মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০, ০৬:০০ অপরাহ্ন

Notice :

করোনায় স্থবির জনজীবন

শামস শামীম ::
প্রাণঘাতি নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকটা সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। করোনার ভয়াবহতা আঁচ করে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে পরিবর্তনও নিয়ে আসছে অনেক মানুষ। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের ফলে পথের চা-পানের টঙ দোকানে বসে-দাঁড়িয়ে অযথা আড্ডায় রাজা উজির মারার দৃশ্য দেখা যায় না। আগের মতো আয়েশ করে চা পান বা সিগারেটে সুখটানের দৃশ্য চোখে পড়েনি। তবে এই সচেতনতার মধ্যেও স্বল্প ও ক্ষুদ্র আয়ের কিছু মানুষ পড়েছেন বিপাকে। তারা চোখে অন্ধকার দেখছেন। এই অবস্থায় নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও তাদের হতাশ করেছে। এখন নিত্যপণ্য ও ওষুধের দোকান বন্ধের নির্দেশনায় তারা আরো ভেঙে পড়েছেন। এই অবরুদ্ধ অবস্থায় এসব মানুষ সরকারি সহযোগিতা দাবি করেছেন।
বুধবার দেখা গেছে, শহরে রিকসা ও অটোরিকসা চলছে খুবই সীমিত আকারে। ছোট-বড় কাপড়ের দোকান, স্টেশনারি দোকান, হোটেল রেস্টুরেন্টসহ সবই বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনের বাইরে কেউই ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্ক অবস্থায় থাকতে দেখা যায়।
এদিকে, করোনা ভাইরাসে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ। শহরের পৌর মার্কেটে দীর্ঘ একযুগ ধরে চায়ের দোকান দিয়ে সংসার নির্বাহ করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুজন মিয়া। এই আয়েই তার সংসার চলে। তার দোকানে আরো দুইজন কর্মচারী আছে দিনমজুর হিসেবে। সুজন মিয়া জানান, গত এক সপ্তাহে তার বিক্রি কমে এসেছে। এখন দোকান বন্ধ। তাই আয়-রোজগার বন্ধ। এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন সুজন। তাছাড়া চালডাল ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণেও জীবন নিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে তাদের।
সুজন মিয়া বলেন, আমার চলার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আমার দোকানের দুই দিন মজুরের অবস্থাও আরো খারাপ। তারা দিনমজুর হিসেবে শ্রমমূল্য পেতো। এখন দোকান বন্ধ থাকায় তারাও বেকার। আমাদের কারোরই আয় রোজগার নেই। নিত্যপণ্যের দোকানেও জিনিষের দাম বেশি। তিনি ও তার দোকান শ্রমিকদের সরকারি সহায়তা প্রয়োজন বলে জানান সুজন মিয়া।
পৌর মার্কেটেরই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মানবেন্দ্র কর। তার ছোট্ট দোকানে কাপড় ও বইয়ের যৌথ ব্যবসা। কর্মচারী তিনজন। এখন দোকান বন্ধ। মানবেন্দ্র কর বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে জীবন বাঁচানো নিয়ে সবাই যেখানে শঙ্কিত সেখানে নতুন কাপড়ের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ কমেছে। দোকান বন্ধ থাকায় এখন চোখে অন্ধকার দেখছি। কিভাবে যে দিনগুলো অতিবাহিত করবো সেটা নিয়ে চিন্তিত।
মুদি দোকানি জ্যোতিষ বৈদ্য বলেন, বাজারে মানুষের উপস্থিতি কম। আগের তুলনায় বিক্রিও কম। এভাবে চলছে দোকানভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করাই কঠিন হবে। সরকারি সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন। তিনি বলেন, একেবারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমি। যে পণ্য বিক্রি করি তা এখন বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
বুধবার বেলা ২টার দিকে রিকসা চালক আমিরুল ইসলাম শহিদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সামনে রিকসা থামিয়ে সিটে বসে ঝিমুচ্ছিলেন। তার মুখে মাস্ক লাগানো। তিনি জানালেন, একটি সংগঠন তাকে একটি মাস্ক ও সাবান উপহার দিয়েছে। এই মাস্ক লাগিয়েই তিনি এখন রিকসা নিয়ে বের হন। আমিরুল বলেন, রিকসা নিয়ে বের হলে কি হবে আগের মতো প্যাসেঞ্জার মিলে না। তাই রিকসাভাড়া পরিশোধ করে যা আয় হয় তা দিয়ে পরিবারের ভরণ পোষণ চলে না। তাছাড়া পরিবহন বন্ধের নির্দেশনা ও মানুষকে ঘর থেকে বের হওয়ার সরকারি নির্দেশনার কারণে তিনি করবেন ভেবে ওঠতে পারছেন না। আমিরুল এই অবস্থায় সরকারি সহযোগিতা দাবি করলেন।
শহরের কার্লস হেয়ার একটি ব্যস্ত সেলুন। তিনজন কারিগরের সবাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে ৩-৪টি করে কাজ করতে পারেন একেকজন। দৈনিক আয়ের উপর নির্ভরশীল ক্ষৌরকাররা এখন বিপাকে পড়েছেন।
এই সেলুনের কারিগর রাজু বলেন, আমি প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে ৩-৪টি কাজ করছি। মানুষ সেলুনে আসে না। আর এখন তো সেলুন বন্ধ। তিনি বলেন, এই আয়েই আমার ৫ সদস্যের সংসার চলে। এখন দোকান বন্ধ থাকায় মনটা খারাপ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমরা যারা নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষ তাদেরকে সরকারি সহায়তা দেওয়া উচিত।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, সরকার বাড়ি ফেরা লোকদের ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই অবস্থায় অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষদের সহযোগিতার জন্য কোন সহায়তা আমরা পাইনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী