1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০২:১৯ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01867-379991, 01716-288845

শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রমিত বাংলা

  • আপডেট সময় রবিবার, ২ অক্টোবর, ২০১৬

শেখ রফিকুল ইসলাম ::
ছোট ছোট বাচ্চাদের একসাথে সুর করে পড়াটা আমার কাছে পাখির গানের মত মনে হয়। অথবা নদীর কুল কুল ধ্বনি। অথবা বর্ষার সময় টিনের চালে বৃষ্টির মধুর শব্দ। আমি থেমে যাই। চলতে চলতে। ফিরে যাই আমার রঙিন শৈশবে। প্রিয় পাঠশালায়। প্রকৃতি, ঘাস, প্রজাপতি, ঘুড়ি, মেলা, সুর করে পড়া, টিফিন ভুলে, পুব আকাশে সূর্যের হেলে পড়া একদম খেয়াল না করে সারাটা দুপুর খেলা, জানালার বাইরের বিকেলের রোদ বইয়ের পাতায় মেখে, চোখে বন্যার মত নেমে আসা ঘুম দু’পায়ে খেলার ছন্দে আটকিয়ে বিকেলের মাঠকে জয় করে সন্ধ্যার কুপি বাতির আলোয় পরদিনের পড়া মুখস্ত।
আমি গাড়ি থেকে নেমে প্রায়ই চলে যাই সে কুসুম কাননে। প্রাথমিক বিদ্যালয়। জ্ঞানবৃক্ষের শিকড়ে। আমি তাদের সাথে কথা বলি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এসব শিশুদের সাথে। তাদের চঞ্চলতা আমাকে মুগ্ধ করে। পড়াশোনায় তাদের অসীম আগ্রহ আমাকে স্বপ্ন দেখায়। আমাদের ক্ষুদে বিদ্বানগণ অবশ্যই একদিন বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তারা একদিন সারা পৃথিবীর নেতৃত্ব প্রদান করবে। তবে শ্রেণি কক্ষে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার আমাকে চিন্তিত করে। শিশুদের কচি মনে শেখানো জিনিস সহজেই প্রবেশ করে এবং স্থায়ী হয়। সুতরাং তাদেরকে অবশ্যই ভালো কিছু শেখানো উচিত। আমি বলছি না যে, আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ অগ্রহণযোগ্য কিন্তু পড়ানোর মাধ্যম হিসেবে অবশ্যই প্রমিত এবং শুদ্ধ ভাষার ব্যবহার করতে হবে। এ বিষয়ে প্রতিটি দর্শন-পরিদর্শন প্রতিবেদনে বারবার নির্দেশনা দেয়ার পরও দুঃখজনকভাবে তার প্রতিফলন আশানুরূপ হচ্ছেনা। তার জন্য আমাদের অভ্যাসগত আচরণ হয়তো অনেকাংশে দায়ী তবে একটু আন্তরিক হলেই আমরা আঞ্চলিকতার এ সমস্যাটা কাটিয়ে উঠতে পারব বলে আমি মনে করি।
ভাষার দু’টি রূপ রয়েছেÑ চলিত এবং সাধু ভাষা। চলিত ভাষার একটি রূপ হচ্ছে কথ্য ভাষা যা মানুষের মুখ নিঃসৃত স্বতঃস্ফূর্ত বাণী হিসেবে আঞ্চলিকতার বহুরূপ নিয়ে এক বৈচিত্র্যময় ভাষা হিসেবে পরিচিত। সাহিত্যে এর প্রভাব ব্যপক। আমেরিকার নাট্যকার ইউজিন ও নীল আমেরিকার আঞ্চলিক ইংরেজিতে নাটক লিখে সারা বিশ্বে নাট্যকারদের মধ্যে এক অনন্য খ্যাতি পেয়েছেন। এ পথে হেঁটেছেন আর্থার মিলার, হেরল্ড পিন্টার, টনি মরিসন সহ বহু খ্যাতিমান সাহিত্যিক। বিশ্বসেরা নাট্যকার উইলিয়াম শেকসপিয়ার এবং ইংরেজি সাহিত্যের জনক চসার-ও তাঁদের লেখনিতে আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ করেছেন। আঞ্চলিক শব্দে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা সাহিত্যও। ষড়ঋতুর রূপ বৈচিত্র্যময়তার মতো বহু আঞ্চলিক শব্দ বাংলা ভাষার রূপ বাড়িয়েছে, সাহিত্যকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। কিন্তু শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ভাষা অবশ্যই প্রমিত এবং পরিমার্জিত হতে হবে। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধির পাশাপাশি তার অন্তর্জগত ও বহিঃজগত সম্প্রসারিত হয়। সে হয়ে উঠে এক বিশ্ব নাগরিক। আর বিশ্ব সমাজের সাথে যোগাযোগে এবং বাংলাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করিয়ে দিতে প্রমিত বাংলায় কথা বলা এবং লেখা অপরিহার্য। এজন্য শিক্ষকদের শ্রেণি কক্ষে অবশ্যই প্রমিত ভাষায় কথা বলতে হবে।
আমাদের সন্তানদের অবশ্যই প্রমিত উচ্চারণ শিখাতে হবে। পাশাপাশি তাদের প্রমিত বানানরীতি অনুযায়ী লেখা শেখাতে হবে। সরকারি অফিস আদালত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রমিত ভাষা এবং বানানের ব্যবহার করা হয়। আজকের শিশুরা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কর্ণধার। তাই তাদেরকে প্রমিত উচ্চারণ রপ্ত করতে হবে।
প্রমিত ভাষার সাহিত্য মূল্যও কম নয়। আধুনিক সাহিত্য দুর্বোধ্যতার কঠিন খোলস বেরিয়ে জনমানুষের কাছে চলে গেছে। প্রতিদিনকার সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না নিয়ে রচিত আধুনিক সাহিত্য সমাজের সবার জন্য রচিত। আর এজন্য বেশিরভাগ আধুনিক সাহিত্যিক তাঁদের সাহিত্যে প্রমিত ভাষার প্রয়োগ করে থাকেন। এমনকি কবিতার মাঝেও চলে আসছে গদ্যধর্মীতা যা সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত মুখ নিঃসৃত বাণী।
সর্বোপরি প্রমিত বাংলা ভাষা সব জেলার মানুষের জন্য একটি “ইউনিফাইড” (Unified) ভাষা হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিমূল সুসংহিত করে। এ ভাষা দূরত্ব দূর করে বাঙালি সবাইকে একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়তে উজ্জীবিত করে। সুতরাং আমাদের শিশুদের প্রমিত ভাষায় পাঠদান এবং প্রমিত ভাষা শিখানো অপরিহার্য।
শিশুদের প্রমিত ভাষা শিক্ষাদানে শিক্ষক এবং অভিভাবকদের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে অবশ্যই প্রমিত ভাষায় কথা বলতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শ্রেণিকক্ষে অথবা শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজেদের মধ্যে প্রমিত ভাষার ব্যবহার করবে। শুদ্ধ ভাষার উপর সম্মানিত শিক্ষকগণ প্রতি সপ্তাহে বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করতে পারেন। শুদ্ধ বানান শেখানোর জন্য ক্লাসের পাশাপাশি তাদেরকে অভিধান ব্যবহার শেখাতে হবে এবং অভিধান ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বিষয়টি সার্বিক তত্ত্বাবধান করবেন বলে আমি আশা করি। শুদ্ধভাবে বাংলা বলা এবং লেখা শেখানোর জন্য মাঝে মাঝে বিভিন্ন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।
সুনামগঞ্জে কর্মরত সকল অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং সহকারি কমিশনারকে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেয়া আছে। আমি অনুরোধ করব তারা এসব বিদ্যালয় পরিদর্শনের পাশাপাশি শুদ্ধ বলা এবং লেখার উপর ক্লাস নিবেন।
আজকের শিশুরা আগামীর পৃথিবীর নির্মাতা। আগামীর পৃথিবী নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং। প্রবল প্রতিযোগিতামূলক এ পৃথিবীতে শুধু যোগ্যরাই নেতৃত্ব দিবে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সে পৃথিবীর জন্য এখনই তৈরি করতে হবে। তার জন্য সবার আগে দরকার ভাষাগত দক্ষতা। তাদের সে ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে সম্ভাব্য সবকিছু করতে হবে। তাদেরকে শুদ্ধ বাংলা বলা এবং লেখা শেখানোর জন্য একটি আন্দোলনের সূচনা করতে হবে। সে আন্দোলনে আমাদের সবাইকে শরীক করতে হবে। আর নতুন প্রজন্মের কাছে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
(শেখ রফিকুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ)
[অনুলিখন : মনিরুল হাসান]

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com