মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন

Notice :

গ্রিনহাউস পদ্ধতি : হাওরে বারো মাস হবে সবজি চারা উৎপাদন

শামস শামীম ::
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা এখন নিয়মিত কৃষকের ক্ষতির কারণ। প্রতি বছরই বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। ধানের সঙ্গে সবজিও নষ্ট হয়। এ বছর টানা চারবার বন্যায় আমনধানের সঙ্গে সবজির ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। তাই শীতের সবজি উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষক। দুশ্চিন্তার ভাঁজ তাদের কপালে। এই অবস্থায় ‘গ্রিন হিল সিডলিং ফার্ম’ আধুনিক গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে বারো মাস উচ্চফলনশীল সবজি চারা উৎপাদনে নেমেছে। মাটিবিহীন পদ্ধতিতে শূন্য মৃত্যু হার ও পোকা মাকড়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন চারা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনও শুরু করেছে তারা। সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চলে গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে বারোমাস উচ্চ ফলনশীল সবজি চারা উৎপাদন এটাই প্রথম। আগামীতে কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তোলার চিন্তা করছেন দায়িত্বশীলরা। বৃহত্তর সিলেট বিভাগে আধুনিক পলি হাউজে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সবজি চারা উৎপাদনের প্রথম উদ্যোগ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের সীমান্তের গ্রাম আমপাড়ায় এক একর জমিতে প্রতিষ্ঠা হয়েছে ‘গ্রিন হিল সিডলিং ফার্ম’। বর্তমানে আগাম ফলনশীল কয়েক প্রজাতির টমেটো, লাউ, ফুলকপি ও কাঁচা মরিচের চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। মাটির বদলে প্লাস্টিকের তৈরি বিশেষ ট্রেতে কোকোপিট ব্যবহার করে শতভাগ শিকড়যুক্ত চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। তাই মাটিবাহিত রোগজীবাণুতে চারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ নেই।
সরেজমিনে আমপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় গ্রিন হাউজের ভিতরে নিবিষ্ট মনে কাজ করছেন প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা হাসান আহমদ। তিনি চারায় সেচ দিচ্ছেন। নিবিড়ভাবে পরিচর্যা করছেন নানা প্রজাতির চারা। তার পাশেই প্রকল্পটির একজন পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা গাজী নুরুল ইসলামও কাজ করছেন। পাশে আরও চারা উৎপাদনের লক্ষ্যে বেড তৈরি করছেন কয়েকজন শ্রমিক। হাসান আহমদ পরামর্শ দিচ্ছেন। এর মধ্যেই দেখা গেল সাম্প্রতিক চারদফা বন্যায় সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত এক কৃষক গ্রিন হাউজের ভিতর হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করছেন। আগামী সপ্তাহে তিনি টমেটোর চারা সরবরাহের অনুরোধ করেন। কর্তৃপক্ষ তাকে জানান উৎপাদিত চারাগুলো ইতোমধ্যে আগাম বিক্রি হয়ে গেছে। তাই আগামী মাসে চারা নিতে পারবেন তিনি। কিছুক্ষণ পরে এলাকার আরও দুইজন কৃষককেও আসতে দেখা গেল। তারাও চারা নিতে চান। তারাও চার দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। এভাবেই প্রাকৃতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা শীতের সবজির আগাম চারা নিতে প্রতিষ্ঠানটিতে আসছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনার সঙ্গে প্রাকৃতিক সমস্যা এখন প্রকট হয়েছে। বছরের বেশিরভাগ সময়ই বন্যা থাকে। এতে সবজি চারা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই অবস্থা বিবেচনা করে কৃষকদের বারো মাস সবজি চাষে উৎসাহিত করে উৎপাদন বাড়িয়ে সরকারের অভিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘গ্রিন হিল সিডলিং ফার্ম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আধুনিক পদ্ধতিতে সবজি চারা উৎপাদনের লক্ষ্যে আমপাড়া গ্রামে ভাড়া করা এক একর জমিতে যাত্রা শুরু করে ইতোমধ্যে উৎপাদনেও নেমেছেন তারা। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ইউভি সুস্থিত পলি ও শেডনেট দিয়ে দৃষ্টিনন্দন পলি হাউজ তৈরি করেছেন। সীমান্তের পাদদেশে সবুজাভ দৃষ্টিনন্দন এই পলি হাউজ দেখতেও মানুষ ভিড় করছেন।
ভেতরে ঢুকে দেখা গেল আধুনিক এই পলি হাউজে প্লাস্টিক ট্রেতে মাটির বদলে নারকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি কোকোপিট প্রক্রিয়াজাত ও জীবাণুমুক্ত করে বীজ বপন করা হচ্ছে। রোদের তাপ থেকে চারার সুরক্ষার জন্য ওপরে শেডনেট জুড়ে দিয়ে তাপ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কৃত্রিম উপায়ে। ওই শেডনেট ভেতরের উত্তাপ ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিয়ে চারার বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া গ্রিন হাউসের ভিতরে রয়েছে কৃত্রিম দাঁড়কাক। কোন ফাকফোকর দিয়ে পোকা ঢুকলে ওই দাঁড়কাক শুষে নিবে সহজে। হাউসের সংশ্লিষ্টরা জানালেন, পলি হাউজের ভিতরে উৎপাদিত চারা ২০ দিন পরে রোপণযোগ্য হয়ে ওঠে। চারাগুলো শতভাগ শিকড়যুক্ত থাকায় রোপণের পর মৃত্যুহার প্রায় শূন্য এবং মাটিবাহিত রোগজীবাণু থেকেও মুক্ত। উন্মুক্ত জমির চারার তুলনায় এই চারা থেকে ফসল দ্রুত তোলা তোলা যায়। একটি টমেটো চারা থেকে ১০-১২ কেজি টমেটো পাওয়া যাবে। প্রতটি টমেটো, ফুলকপি, মরিচ ও বেগুনের চারার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ থেকে তিন টাকার মধ্যে। লাউ এবং করলা চারার দাম আট থেকে দশ টাকা। শীতকালীন সবজি চারা উৎপাদন শুরু করলেও গ্রীষ্মকালীন সবজি চারা ও গ্রাফটিং বা জোড়কলম পদ্ধতির টমেটো চারা উৎপাদন করার চিন্তা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু গ্রাফটিং টমেটো চারা অধিক ফলনে সক্ষম বলে জানান তারা।
ফার্মে বর্তমানে চারজন শ্রমিক রাত-দিন টানা কাজ করছেন। চারাগুলো দিনে অন্তত তিনবার সেচ দিতে হয়। তাপমাত্রা ঠিক আছে কি না পরীক্ষা করতে হয়। চারায় সময়ে সময়ে ভিটামিন দিতে হয়। শীতকালীন সবজিচারা কৃষকের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে টমেটো, চেরী টমেটো, করলা, ফুলকপি ও বাঁধাকপি, মরিচ, বেগুন, লাউ চারা এখন উৎপাদন করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়াও মিষ্টিকুমড়া, ঝিঙা, গ্রীষ্মকালীন গ্রাফটিং টমেটো, চিচিঙ্গা, শসা, পেঁপে, ক্যাপসিকাম ও স্ট্রবেরির চারাও উৎপাদন করা হবে পর্যায়ক্রমে। সবজি চারা উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কৃষকদেরক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিরা।
আমপাড়া এলাকার কৃষক আবদুল মন্নাফ বলেন, চারবারের বন্যায় আমার সবজি চারা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে চারা তৈরি করার সময় নেই। তাই এখান থেকে আগাম টমেটো চারা নিতে এসেছি। তিনি আরও বলেন, সুনামগঞ্জ জেলায় আমাদের নদীর উত্তরপাড়ের লোকজনই সবজি চাষ করেন। বারো মাস চারা পেলে আমরা সবজি উৎপাদন আরো কয়েকগুণ বাড়াতে পারব।
প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান আহমদ বলেন, বৃহত্তর সিলেট বিভাগে গ্রিন হাউস পদ্ধতিতে ‘গ্রিন হিল সিডলিং ফার্ম’ প্রথম বারের মতো উচ্চ ফলনশীল চারা উৎপাদন শুরু করেছে। বারবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষীরা এখন হতাশ। তারা কৃষি উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। কৃষকরা যাতে বন্যা ও বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন সে জন্য বারো মাস সবজি চারা সরবরাহ করে কৃষি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছি আমরা। আগামীতে গ্রিন হিল সিডলিং ফার্মকে একটি কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সফর উদ্দিন বলেন, আমার জানামতে গ্রিন হাউস পদ্ধতিতে উচ্চফলনশীল সবজি চারা উৎপাদন সুনামগঞ্জে প্রথম বারের মতো হচ্ছে। আমাদের ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য ঘাটতি দূর করতে উচ্চ ফলনশীল কৃষির বিকল্প নেই। হাওরাঞ্চলে এই প্রক্রিয়ায় প্রথম বারের মতো উদ্যোগ নেওয়ায় কৃষকরা অবশ্যই লাভবান হবে। কৃষিতে বিরাট পরিবর্তন আসবে। কারণ লাগাতার বন্যার কারণে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে নানা দিক ভাবতে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী