শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ০২:৪৮ অপরাহ্ন

Notice :

দুই মাসে বাঁধের কাজ অর্ধেকও হয়নি

শামস শামীম ::
দুই মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হলেও এখনো সুনামগঞ্জের হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ অর্ধেকও সম্পন্ন হয়নি। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এই সময়ে এসে কাজ শেষ হবেনা বলে মনে করছেন কৃষকরা। যথাসময়ে কাজ শেষ না হলে বাঁধ টেকসই হবেনা বলে জানিয়েছেন তারা। তাছাড়া বেশিরভাগ প্রকল্পেই এখন পর্যন্ত কম্পেকশন ও দুর্বাঘাস লাগানো হয়নি। অনেক স্থানে কাজই শুরু হয়নি। যার ফলে বাঁধগুলো নড়বড়ে রয়ে গেছে। এবারও অপ্রয়োজনীয় ও অক্ষত প্রকল্পে অধিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ছিল শুরু থেকেই। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলীকেও এ বিষয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি অবগত করে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। তারা বাঁধের কাজে অনিয়ম, ধীরগতি, অক্ষত ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে বরাদ্দ প্রদান, পিআইসি গঠনে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে মানববন্ধন, সমাবেশসহ স্মারকলিপিও প্রদান করেছেন। উল্লেখ্য ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার চূড়ান্ত নির্দেশনা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত জেলায় ৭৪৯টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৮ কোটি টাকা। সকল প্রকল্পে ৬৩৩.৬৯ কি.মি. বাঁধের জন্য প্রাক্কলন করা হয়েছে ১২৮.৮৪ কোটি টাকা। গতবারের বেশিরভাগ বাঁধই অক্ষত থাকার পরও এবার প্রকল্প ও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে বলে প্রশাসন আয়োজিত বাঁধের অগ্রগতি বিষয়ক মতবিনিময় সভায় কৃষক নেতারা বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন। তাছাড়া দুদক সচিব মোহাম্মদ দিলোয়ার বখতের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায়ও হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি অবগত করেছিলেন।
কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ হাওর পরিদর্শন করে জানিয়েছেন এখনো অর্ধেকের বেশি কাজ বাকি রয়ে গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জানিয়েছে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৬২ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে। হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণে গঠিত পিআইসিকে (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) ৫০ ভাগ বিলও পেয়ে গেছে। অবশিষ্ট বিল তোলতেও তারা তৎপরতা শুরু করেছেন।
মহালিয়া, শনি, হালির হাওর, বরাম হাওর, চন্দ্রসোনারথালসহ বেশিরভাগ হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ এখনো পিছিয়ে আছে। বরাম হাওরে এবার ৩৮.৩৬৫ কি.মি. বাঁধ নির্মাণ করার কথা থাকলেও এখনো তিনভাগের একভাগ কাজও শেষ হয়নি। বরাম হাওরের একাধিক প্রকল্পে যেসব কাজ হয়েছে তাও সাথে সাথেই ধসে পড়ছে গোড়া থেকে মাটি তোলার কারণে। ওই হাওরের ছাটাখাউরিতে পাশাপাশি দুটি বাঁধে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে। এই হাওরসহ অন্যান্য হাওরের বাঁধের কম্পেকশন ও দুর্বাঘাস লাগানোর কাজ এখনো শুরু হয়নি। জামালগঞ্জ উপজেলার লালুরগোয়ালা বাঁধের কাজও এখনো অর্ধেক হয়নি। এই প্রকল্প গ্রহণে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলে শুরু থেকেই অভিযোগ আছে। এছাড়া ৭, ৮ ও ৯নং প্রকল্পের কাজও সন্তোষজনক নয় বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। কৃষকরা বলছেন, অধিকাংশ বাঁধেই গোড়া থেকে মাটি তোলায় শুরু থেকেই বাঁধগুলো ঝুঁকিতে আছে। বৃষ্টি হলে বা পাহাড়ি ঢলের প্রথম ধাক্কা এসব বাঁধ সামলাতে পারবেনা বলে মনে করেন কৃষকরা। তাছাড়া বিভিন্ন এলাকায় এমন সব প্রকল্প দেখা গেছে যেখানে এখনো একমুঠো মাটিও পড়েনি। যার ফলে কৃষকরা পাহাড়ি ঢলে ফসলহানির ঝুঁকিতে রয়েছেন।
শাল্লা উপজেলার বরাম হাওরের ১২, ১৪, ১৫, ৩৯, ৩৬নং পিআইসি ঘুরে দেখা গেছে সবগুলোতেই নিম্নমানের কাজ হয়েছে। এই হাওরের কাশিপুরের পূর্বপ্রান্তে একটি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর সভাপতি হয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার পুত্র রেজাউল করিম লিটন। ৭ লাখ টাকার ওই প্রকল্পের কোন সাইনবোর্ড নেই। এখনো কাজই শুরু করা হয়নি। উপজেলার ১৪ নং পিআসি বাঁধের কাজে গোড়া থেকেই মাটি উত্তোলন করায় সাথে সাথেই ধসে পড়ছে মাটি। তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই, জগন্নাথপুরসহ অন্যান্য এলাকার বাঁধের কাজের অবস্থাও একই রকম বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, গত ৮ ফেব্রুয়ারি হাওরের বাঁধ পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে পানিসম্পদ মন্ত্রী জাহিদ ফারুক নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রাক্কলন অনুযায়ী যথাসময়ে কাজ সম্পন্ন করতে। গত সোমবার মন্ত্রণালয়ের একটি টিমও বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি বাঁধ পরিদর্শন করেছে। গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক জামালগঞ্জের বিভিন্ন বাঁধ পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তিনি স্থানীয়দের বাঁধের কাজ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি থাকলে তাঁকে অবগত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে প্রকাশ্যে দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার প্রমাণ মিললেও রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
জামালগঞ্জের কৃষক নেতা আবুল কাশেম বলেন, আমাদের উপজেলায় এবার বেশিরভাগ প্রকল্পেই অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। পিআইসি গঠন থেকে দুর্নীতি শুরুর পর এখন বাস্তবায়নে এসেও অনিয়ম হচ্ছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না। তাছাড়া কাজে ধীরগতির কারণে যথাসময়ে কাজ শেষ হবে না। ফলে কৃষকরা ফসল নিয়ে শঙ্কায় আছেন।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, এবার অপ্রয়োজনীয় ও অক্ষত প্রকল্পে বরাদ্দ দিয়ে সরকারি অর্থ অপচয়ের মচ্ছব চলছে। আমরা মন্ত্রীসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রকল্পের নাম ধরে অভিযোগ করেছি। মানববন্ধন, সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি করেছি। তাছাড়া এখন পর্যন্ত অর্ধেকও কাজ হয়নি। যা হয়েছে তাতেও এখনো কম্পেকশন ও ঘাস লাগানো হয়নি। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে কাজ শেষ কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব মো. সবিবুর রহমান বলেন, প্রায় সাড়ে সাতশ প্রকল্প গ্রহণ করে এবার কাজ শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকায় পানি বিলম্বে নামার কারণে কাজে বিলম্ব হচ্ছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করে পিআইসিকে ৫০ ভাগ বিল প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, মাটি ভরাটের পাশাপাশি বাঁধের কম্পেকশন ও ঘাস লাগানোও চলছে। কোথাও অনিয়ম হলে সাথেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।
কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, আমি বিভিন্ন মনিটরিং টিম নিয়ে নিয়মিত হাওররক্ষা বাঁধের কাজ পরিদর্শন করছি। কোথাও ত্রুটি পেলে সংশোধনের নির্দেশনা দিচ্ছি। তাছাড়া অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও কাজের মানে ত্রুটি থাকলে তা আমাকে জানানোর জন্যও আহ্বান জানিয়েছি। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে যাতে হাওরের ফসলের কোন ক্ষতি না হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী