার জন্যে খরচ করতে।
মহীয়সী এই নারী শুধু আদর্শ স্ত্রীই ছিলেন না, ছিলেন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদও। বঙ্গবন্ধুর জেলে থাকার সময়গুলোতে তিনি পর্দার অন্তরালে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দলের নেতাদের সঠিক পরামর্শ দিয়েছেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করলে দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। এসময় ছয়দফা না আটদফা নিয়ে বিভেদ বাড়তে থাকলে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সকল নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে ৬ দফার পক্ষে যুক্তি ও নিজের মতামত তুলে ধরেন। সেদিন যদি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সঠিক নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হতেন, তাহলে বাংলার ইতিহাস হয়ত আজ অন্যভাবে লিখতে হতো।
শুধু তাই নয়, ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব দেয়, লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকের আমন্ত্রণ জানায়। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সেদিন ঠিকই বুঝেছিলেন, এটি পাকিস্তানিদের একটি চাল। তাই তিনি জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে প্যারোলে মুক্তি না নেয়ার জন্যে পরামর্শ দেন। বঙ্গবন্ধুও সেদিন প্রিয় সহধর্মিণীর পরামর্শ মেনে নেন। আজ ইতিহাস বলছে, সেদিনে প্যারোলে মুক্তি নিলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে বড় একটি ধাক্কা লাগত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ৭ মার্চের ভাষণ এক অনবদ্য দলিল, ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ভাষণ। কিন্তু এ ভাষণের আগে বঙ্গবন্ধু বেশ চিন্তিত ছিলেন। দেশের সকল রাজনৈতিক পক্ষকে একসাথে রেখে স্বাধীনতার কথা বলা সহজ ছিল না। তাঁর এ দুঃসময়ে এগিয়ে এলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তিনি বললেন, ‘সারা জীবন তুমি সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছ, তুমি জানো যে এ দেশের মানুষের জন্য কী চাই, তোমার থেকে বেশি কেউ জানে না, তোমার মনে যে কথা আসবে তুমি শুধু সেই কথাই বলবে, কারো কথা শুনতে হবে না। তুমি নিজেই জানো তোমাকে কী বলতে হবে। তোমার মনে যে কথা আসবে তুমি সে কথাই বলবা।’ তাঁর এ কথায় শেখ মুজিব সাহস পেলেন। বেগম মুজিবের পরামর্শে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন। এরপর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে তিনি শুধু নিজের মনের কথাই বললেন। আর এ অলিখিত ভাষণটিই হয়ে গেল বাঙালির মুক্তির বাণী, ইতিহাসের অনন্য সেরা ভাষণ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইগুলো লেখার পিছনে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাদায়ী ছিলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তিনিই খাতা কিনে বঙ্গবন্ধুকে জেলখানায় দিয়ে এসেছিলেন নিজের জীবনের কথা লেখার জন্যে। জেলগেটে দেখা হলে সে অনুরোধও করেছেন বারবার।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব দেশের প্রথম ফার্স্ট লেডি। কিন্তু ফার্স্ট লেডি হয়েও তিনি সাধারণ জীবন-যাপন করেছেন। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নানা দেশ ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু ফার্স্ট লেডি হিসেবে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সেসব ভ্রমণে তাঁর সাথে যাননি, দরিদ্র রাষ্ট্রের অর্থ খরচ করতে চাননি। এমনকি বঙ্গভবন বা গণভবনে থাকতেও চাননি। নেননি বাড়তি কোন রাষ্ট্রীয় সুবিধা। মা-মাটি-মানুষের বঙ্গমাতা নিজের বাড়িতে থেকে সাধারণ জীবন-যাপন করেই আজীবন মানুষের সেবা করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সব কেড়ে নিল। এদিন একদল বিপথগামী নিম্নপদস্থ সেনা কর্মকর্তা ধানমন্ডিতে রাষ্ট্রপতির বাসভবন আক্রমণ করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ পরিবারের সকল সদস্যদের হত্যা করে। সেসময় জার্মানিতে সফরে থাকার কারণে শুধুমাত্র তাঁদের কন্যাদ্বয় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে রক্ষা পান। মূলত সংকটে সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নির্ভীক সহযাত্রী ছিলেন বঙ্গমাতা।
[লেখক : মোঃ শাহাদত হোসেন, সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ]

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com