শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২০, ০৫:৫০ অপরাহ্ন

Notice :

করোনা : সংক্রমণ, শিথিলতা, অতঃপর… : সুখেন্দু সেন

করোনার সঙ্গে একশ দিনের ঘরবসত সম্পন্ন হয়ে গেছে দু’দিন আগেই। ৮ মার্চ দেশে প্রথম কোভিড শনাক্ত হওয়ার পর সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা এখন লাখ ছাড়িয়েছে। অভ্যস্ত যাপিত জীবনের পরিবর্তন, সামাজিক এবং মানবিক ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখি সংকট এবং বিপর্যয়ের যে অভিজ্ঞতা শতদিনে সঞ্চিত হয়েছে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পীড়াদায়ক। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যু। আক্রান্ত হচ্ছেন চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী। মৃত্যুবরণ করেছেন ৪০ জন মেধাবী ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক। মৃত্যুবরণ করেছেন ২৭ জন দায়িত্বশীল পুলিশ সদস্য, আক্রান্ত প্রায় সাড়ে আট হাজার। যারা সামনা সামনি কাজ করছেন তাদের ঝুঁকিটা বেশি হলেও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকেও ছাড় দিচ্ছে না নাছোড়বান্দা করোনা। রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, এমপি, সরকারি চাকুরে, সংবাদকর্মী, ব্যাংক কর্মকর্তা, সাধারণ নাগরিক আক্রান্ত হচ্ছেন প্রতিদিন। ঘটছে মৃত্যু। নিশ্চিত ভাবেই গোষ্ঠী সংক্রমণ শুরু হওয়ায় এখন কে কখন কিভাবে আক্রান্ত হবেন তা বলা মুশকিল। বিপদ ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে।
এমন অবস্থায় সংক্রমণের মাত্রার উপর ভিত্তি করে জোনভিত্তিক লকডাউনের উপর গুরুত্ব দিয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময় সাধারণ ছুটি, লকডাউন, যান চলাচল, দোকানপাট বন্ধসহ অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে লকডাউন শিথিল এবং সীমিত আকারে অনেক কিছু খুলে দেয়া হয়। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই নিয়মবিধি বা স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মান্য না করার ফলে সংক্রমণ বা মৃত্যুহার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি বৈ হ্রাসের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় নি। এই শিথিলতাই সংক্রমণ উস্কে দিয়েছে।
বর্তমান জোনভিত্তিক লকডাউনের নিয়মবিধি বা পরিপালন নীতি এখন পর্যন্ত সাধারণের কাছে তেমন বোধগম্য নয়। আমাদের সুনামগঞ্জ পৌরশহরসহ বেশকিছু এলাকা দুর্ভাগ্যজনকভাবে রেডজোনের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এ যাবৎ কোনো ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যাচ্ছে না। সংক্রমণ এবং মৃত্যু এখন কাছাকাছি চলে আসার পরেও সাধারণের মাঝে তেমন সচেতনতার লক্ষণ দৃশ্যমান হচ্ছে না। রাস্তাঘাটে, চৌমোহনায় ভিড় জটলা, মাস্ক ছাড়াই ঘুরে বেড়ানো, হাঁচি, কাশির শিষ্টাচার রপ্ত না করা, যত্রতত্র থুথু ফেলার বদঅভ্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে না।
আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আমরা পৌঁছে গেছি। চাইলেই রাতারাতি চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বা উন্নতি সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতিদিনই সংক্রমণ বেড়ে চলছে। রোগী বাড়ছে। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। এ অবস্থায় রোগীর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলে বিপর্যয়ের মাত্রা যে আরো বেড়ে যাবে তা সহজেই অনুমেয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক যেটি, সেটি হলো- চিকিৎসকদের আক্রান্ত হওয়া। একজন চিকিৎসকের আক্রান্ত হওয়ার অর্থ তাঁর সহযোগী কয়েকজনসহ আইসোলেশনে যাওয়া, চিকিৎসা সংকট আরো ঘনীভূত হওয়া। বিশ্বজুড়ে এমন অভাবনীয় চিকিৎসা দুর্যোগে যে মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন চিকিৎসাকর্মীদের সহযোগিতা করা, তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা তখনই বিবেচনাহীনভাবে খুলনার একজন চিকিৎসকের উপর হামলা চালিয়ে হত্যা করা বাস্তবিক অর্থেই জঘন্য অমানবিক। চিকিৎসকদের ধৈর্য, মানসিক অবস্থার উপর এর বিরূপ প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার প্রতিটি মানবিক বোধসম্পন্ন নাগরিকের কাম্য।
আমাদের সুরক্ষার দায় বহুলাংশেই আমাদের নিজেদের উপর নির্ভর করছে। নিজে সচেতন থাকা, সতর্ক থাকা। রোগটি ভীষণ ছোঁয়াচে হলেও সহজ নিয়মবিধি পরিপালন করে সংক্রমণ সীমিত রাখা যায়। সে সঙ্গে প্রয়োজন বর্তমান অবস্থায় সরকারের বেধে দেয়া নিয়মনীতির সঠিক বাস্তবায়ন, কঠোর প্রয়োগ ও সমন্বয়।
হতাশা বা আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে আসুন আমরা সচেতন হই। কোভিড আক্রান্তদের প্রতি সহানুভূতিশীল হই। আমাদের জন্য যারা জীবনবাজি রেখে, পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তাদেরকে সহযোগিতা করি। পরিবারের জন্য, প্রতিবেশীর জন্য, সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য মানবিক দায়িত্ব পালন করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী