1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
রবিবার, ১৫ মে ২০২২, ১১:৩৫ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

বদরুলের পরিচয় নিয়ে যত কথা

  • আপডেট সময় শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৬

মো. আখলাকুর রহমান ::
বদরুল কে, কি তার পরিচয়… এ নিয়ে এরই মধ্যে একটা অনাবশ্যক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। প্রেক্ষিত হলো, গত ৩ অক্টোবর এ নরপশু ফুলের মত নির্মল একটা মেয়ের উপর যে পৈশাচিক কায়দায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, স্মরণকালে এরূপ অকল্পনীয় বীভৎস্যতা কেউ প্রত্যক্ষ করেনি।
কে এই বদরুল? সহজ করেই বলতে হয়, সে এক মানব সন্তান ছিল। তার মা ছিল, বাবা ছিল, বোন ছিল, আত্মীয়-স্বজন ছিল, সমাজ ছিল। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ছিল, সে একজন শিক্ষকও ছিল, একটা রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাও ছিল …এ সবই সত্যি। সে মানুষ ছিল, তবে তাবৎ মানবিক কান্ড জ্ঞান ঝেড়ে ফেলে এক নিমিষেই যেনো একটা নিকৃষ্ট হায়েনায় পরিণত হয়েছে। সে নার্গস (খাদিজা)-কে কোপাতে কোপাতে তার নামের ‘রুল’ অংশটাকেও খন্ডিত করে ফেলেছে। এরপর থেকেই তার নাম হয়ে গেছে শুধুই ‘বদ’! এখন তাই তার অখন্ডিত সে পূর্ব নামটা উচ্চারণ করতে চরম ঘৃণা আর বড়ো বেশি অনীহা হচ্ছে আমার।
মানবিকতার সকল গুণাগুণকেই কুপিয়েছে এ পাষন্ড। সে বলছে, প্রেমের বঞ্চনা নাকি এর পেছনের কারণ! কত বড় হিং¯্র এক প্রেমিক? প্রেম ভালবাসা তো মানবিকতার প্রথম এবং প্রধান উপকরণ। যুগে যুগে এই প্রেমকে কেন্দ্র করে মানুষেরা কত গাঁথা-কাহিনী-উপাখ্যানের জন্ম দিয়েছে। একজন প্রকৃত প্রেমিক যতই প্রত্যাখ্যাত হোক, কোনভাবেই সে তার প্রেমিকার অমঙ্গল কামনা করতে পারে না কিংবা তাকে মেরে ফেলার চিন্তা করতে পারে না। উল্টো বিরহের আগুনে পুড়ে পুড়ে জীবন পার করে দেয়। অথচ এ ‘বদ এমন এক হঠকারি ক্রোধান্ধ প্রেমিক, অল্প সময়ের ভেতর যার প্রতিশোধের ¯পৃহা অপ্রকৃতিস্থ শেয়াল-কুকুরদেরও ছাড়িয়ে গেছে! সে প্রেমিকার বুকে ছুরি বসালে বা তাকে গলাটিপে মেরে ফেললে হয়তো আমাদের এত বেশি ভয় কিংবা কষ্ট হতো না। কিন্তু প্রকাশ্য দিনের আলোয় পরীক্ষা দেয়ার ক্লান্তি নিয়ে বেরিয়ে আসা একটা অবলা মেয়েকে তার সহপাঠিদের চোখের সামনে যে ‘বীরদর্পে’ লাশ হয়ে পড়ে থাকা মৃতপ্রায় অবস্থায় কোপালো… মানবকুলে এ রূপ নির্দয় হন্তারক আর দ্বিতীয় একটা খুঁজে পাওয়া যাবে কি?
নার্গিস আমার মেয়ে হতে পারতো। আমি একজন বাবা দূর থেকে সকাতরে ওর ‘মা-মাগো’ করে প্রাণান্ত আর্ত চিৎকার শুনেছি। এ দুঃসহ মর্মভেদী ঘটনার সামনা সামনি হলে বোধ করি আমি ঐ বদ এর ২৫০ টাকায় কেনা চাপাতির কাছে নিজেকে সঁপে দিতে পারতাম, তবুও নার্গিসের গায়ে এতগুলো কোপ পড়তে দিতাম না। এ সময় যারাই আশেপাশে ছিল, তারা খুব বড় মাপের কাপুরুষতা দেখিয়েছে, যা একেবারেই কাম্য ছিল না। এভাবে চলতে থাকলে মানবিক মূল্যবোধ যে ক্রমেই রুদ্ধ হয়ে পড়বে। আমাদের সমাজ হয়ে উঠবে বসবাসের অনুপযোগী।
সারাদেশে প্রায়ই নানা রকম নৃশংসতা ঘটছে। বিশেষ করে স্কুল কলেজে পড়–য়া অনেক মেয়ে নানাভাবে নিগৃহীত হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে। অথচ দৃশ্যমান অনেক ঘটনাই তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা খুব কমই চোখে পড়ে।
একটা নিরীহ, নিরপরাধী মেয়ের প্রতি একটা জানোয়ারের এমন ফ্রি স্টাইলে বাহাদুরি করার দৃশ্যটা দেখে অন্য সবার মতো আমি নিজে ও অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছি। পেশাগতভাবে আমি একজন শিক্ষক। বদরুলের মতো শত শত ছেলে এবং নার্গিসের মতো অসংখ্য মেয়েও আমার রয়েছে। ভাবি ঐ ‘বদ’ এর মতো যদি কোনো একটা ছেলে হয়ে যায় কিংবা নার্গিসের মতো যদি আমার কোনো একটা মেয়ে কখনো আক্রান্ত হয়? ভয়ের জায়গাটা আমার এখানেই।
এ বদরুল মানবসমাজ থেকে স¤পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক অমানুষ। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সকল যোগ্যতা সে হারিয়ে ফেলেছে। ‘বদ’ হয়ে ওঠা এ বদরুলকে এক মাত্র বধ করাই এখন সকলের সামনে প্রধান কাজ। কে তার দায় নেবে? তার মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, বিশ্ববিদ্যালয়ের তার শিক্ষক, তার রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, কিংবা তার কর্মস্থলের সহকর্মীগণ? না, কেউ নয়।
সম্প্রতি আমরা দেখেছি, রাজধানী ঢাকা’র হলি আর্টিজান ও কল্যাণপুরে নিহত জঙ্গিদের মা-বাবা-স্বজনরা তাদের লাশ পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। বদরুল ইতোমধ্যে তার কর্মস্থল থেকে চাকুরিচ্যুত হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বহিষ্কৃত হয়েছে। সে এখন কারোই নয়। আর এভাবেই এখন জীবিত বা মৃত বদরুলের গ্রহণযোগ্যতা কোথাও থাকবে না, থাকতে পারে না।
তবে যে বিষয়টা দৃষ্টিকটু লাগছে তা হলো, কিছু সংবাদ মাধ্যমে তার নামের পেছনে ‘ছাত্রলীগ নেতা’ উপাধিটা এখনো বহাল রেখে চলেছে। এটা ঠিক হচ্ছে বলে মনে করি না। ঐ দিন থেকে এ ‘বদ’ এর আর কোনো মানবীয় পরিচয় থাকতে পারে না। ঘটনাকালীন সময়ের প্রত্যক্ষদর্শীদের নির্লিপ্ততার বিষয়টা ন্যাক্কারজনক হলেও পরবর্তিতে গণপ্রতিরোধ এবং সামাজিক ও গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা হচ্ছে নিঃসন্দহে ইতিবাচক। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এসে এক কাতারে দাঁড়িয়েছেন। দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে দলমত নির্বিশেষে সিলেটের সকল নেতারা একাট্টা হয়ে সক্রিয় রয়েছেন।
বদরুলের দল তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে তৎপর। জাতীয় সংসদে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার পরিচয় যাই হোক, কোনো ছাড় দেয়া হবে না। তবে বদরুলকে নিয়েও খেলা একেবারে থেমে নেই। অমুক-তমুক এই সেই বলেছেন বলে দোষারোপ তৈরির চেষ্টা, তাকে কোন দলের দিকে টানা বা ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা, নানারকম গুজব সৃষ্টি গোলমাল বাধানোর অপকৌশল, এ কোনো কিছুই কাজে লাগবে বলে মনে হয় না। এর আগে গতবার সিলেটে পৈশাচিকভাবে শিশু রাজন হত্যাকান্ডের ঘটনায় ও আমরা এমনটা দেখেছি। অবশ্য সে সময় ও ঘাতকদের গায়ে রাজনৈতিক লেবেল লাগানোর কাজসহ কিছু কিছু অপতৎপরতা এমনকি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসৎ ব্যক্তির যোগসাজশে মূলঘাতক বিদেশ পর্যন্ত পালিয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। তাকে বিদেশ থেকে ধরে আনা হয়েছে, আর দ্রুত ও স্বচ্ছতার সাথে সে ঘটনার বিচারও হয়েছে। বর্তমানে বিরাজমান পরিস্থিতিতে ধরেই নেয়া যায়, এ জঘন্য ঘটনার ও যথাযথ প্রতিবিধান হবে।
এবারও যারাই এ নির্মম ঘটনাকে পুঁজি করে ধান্দাবাজির চেষ্টায় আছেন তাদেরকে বলবো, সাবধান হয়ে যান। কারণ, এখন আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করার সময়। যাতে এমন অপরাধী দৈত্যরা সমাজে স্থান না পায়, ভবিষ্যতে যাতে এ রকম দুর্মূখেরা সমাজে জন্ম না নেয় বা গজিয়ে উঠার সুযোগ না পায়। এ কালের এক মহাবীর ‘বদ’ আমাদের নার্গিসকে মৃত্যু উপত্যকায় ঠেলে দিয়েছে। জীবন মরণের মাঝামাঝিতে এখনো রয়েছে মেয়েটা। পরম করুণাময়ের কাছে কায়োমানুবাক্যে প্রার্থনা করি, প্রিয় নার্গিস আামাদের মাঝে ফিরে আসুক। তার মমতাময়ী মায়ের মুখে আবারো হাসি ফুটুক, তার মুখে খাবার উঠুক। কারণ, তিনি তো বলেই দিয়েছেন, তার আদরের ময়না ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি যে আর খাবেন না !
[লেখক : অধ্যক্ষ, জনতা মহাবিদ্যালয়, ছাতক, সুনামগঞ্জ।]

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com