1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০১:২২ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01867-379991, 01716-288845

জলমহাল ইজারাদারি প্রথা ভীষণ অন্যায় : পরিকল্পনামন্ত্রী

  • আপডেট সময় শনিবার, ২০ মার্চ, ২০২১

সুনামকণ্ঠ ডেস্ক ::
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি বলেছেন, আমাদের ধারণা আগে তো বাঁধ ছিল না। ২০০, ৩০০ বছর আগে তো এসব ছিল না। ছেলেবেলায় আমিও দেখেছি মাঝরাতে চিৎকার-চেঁচামেচি হতো যে পানি ঢুকে যাচ্ছে। তখন কোদাল-টুকরি নিয়ে সেসব বন্ধ করা হতো। আসলে বাঁধের প্রয়োজন ছিল না এমন না। আমাদের সুযোগ ছিল না। সময়ের সঙ্গে তো অনেক কিছুই বদলে গেছে। আমাদের জীবনযাত্রা থেকে অবকাঠামো পর্যন্ত। এখন বাঁধ একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। সেটা কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি করা যায় আমরা সেটা ভাবব। বার্ষিক, দ্বিবার্ষিক কিংবা তিন বছরের প্রকল্প নিয়ে কাজ করা উচিত।
বুধবার এএলআরডি ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ‘হাওরের ফসল, পরিবেশ ও কৃষকের অধিকার সুরক্ষা : রাষ্ট্র ও নাগরিক ভূমিকা’ শীর্ষক একটি অনলাইন বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী এমএ মান্নান আরও বলেন, স্লুইসগেট সম্পর্কে কথা হলো, এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করে। মনে হয় যে এটা খুব কার্যকর। কিন্তু আসলে তা নয়। বরিশালে আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কাজ করে দেখছি স্লুইসগেট কার্যকর হয় না। আমাদের পলিমাটির দেশে উপযুক্ত গবেষণা ছাড়া যেখানে-সেখানে স্লুইসগেট তৈরি কেবলই অর্থের অপচয়। এগুলো চালনা, নিয়ন্ত্রণ সঠিকরূপে হয় না।
তিনি বলেন, পর্যটনের কথা এসেছে। এটি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হচ্ছে। আমার মনে হয় এটা বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে উঠবে- স্টিমার, হোটেল বা যা-ই হোক। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু মৌলিক অবকাঠামো তৈরি করা হবে- রাতারগুল, বিছনাকান্দি, টাঙ্গুয়ার হাওর আমরা পর্যটকদের টার্গেট করেই কাজ করব যেন ন্যূনতম একটা সভ্য ব্যবস্থা তৈরি করা যায়। তবে যে বিষয়টা নিয়ে আমি গর্ববোধ করি, আমরা বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছি। এখন এখানে কাজ করা সহজ হয়েছে। এনজিও কাজ করুক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করুক বা চিন্তকরা গবেষণা করুক, বিদ্যুতের সুবিধা তো প্রয়োজন হবে। সেটা আমরা নিশ্চিত করেছি।
মন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, জলমহাল নিয়ে কথা এসেছে। ইজারাদারি প্রথাটা ভীষণ অন্যায় একটা প্রথা। কিন্তু জলমহাল ইজারা সরকারের নীতি এবং সরকারের অধীনে আমাকেও তা মানতে হয়। কিন্তু এখানে দেখা যায় বর্ষাকালে বিলের সীমানা থাকে না, কিন্তু পুরো বিলকে ইজারাদার নিজের বিল ঘোষণা করে দেয় এবং কোনো গরিব মানুষকে এখানে মাছ ধরতে দেয় না। লিজ নেয়া এলাকার তুলনায় কয়েক গুণ বিস্তৃত এলাকায় গায়ের জোরে কবজা করে। এ প্রথার বিরুদ্ধে আমি সক্রিয়ভাবেই আপনাদের সঙ্গে আছি। নদীখনন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বিভিন্ন বক্তব্যেও এসেছে। আমাদের মূল নদীগুলোকে খনন করা, গভীর করা। এ স¤পর্কে বিশাল পরিকল্পনা আছে। ড্রেজিং স¤পর্কে আমরা অবগত এবং এ বিষয়ে কাজ হবে।
এমএ মান্নান আরও বলেন, কৃষি বিষয়ে বেশি বলার সুযোগ নেই। মেকানাইজেশন স¤পর্কে একজন বলেছেন। এ বছর আমরা এ বিষয়ে কাজে নেমেছি। নীতি সহায়তা, ক্রেডিট সহায়তা ও ভর্তুকি সহায়তা নিয়ে এসেছি। ভর্তুকির নামে বাংলাদেশে এমন সব ভর্তুকি দেয়া হয়, সেসবের তুলনায় এখানে ভর্তুকি বেশি জরুরি। আমাদের সনাতন যে পদ্ধতি, সে পদ্ধতির সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়েছে। এখন যন্ত্রের সহায়তা নেয়া হবে। সেখানে সম্ভাবনা আছে। আমাদের সরকার পুরোদমে নেমেছে। সামনের বছর আরো কাজ হবে।
এমএ মান্নান বলেন, আমাদের বাংলাদেশে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে উন্নয়ন মানেই নির্মাণ। কিন্তু উন্নয়ন আসলে নির্মাণ না। আর হাওর এলাকায় নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত মনোযোগী হতে হবে। এখানে ধাতব বা কংক্রিট ব্যবহার করে পানিপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। জীববৈচিত্র্য ঠিক রেখে, পানিপ্রবাহ ঠিক রেখে, রাস্তা কোনমুখী হবে, সেসব নির্ধারণ করে কাজগুলো করতে হবে। এগুলো মাথায় রেখে কাজগুলো করলে হাওরের উন্নতি করা সম্ভব।
বৈঠকে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাশুক মিয়া বলেন, হাওরে প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। আমাদের মৎস্য স¤পদের ২০ ভাগ আসে হাওর থেকে। এ প্রেক্ষাপটে আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের তত্ত্বাবধানে ২০১২ সালে হাওর স¤পর্কিত সমন্বিত বিষয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান নেয়া হয়। সেই প্ল্যান অনুসরণ করে হাওরের অনেক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ প্ল্যানে ১৭টি সেক্টরের অধীনে ১৫৪টি উপসেক্টর চিহ্নিত করা হয়, যার মধ্যে ১১০টিতে বর্তমানে কাজ চলমান। তবে আমাদের কিছু অভাব রয়েছে, যেমন জনবল, বিধিমালায় কিছু সমস্যা রয়েছে। দৈনিক মজুরিতে এবং ডেপুটেশনে কিছু কাজ করানো হচ্ছে। তবে এ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তর বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। সারা দেশের ওয়েট ল্যান্ডের ইনভেন্টরি ও ক্ল্যাসিফিকেশন করা হয়েছে। সিলেট বেসিনের হাইড্রোমটোলজির স্টাডি হয়েছে এবং এর মাধ্যমে এখানকার নদীগুলোর গতি-প্রকৃতি আমরা জেনেছি। অবকাঠামো তৈরি কারণে হাওরের জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে এগুলো যেন না হয়, সেজন্য আমরা আমাদের গবেষণার আলোকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়গুলো অবগত করেছি। যেমন হাওর এলাকায় পূর্ব-পশ্চিমে রাস্তা করা যায় না। এতে পানির ও মাছের গতিপথ বিঘ্নিত হয়। এখানে কিছু করতে হলে কজওয়ে বা উড়াল সেতু করতে হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ব্যতীত ছয়টি জেলায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে গবেষণা হয়েছে, যেন কোনো কাজের কারণে এ স্তর আরো নিচে নেমে না যায়। এক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহার করা বা এমন কিছু করা যায়, যেন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমে। আমরা স্যাটেলাইট ইমেজের সাহায্যে পুকুর এমনকি টাঙ্গুয়ার হাওরে সমীক্ষা চালিয়েছি।
তিনি বলেন, আমাদের সুনামগঞ্জের ৫৪টি নদীর উৎস উজানে এবং পানির সঙ্গে পলি আসবেই। পানিস¤পদ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সতর্ক। নদী ও খাল খননের জন্য প্রকল্প নেয়া হচ্ছে এবং কাজ চলমান। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আমরা ১০টা নির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিলাম। যেখানে সমন্বিত গবেষণার জন্য ট্রেনিং ইনস্টিটিউট করার কথা বলা হয়েছিল। ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ অনুসারে একটা পরিকল্পনা নেয়া যায়, যেটা এ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল। এ পরিকল্পনা অনুসারে একেকটি গ্রামের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন ইত্যাদি সমন্বিতভাবে কাজ করলে তা অনেক বেশি কার্যকরী হবে। এটি আসলে হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তরের দ্বারা সম্ভব না। কেননা এতটা আমাদের এখতিয়ারে নেই। এলজিইডির পক্ষেই সম্ভব এবং তারা এটা মাথায় রেখে পরিকল্পনা নেয়ার কথা ভাবতে পারে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এস এম শহিদুল ইসলাম বলেন, হাওরের বাঁধ নির্মাণের জন্য এর মধ্যেই গণশুনানি করা এবং স্কিম নেয়া হয়েছে। পিআইসি হচ্ছে। সুনামগঞ্জে ৭৮৭টি পিআইসি হয়েছে এবং খরচ এসেছে ১২৬ কোটি টাকার মতো। এবার হাওরের পানি নামছে দেরিতে, কয়েকবার বন্যা হয়েছে। অক্টোবরে বন্যা হওয়ার কারণে এটা হচ্ছে। এ পানি দ্রুত নামাতে ড্রেজিং করতে হবে। প্রায় ৯০টি কজওয়ে রয়েছে। এগুলোর কাজ হয়ে গেলে দ্রুত পানি নেমে যাবে।
তিনি বলেন, আমাদের ডিজাইনে আরএলের ৬ দশমিক ৫ মিটার বাঁধ নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু ২০১৭ সালের মতো বন্যা হলে তা ঠেকানো যাবে না। কারণ এ বাঁধে তা সম্ভব না। আমাদের কাজের অগ্রগতি হচ্ছে। পিআইসিগুলো সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের সহায়তায় করা হচ্ছে। স্কিমগুলো আসতে দেরি হওয়ায় কাজে দেরি হচ্ছে। এদিকে পানি নামতে দেরি হওয়ার কারণে কাজ পিছিয়ে গেছে, কেননা বাঁধ বেরিয়ে না এলে, সার্ভে না করে স্কিম তৈরি করা যায় না। এজন্য জুলাইয়ে আসলে পিআইসি করা সম্ভব হয় না। আর পিআইসিতে যারা অংশগ্রহণ করেন তা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হাত দিয়েই হয়, এখানে আমাদের করণীয় কিছু নেই। তবে বলব অবশ্যই এখানে স্বচ্ছতা আসা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় কোনো বাঁধ আমরা তৈরি করছি না। কারণ এগুলো জলাবদ্ধতা সৃষ্টির সঙ্গে খরচও বাড়ায়। এখন আপাতত কজওয়েগুলো হয়ে গেলে পানি দ্রুত নেমে যাবে।
তিনি বলেন, হাওরে আসলে বাঁধের বিকল্প কিছুই নেই। পাশাপাশি এখানে ঢালাই করে বা অন্য উপায়ে বাঁধ দেয়াও সম্ভব না। মাটির বাঁধই দিতে হবে। তবে ফসল বাঁচানোর জন্য আর্লি হারভেস্ট করা যায় এমন জাতের ধানের কথা চিন্ত—া করা যায়। আর আমরা আমাদের এখানকার কাজ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ করার চেষ্টা করব।
এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, হাওর, ফসল, বাঁধ নিয়ে আমাদের আলোচনা ঘুরে-ফিরে এর মধ্যে আসছে। এখানে জীববৈচিত্র্য আছে। হাওর কেবল হাওর অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা দেশই এর সঙ্গে যুক্ত। এখানকার জীববৈচিত্র্য নানাভাবে নষ্ট হয়েছে। সেটি রক্ষা করা প্রয়োজন। আমাদের সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে, তবে আমার মনে হয় জাতীয় পরিকল্পনার মধ্যে হাওর নিয়ে আলাদা করে একটি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এখানে সবাই মোটামুটি বলেছেন হাওরের মানুষের অংশগ্রহণে এটা করা প্রয়োজন। আমার মনে হয় মাননীয় মন্ত্রী যদি এদিকে দৃষ্টি দেন, তার নেতৃত্বে এ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন সম্ভব। মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, বঞ্চনা সবকিছু এখানে প্রতিফলিত হবে। হাওরের খাস জমির সঠিক বণ্টন প্রয়োজন। এছাড়া হাওরের মাছের চাহিদা কেবল দেশের ভেতরে না, বাইরেও আছে। হাওরের মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। সীমান্তের ওপারের পানির দূষণ স¤পর্কে বৈজ্ঞানিক গবেষণা দরকার। এরপর সরকার ওই দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করবেন অবশ্যই।
হাওর একটি বিশেষ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হোক। হাওরের একটা আলাদা মন্ত্রণালয় করা যদি সম্ভব না-ও হয়, হাওর উন্নয়ন বোর্ড বা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে সাজানো যেতে পারে। হাওরের মূল সমস্যাগুলো নিয়ে বিস্তৃত গবেষণার মাধ্যমে সেখানকার মানুষ, বিশেষত নারীদের সামনে আনা প্রয়োজন। এছাড়া প্রান্তিক মানুষদের কথা শুনতে হবে এবং তাদের সামনে নিয়ে আসতে হবে। ইজারা প্রথাকে সংশোধন করতে হবে, ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার ব্যবস্থাও প্রয়োজন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন, যেমন রাস্তাঘাট হচ্ছে। অনেক পর্যটক আসছেন, তাদের জন্যও এটি প্রয়োজন। কিন্তু অবকাঠামো এমন না হোক, যাতে হাওর দূষিত হয়। দর্শনার্থীদের জন্যও কিছু নীতিমালা হওয়া প্রয়োজন।
হাউস-এর নির্বাহী পরিচালক সালেহিন চৌধুরী শুভ বলেন, হাওর মূলত কৃষক ও মৎস্যজীবীদের বাসস্থান। বাঁধ নির্মাণ এবং ব্যবস্থাপনা কৃষকদের হাতে দিতে হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনেক ত্রুটি আছে, এসব ত্রুটি সংশোধন করে বাঁধ নির্মাণে কৃষকের কর্তৃত্ব রাখতে হবে। কৃষক যে ফসল ফলান, তা লাভজনক মূল্যে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বিদ্যমান জলমহাল ব্যবস্থা অনুসারে জেলেদের প্রবেশাধিকার নেই। এ নীতিমালা সংশোধনের সময় এসেছে। স্বাধীনতার পর পাঁচবার তা সংশোধিত হয়েছে, এখন আবার তা প্রয়োজন। জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এছাড়া হাওরের জন্য আলাদাভাবে হাওর উন্নয়ন ব্যাংক করা যেতে পারে।
এএলআরডি’র উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি বলেন, আমাদের সংসদীয় আসনের ৩৬টি আসন হাওরের সাতটি জেলার অধীন, যার মধ্যে ১৭টি সুনামগঞ্জে। এটা অভ্যন্তরীণ বিষয়, কিন্তু এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমারও একটি বিষয় রয়েছে। যেমন এটি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এবং সেখানকার কেবল পানি বণ্টন চুক্তি না, পুরো ব্যবস্থার একটি সামগ্রিক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
হাওরের স¤পদ স¤পর্কে বলতে গেলে জলজ স¤পদ এবং ফসলের কথাই মনে হয়, কিন্তু এর বাইরে আরো যে প্রাণিস¤পদ আছে তা-ও কম নয়। হাওরে যেমন আয় হয়, তেমনি দুর্যোগও হয়। ২০১৭ সালে সেটা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। প্রথমত আগাম বন্যা এর কারণ, যেটা এখন প্রাকৃতিক কারণে ঘন ঘন হচ্ছে এবং বাঁধের অব্যবস্থাপনার কারণে তা মারাত্মক আকার ধারণ করছে। যেমন আমরা দেখেছি, যখন বাঁধ নিয়ে কথা হচ্ছে তখন হাওর থেকে কৃষকের ফোন আসছে ভাঙা বাঁধ কীভাবে মেরামত করা যাবে? পরবর্তী সময় এ সরকারের সময়েই তাদের সদিচ্ছার কারণে বাঁধ নির্মাণে নীতিমালা প্রণয়ন ইত্যাদির মাধ্যমে পিআইসি দ্বারা সংকটটি এড়ানো গেছে।
তিবি বলেন, এখানে আমরা ক্ষয়ক্ষতির একটি পরিসংখ্যানের সঙ্গে নানা আর্থসামাজিক পরিবর্তন লক্ষ করছি। গ্রাম থেকে শহরে আসার পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল। নারী ও কিশোরীরা গার্মেন্টসে কাজ করার জন্য চলে এসেছিল। সে সময়ে এ যাতায়াতের জন্য অনেক নাইট কোচ পর্যন্ত চালু হয়েছিল এবং বলা হচ্ছিল হাওরে বেঁচে থাকার শেষ উপায়টুকুও তাদের আর নেই। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তার প্রভাব শিক্ষার ওপর পড়েছে। ছেলে শিশুরা শিক্ষার বদলে কাজের দিকে বেশি চলে যায়। সেখানকার শিক্ষকরা বলেছেন, এখানে ৭০ ভাগ নারীরা স্কুলে যায় আর ছেলেরা ৩০ ভাগ।
হাওরের ফসল আমাদের দেশের খাদ্য চাহিদার জোগান দেয়। হাওরের আয় আমাদের জিডিপির অংশ। কিন্তু এ সময়ে এসে অঞ্চলটা সরকারের ওপর চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার কারণে ব্যাপক ত্রাণ কাজ হয়েছে। সেখানেও দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা হয়নি এমন নয়। পুরো কাঠামোতেই একটা পরিবর্তন চলে এসেছিল এবং পুরোপুরি একটা নির্ভরতা চলে এল। এখন এ বাঁধ ও ফসল উৎপাদনকে আমরা যদি একটু ভিন্নভাবে দেখতে পারি, তাহলে হয়তো এ দুরবস্থা বার বার ঘুরে-ফিরে আসবে না।
হাওরের জলাশয় এবং মতস্য স¤পদ রক্ষার ক্ষেত্রে কিছু নীতিমালা প্রয়োজন। যেমন এখানে লিজ নেয়ার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন অনেক জেলে সংগঠন তা দিতে পারে না। এটা ভিন্নভাবে লোন আকারে তাদের দেয়া যেতে পারে। অনেক প্রভাবশালী লোক এখানে সংগঠন তৈরি করে ইজারা নিচ্ছেন। ফলে একটা দুষ্টচক্র এখানে চলতে থাকে, যা থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বেরোতে পারে না। তাই নীতিমালা সংশোধন বা লিজ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রকৃত জেলেদের সহায়তা করার বিষয়ে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে।
প্রকৃত জেলের কাছে না গেলে আরেকটি যে সমস্যা হয়, যারা ইজারা নেন তারা হাওর সেচে ফেলে অনেক প্রজাতি নষ্ট করে ফেলেন। প্রতি বছর এমন হচ্ছে। প্রকৃত মৎস্যজীবীরা একটি নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্ত মাছ আহরণ করেন, যেন পরের বছরও মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু যারা কেবল ব্যবসার চিন্তা করেন, তারা মাছের বীজ রেখে মাছ আহরণের কথা চিন্তা করেন না। এ বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। বালি উত্তোলন এবং শ্যালো মেশিন ব্যবহারের কারণে পাড় ভেঙে যাচ্ছে। তা বন্ধ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আরেকটি ভিন্ন বিষয় আমি এখানে আনব- বজ্রপাত। এখানে বজ্রপাতে অনেক কৃষক মারা যান। সাধারণ সমাধান হিসেবে গাছ লাগানোর কথা বলা হয়। জয়নাল আবেদিন নামে যে চেয়ারম্যানের কথা বলা হয়, তিনি কড়চ এবং শিমুলের যে বন তৈরি করেছিলেন তা এখনো ঢেউ ও বজ্রপাতের মোকাবেলা করে যাচ্ছে। এরপর তালগাছ লাগানোর কথা ছিল কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের বিভিন্ন আলোচনায় বলা হয়েছে এটি সহজ উপায়। সামনে বজ্রপাতের সময় আসছে। আমি মাননীয় মন্ত্রীর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করে রাখলাম।
পানি স¤পদ পরিকল্পনা সংস্থা’র সাবেক মহাপরিচালক ম. ইনামুল হক বলেন, সুনামগঞ্জে বন্যার যে সীমা, ওটা পরিবর্তন করা হয়েছে, তবে তা উপযুক্ত কিনা সেটা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। হাওরে আমার যে অভিজ্ঞতা, সেখান থেকে আমরা হাওর-পঞ্জিকা তৈরি করেছিলাম। পঞ্জিকায় উল্লেখ করা হয়েছে মাছ এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাছের যে বাসস্থান, সেটা নানা কাজের জন্য নষ্ট হয়। মাছের অভয়াশ্রম প্রয়োজন। দেশে একসময় ব্রিটিশরা এটা করেছিল। আমাদের এখানে এখন দেখা যায় মানুষ বিল, জলাভূমি একদম শুকিয়ে ফেলে মাছের বাসস্থান নষ্ট করে। কিন্তু হওয়ার কথা খাস জমিতে। লিজের ক্ষেত্রে সব বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। হাওর-পঞ্জিকা অনুসরণ করে যদি সঠিক সময়ে পিআইসি করা হয়, তাহলে বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এমনকি ধানের উৎপাদন স¤পর্কেও এখানে বলা আছে। কোন সময়ে কোন ধানের বীজ রোপণ করলে ভালো ফসল পাওয়া সম্ভব—এমনকি স্থানীয় অনেক উচ্চফলনশীল জাতের কথা আছে। কিন্তু এখানে এখন ‘হাইব্রিড’ জাতের অনেক ধান ফলাতে গিয়ে সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। এসব ধান চাষের কারণে দেখা যায় এপ্রিলের দিকে পাহাড়ি ঢলে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছেরা তখন উজানে গিয়ে ডিম ছাড়ে। এর সঙ্গে বাঁধ কাটা, পরিযায়ী পাখির আগমন সবকিছু সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। আমরা হাওরের উন্নয়ন না বলে এখানকার মানুষের উন্নয়নের কথা বরং বলি। কেননা উন্নয়নের নামে অনেক কিছুই করা হয়, যাতে মানুষের ক্ষতি হয়। অবকাঠামোগত উন্নয়নের বাইরে মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নয়ন অবহেলিত। ধান ও ফসল উৎপাদনও ব্যাহত হবে। এগুলো দুশ্চিন্তার বিষয়। এসব নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে আমরা উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারি।
ইরা’র নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, হাওরে মাটি কাটা হচ্ছে, টাকা ঢালা হচ্ছে, কিন্তু গবেষণা খুব বেশি হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। যেমন বাঁধ, হাওরের জীববৈচিত্র্য। শুধু ধান না এখন অনেক কিছুই আছে হাওরে, যা থেকে রোজগার হয়, যেমন পশুস¤পদ। মাছের কথা সবাই জানেন। এখন প্রচুর পর্যটক যাচ্ছেন। মানুষের এ গমনাগমন অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। কিন্তু তাদের জন্য এখানে কোনো অবকাঠামো নেই। তারা বেশ কষ্ট করে যাচ্ছেন, সারা দিন থেকে আবার ফিরছেন। মাননীয় মন্ত্রী আমার চেয়ে অবশ্যই বেশি জানেন। তিনি জানেন এ পর্যটন স¤পর্কে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন। ফসলের ক্ষেত্রে শুধু ধানের কথা না ভেবে ফসল বহুমুখীকরণের কথা চিন্তা করা যায়। শুধু মাটি কেটে আর বাঁধ দিয়ে হাওরের সমস্যা সমাধান করা যাবে বলে আমার মনে হয় না। যে ফসল এখানকার পরিবেশের উপযোগী তা নিয়ে আসা প্রয়োজন।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি ফ্ল্যাশ ফ্লাড কিংবা বোরোই কেবল সমস্যা নয় বরং আমন ধানের ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়েছে। যেমন একজন কৃষকের জমিতে ২২ ধরনের ধান চাষ করা হয়েছিল, কিন্তু তা সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি। সুতরাং কেবল বোরো নয়, আমনের ক্ষেত্রেও এ সমস্যা হচ্ছে। আসলে হাওর প্রকৃতির সৃষ্টি, কিন্তু আমরা সেই প্রাকৃতিক গতি নষ্ট করেছি- কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে, কখনো অনিচ্ছাকৃত। আমাদের নদী বা হাওরের এলাকাগুলো পলি পড়ে এত অগভীর হয়েছে যে পাহাড়ি ঢল ধারণ করার সক্ষমতা তার নেই। উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন কর্মের ফলে সেখান থেকে যে পানি আসে তা আসবেই, যেমন নেপাল থেকে আগে পানি আসতে সময় লাগত পাঁচদিন এখন তা তিনদিনে চলে আসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমার প্রস্তাব হলো সিলেট অঞ্চলের যে নদীগুলো পানিপ্রবাহের জন্য ব্যবহৃত হয়, সেগুলো যদি ঠিক করতে পারি, তাহলে বিদ্যমান সমস্যার অনেকাংশে সমাধান হবে। পাশাপাশি খাল ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখলে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। ২০১৭ সালের বন্যার পর বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টেও পলি পড়ে নাব্যতা কমে যাওয়াকে দায়ী করেছে। এ সমস্যা দূর করার জন্য পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে করা যায় তা যদি ভাবা হয়, তাহলে সম্ভবত এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। প্রতি তিন বছর পর একটা বড় বন্যা হয়ে থাকে। এসব বন্যা দেখে একটা প্যাটার্ন দেখা গিয়েছিল যে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ধান তোলার চেষ্টা করলে ফসল তোলা যেত। কিন্তু এখন বন্যা এগিয়ে আসছে। এখন জমির কিছু অংশে যদি দেশী জাতের ধান চাষ করা যায়, তাহলে উপকৃত হওয়া সম্ভব।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com