1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৫২ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘরে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১

শামস শামীম, শাল্লা থেকে ফিরে ::
‘তরা মুক্তিযোদ্ধা আগে তরারে বাইচ দিতাম। হালার মালাউনের বাচ্চারা আর তরারে ছাড়তাম না। তরা আমরার বড় হুজুরের সম্মান নষ্ট খরছস’ বলে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে খুঁজে এভাবে হামলা করেছে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের অনুসারীরা। এর আগে গ্রামের মসজিদের মাইকে মুসলমানদের হামলায় অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়।
বুধবার সকালে দিরাই উপজেলার নাচনি, চণ্ডিপুর, সন্তোষপুর, সরমঙ্গল, শাল্লার কাশিপুরসহ কয়েকটি গ্রামের লোকজন শাল্লার হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম নোয়াগাঁওয়ে এই তাণ্ডব চালায়। তারা গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে লুটপাটসহ নারীদেরও নির্যাতন করেছে। পুুরুষরা হাজারো আক্রমণকারীদের সশস্ত্র অবস্থায় দেখে আশপাশের গ্রামে পালিয়ে গিয়ে রক্ষা পান। পুলিশ ও র‌্যাবসহ প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতির খবর পেয়ে তারা গ্রামে ফিরে আসেন। বর্বরোচিত এ ঘটনায় নির্বাক হয়ে গেছেন গ্রামের মানুষজন। তারা কঠোর শাস্তি দাবি করলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আক্রমণকারী কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে গ্রামে পুলিশ-র‌্যাব টহল দিচ্ছে। এদিকে ওই গ্রামে আক্রমণ করার পর উপজেলা সদর গুঙ্গিয়ারগাঁওয়ে ও আশপাশের কয়েকটি মুসলিম গ্রামের লোকজন সশস্ত্র হয়ে হামলা করতে আসলে প্রশাসন তাদের ফিরিয়ে দেয়।
সরেজমিনে বুধবার দুপুরে নোয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে দেখা যায় গ্রামবাসী আতঙ্কিত। কিছুক্ষণ আগে বয়ে যাওয়া তাণ্ডবের ট্রমায় ভোগছেন তারা। মানুষ দেখলেই ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছেন।
দুপুরে ওই গ্রামে ছুটে যান জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ও পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান। তারা গ্রামে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহযোগিতারও আশ্বাসও দেন জেলা প্রশাসক।
সরেজমিনে গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানাযায়, গত ১৫ মার্চ হেফাজত নেতা মামুনুল ইসলাম দিরাইয়ে সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি সমাবেশে সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন মামুনুলের বিরুদ্ধে আপত্তিকর পোস্ট দেন ফেসবুকে। এরপরই তার অনুসারীরা তাকে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। গ্রামবাসী আসন্ন বিপদ আঁচ করতে পেরে তারা নিজেরাই পুলিশ ডেকে নিয়ে ঝুমন দাস আপনকে ধরিয়ে দেন। তারপরও সোমবার রাতেই নাচনী, চণ্ডিপুর, সন্তোষপুর, কাশিপুর, সরমঙ্গলসহ কয়েকটি গ্রামের হাজারো মামুনুল অনুসারী বিক্ষোভ করেন। পুলিশ ও প্রশাসন তাদের নিবৃত্ত করলেও বুধবার সকালে আবারও নাচনি মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ‘হুজুরের সম্মান রক্ষায় হিন্দু গ্রামে’ হামলার আহ্বান জানানো হয়। মসজিদের মাইকে এই আহ্বান শুনে বিভিন্ন বয়সের হাজারো লোক লাঠিসোটা, দা, রামদা, কিরিছসহ নানা দেশিয় অস্ত্র নিয়ে ছুটে আসে। তারা দাড়াইন নদী পেরিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামে মিছিল দিয়ে আসতে থাকে। বিষয়টি প্রত্যক্ষ করে গ্রামের নারী-পুরুষ ঘর-বাড়ি ফেলে পালিয়ে যান। অনেকে ঘর তালাবদ্ধ করে ঘরেই বসে থাকেন।
নাচনি গ্রামের স্বাধীন মেম্বার ও ফক্কনের নেতৃত্বে কয়েক শ মানুষ প্রথমে গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র দাস, কাজল চন্দ্র দাস, সুনু রঞ্জন দাস, কাজল চন্দ্র দাস, অনিলকান্তি দাসসহ গ্রামের সাতজন মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘরে হামলা করে। মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্রের পাকাঘরের দরোজা জানালা ভেঙে প্রবেশকরে সবকিছু তছনছ করে। এসময় তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিলে হামলাকারীরা আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে খিস্তিখেউড় করে। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘মালাউন’ আখ্যায়িত করে তাদের বাড়িঘর ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। এরপরে গ্রামের একে একে ৮৮টি ঘরে হামলা ও লুটপাট করে তারা। গ্রামের পারিবারিক চারটি মন্দির ভাংচুর করে। একটি থেকে কষ্টিপাথরের মূর্তিও নিয়ে যায়। প্রতিটি ঘর থেকেই টাকা, পয়সা, সোনা দানাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। গ্রামবাসী পাশের ভাণ্ডাবিল হাওর হয়ে অন্য গ্রামে গিয়ে পালিয়ে বাঁচেন।
হামলাকারীরা যাবার সময় আটককৃত যুবক ঝুমন দাসের ঘরে প্রবেশ করে তার স্ত্রীকেও মারধর করে। তার ঘর থেকে ৪৮ হাজার টাকা, স্বর্ণের চেইনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।
হামলাকারীরা গ্রামের ইউপি চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদারের বাড়িঘরেও হামলা করে। তার বাড়িতে প্রবেশ করে সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়।
গ্রামবাসী জানান, হামলায় অংশ নেয় নাচনি গ্রামের স্বাধীন মিয়া, ইমারত আলী, ইনাত আলী, মির্জা হোসেন, নেহার আলী, আলম উদ্দিন, আনোয়ার হোসেন, আলকাছ, হুমায়ুন, লুৎফুর, মো. ফারুক, আকরাম, কেরামত, কাশিপুর গ্রামের নবাব মিয়া, সাইফুল, আব্দুল মজিদ, তৌহিদসহ শতাধিক লোক। তাদের হাতে রামদা, দা, কিরিছ, লাঠিসহ দেশিয় অস্ত্রশস্ত্র ছিল।
শৈলেন দাস বলেন, ঝুমন দাসকে আমরা নিজেরাই ধরে পুলিশে দিয়েছি। আইনের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। আমার আলমারি ভেঙে সোনা দানা টাকা পয়সা লুট করে নিয়ে গেছে। ঘরের সব কাপড়-চোপড়ও রাখেনি তারা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র দাস বলেন, হামলকারীদের আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেবার পর তারা আরও বেশি আক্রমণ করে। আমার উপরে হাত তুলে। মুক্তিযোদ্ধাদের গালাগালি করে। আমরা সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধার ঘর তছনছ ও লুটপাট করে। হামলার সময় তারা কয় মালাউন অখল আমরার বড় হুজুরকে অসম্মান খরছত, উবা। তরারে দেশ ছাড়া খরতাম। তিনি বলেন, তারার সবার রাগ আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের উপর।
ঝুমন দাস আপনের স্ত্রী তার বাহু দেখিয়ে বলেন, আমাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। গলায় অস্ত্র ধরে টাকা-পয়সা ও সোনা দানা লুট করে নিয়েছে। হাতেপায়ে ধরে আমি রক্ষা পাই।
হেফাজতে ইসলামের দিরাই উপজেলা সহ-সভাপতি মাওলানা নূর উদ্দিন বলেন, কারা হামলায় জড়িত আমরা জানি না।
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমরা গ্রামে এসে সবার সঙ্গে কথা বলেছি। এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। আর কেউ যাতে হামলা না করতে পারে গ্রামে পুলিশ মোতায়েন করেছি। এ ব্যাপারে প্রচলিত আইনে মামলা হবে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এ ঘটনাটি ন্যাক্কারজনক। আমরা দোষীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। তাছাড়া যেসব মন্দির, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের তালিকা করে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছি।
এ দিকে বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোন মামলা হয়নি। কোনো আটকও নেই। তবে আটককৃত ঝুমন দাস আপনকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, হিন্দু বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সুনামগঞ্জ জেলা শাখা। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাড. বিমান কান্তি রায় ও সাধারণ সম্পাদক বিমল বণিক এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, এমন ঘটনা ন্যাক্কারজনক। আমরা হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। সেই সাথে ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে এ জন্য প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com