1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
সোমবার, ১০ মে ২০২১, ০১:১৩ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01867-379991, 01716-288845

প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর তিনাপ সাইতারের খুঁজে

  • আপডেট সময় শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৬

বাবরুল হাসান বাবলু ::
হালের ক্রেজ তিনাপ সাইতারের প্রথম ছবিটি দেখি গত জুন মাসে ট্রাভেলার সুলতানা জেসমিন সুমির ফেসবুক পোস্টে। (বম ভাষায় সাইতার অর্থ ঝর্ণা)। পরবর্তীতে রুমা উপজেলার ট্যুরিস্ট গাইড আলমগীরের পোস্টে তিনাপ সাইতের একটি ভিডিও দেখে নেশা চাপে তিনাপ সাইতার মিশনের। বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার রনিনপাড়া হয়ে প্রায় ৪৬ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছতে হবে তিনাপ সাইতার। এ রকম ট্রেকিং কিংবা ট্রেইল কতটা কষ্টের তা তারাই জানে যারা এ পথে পা বাড়ায়। এ চিন্তা মাথায় রেখেই কান্ট্রি ট্যুরিজমের এডমিন রাসেল ভূইয়াকে জোর তাগদা তিনাপ সাইতারের ট্যুর প্ল্যান করা। যথারীতি ২২ আগস্ট ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে তিনাপ মিশনের লক্ষ্যে ঢাকার পথে পা বাড়ানোর সময় টেক্সট মেসেজ ‘তিনাপ মিশন বাতিল’। সেনাবাহিনীর অনুমতি নাই। মাথা নষ্ট হয়ে যাওয়ার মত সংবাদ। আর বুঝি যাওয়া হবে না প্রাকৃতিক অপরূপ নৈস্বর্গিক ‘ভয়ঙ্কর’ সুন্দর তিনাপ সাইতার। অনেক দিন মন থেকেই মানতে পারছিলাম না। বিভিন্নভাবে চেষ্টা অব্যাহত ছিল অনুমতি নেয়ায়। এরই মধ্যে সংবাদ পাই রুমা বাজার হয়ে সহজ রাস্তায় তিনাপ যাওয়া যায়। এক পর্যায়ে অনেকটা অনানুষ্ঠানিকভাবে ২২ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক অনুমতি পাওয়ায় কাউকে না জানিয়ে চুপিচুপি ঢাকা থেকে হানিফ পরিবহনে বান্দরবান যাওয়ার লক্ষ্যে উঠে পড়ি কান্ট্রি ট্যুরিজমের ১৫ সদস্য। খুব ভোরে পৌঁছে যাই বান্দরবান শহরে। রাতের বৃষ্টির গন্ধ এখনো পাহাড়ের গায়ে লেগে আছে। দূরের পাহাড়ে মেঘ জমে আছে। বাস থেকে বান্দরবান শহরে নেমে সকালে নাস্তা না করে রাসেলের চান্দের গাড়িতে উঠে যাই রুমা বাজারের অভিমুখে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমাদের গাড়ি চিম্বুক পাহাড়ে পৌঁছায়। সেখান থেকে খানিকটা দূর এগুনোর পর মনে হচ্ছিল এখানেই বুঝি পথ শেষ। তিনাপ মনে হয় যাওয়া হবে না। রাতের বৃষ্ঠিতে পাহাড় ধ্বসে মাটি ও পাথর পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ১৫ সদস্যের ভ্রমণপিপাসু দলটি অনেকটা হতভম্ব হয়ে পড়ে। গাড়ি চালক সহ আমরা কয়েকজন পাথর ও মাটি সরানোর কাজ শুরু করে দেই। ৫-৬ জনের একটি দল ১৫ মিনিট কাজ করার পর মনে হল হয়তো যেতে পারবো। দক্ষ গাড়ি চালক রাসেল অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে বিচ্ছিন্ন পথ পাড়ি দেয়। আমরা সবাই আবারো গাড়িতে উঠে পড়ি। সকাল ১১ নাগাদ আমাদের গাড়ি রুমা বাজার পৌঁছায়। আমরা প্রথমে রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্পে যাই অনুমতি নেয়ার জন্য। আগে থেকে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ থাকায় তেমন অসুবিধায় পড়তে হয়নি। রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নেয়ার পর রুমা বাজারে সকালের নাস্তাটা সেরে আবারো উঠে পড়ি চান্দের গাড়িতে মুন্নামপাড়া অভিমুখে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ কখনো মনে হয়েছে ঠিক মাথার উপর উঠে গেছে, কখনো মনে হয়েছে গভীর খাদে কিংবা খাদের কিনারায় পড়ে যাচ্ছে গাড়ি। প্রতিটি মূহূর্ত চরম আতঙ্ক এবং চরম শিহরণ হচ্ছিল মনে। রাস্তা খারাপ থাকায় কখনো গাড়ি থেকে নেমে পড়ছি কখনো দৌড়ে দৌড়ে গাড়িতে বাদুর ঝোলার মত ঝুলছি। প্রায় দু’ঘণ্টা দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে দুপুর ২টায় আমাদের গাড়ি পৌঁছে মুন্নামপাড়া আর্মি ক্যাম্পে। গাড়ি থেকে নেমে সবাই ক্যাম্পে যাই এবং সেখানে সবাই নাম লিখিয়ে সই স্বাক্ষর করে দ্বিতীয় অনুমতি নেই এ পাড়ায় অবস্থানের কিংবা সাইতার মিশনের। মুন্নামপাড়া কাছাকাছি হওয়ায় আমরা ক’জন গাড়িতে না উঠে হেঁটে হেঁটেই যাই প্রকৃতিকন্যার রূপ দেখতে দেখতে মুন্মাম পাড়ায়। দু’এক মিনিট হাঁটার পর মুন্নামপাড়া পৌঁছি। এ পাড়াটা অনেকটা সুন্দর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আমরা প্রথমে গিয়ে পাতাং বম এর একটি কটেজে উঠি। দুপুর পেরিয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে। দুপুরের খাবারের কোন ব্যবস্থা নাই। কোন রকম ব্যাগ গুছিয়ে দুপুরের খাবার না খেয়ে বিকেলে ৪টার মধ্যে পাইন্দু খালের ঝিরি পথ ধরে কান্ট্রি ট্যুরিজমের ১৫ সদস্যের মিশন খাইলেংতালি ঝর্ণা। সাথে স্থানীয় গাইড জয় বম ও রুমা বান্দরবান গাইড আলমগীর। মুন্নামপাড়া থেকে পাহাড়ি ঢালু পথ নেমে ১৫ মিনিটের মধ্যে নেমে পড়ি পাইন্দু খালের ঝিরি পথে। ছোট বড় ঝিরির শব্দ শুনতে শুনতে এক সময় পৌঁছে যাই খাইলেংতালি ঝর্ণায়। সেখানে গিয়ে ঝর্ণায় জলে অবগাহন করতে করতে সন্ধ্যা নেমে আসে। ফিরতি পথে পাথরে পা পিছলে আমি, গাইড আলমগীর ও ট্রাভেলার মাইনুদ্দিন অপু পানিতে পড়ে যাই। অপু পায়ে ব্যথা পায় এবং পা থেকে অনেক রক্ত ঝরে। এ রকম একটি ট্রেকিংয়ে দলের কোন সদস্যের অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা বিচলিত করে অন্য ট্রেকারদের। অন্ধকার হওয়ার কিছুটা পূর্বেই ফিরে আসি মুন্নাম পাড়ায়। ভেজা কাপড় ছেড়ে পেটের ক্ষুধায় স্থানীয় দোকানে চা বিস্কিট খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা। রাত ১১টা নাগাদ রাতের খাবার। পাহাড়ি মরিচের অতিরিক্ত ঝাঁঝের কারণে অনেকে না খেয়ে শুধুমাত্র সাইতার তিনাপের আশায় রাত পোহায়। সকাল ৭টায় একে অপরকে ডেকে তোলে তিনাপ সাইতের মিশনে বেরিয়ে পড়ি। আবারো মুন্নামপাড়া আর্মি ক্যাম্প। তারপর থেকেই আমাদের মূলযাত্রা শুরু- মিশন তিনাপ। স্থানীয় গাইড জয় বমকে সঙ্গে নিয়ে ঝিরিপথ ধরে হাঁটা শুরু। কখনো পথ অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে, কখনো পথ বনের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে, কখনো মনে হচ্ছে এ বুঝি গভীর খাদের কিনারায় পড়ে গেলাম। ১৫ জনের এ দলে আমরা দু’তিন জন অনেকটা আগে আগে হাঁটছিলাম, মাঝামাঝি ছিল কয়েকজন এবং অনেকটা পেছনে ছিল আরো কয়েকজন। পথের মধ্যে একাধিক পথ থাকায় আমি ও এক ছোট ভাই সাজ্জাদ পথে পথে সঠিক পথচিহ্ন আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক হাঁটার পর দেখা পাই পাইন্দু খালের, খালের ওপারে একটি বড় পথ থাকায় আমাদের আরেক ভ্রমণপিপাসু আতাহার হোসেন মামুন খালের ওপারে গিয়ে বসে থাকেন। জয় বম উনাকে ডেকে নিয়ে আসে। এ পথে পাইন্দু নয়। আবারো আমরা খালের মধ্য দিয়ে হাঁটতে শুরু করি। ৫ মিনিট হাঁটার পর পাইন্দু খালে দেখা পাই অনিন্দ্য সুন্দর এক ঝিরির। পুরোটা খালে সমানভাবে পাথর বিছানো এর মধ্যে দু’জায়গা দিয়ে প্রবহমান জল দ্রুতবেগে নিচে নেমে যাচ্ছে তিনাপ সাইতারের দিকে। সেখানে ক্লান্তিতে পাথরের উপরে আমরা ক’জন শুয়ে পড়ি। স্থানীয় গাইড জানায় খালের বাঁকেই পাইন্দু সাইতার। তর সইছিল না কখন দেখা পাব সাইতারের। কিন্তু পিছনে পরে থাকা ট্রাভেলারদের জন্য অপেক্ষা সেই সাথে তিনাপ সাইতারের ডাক কোন দিকে যাই। জয় বমকে পাঠালাম পিছনে পরে থাকা মিশনের অন্য সদস্যদের নিয়ে আসার জন্য। এরই ফাঁকে আমি ও কয়েক জন আবার পথ হাঁটি। ৪০ ফিট পাহাড় উঠার পর ঠিক সেই জায়গা থেকে সোজা আবারো ৪০ ফিট নিচে নেমে গেছে পথ। খাড়া পথ নামতে গিয়ে তেমন অসুবিধা হল না। আগে থেকেই ভ্রমণ পপাসু ভাই বন্ধু বাঁশ-চিকন বেঁধে রেখেছিলেন এ পথে। মনের জোরই যথেষ্ট ছিল। খাড়াপথ বেয়ে নিচে নামার সাথে সাথেই এক অপূর্ব সুন্দর চোখের সামনে ভেসে উঠলো! কোন দিক তাকানোর সুযোগই পেলাম না পিছনে কারা এলো কিংবা কারা এলোনা তা খেয়াল হওয়ার আগেই ঝর্ণার পানিতে ভিজে গেল ক্লান্ত শরীর। এরপর একে একে ১৫ জনের ভ্রমণপিপাসু দলটি এল। দু’ঘণ্টার মত বেশি সময় তিনাপের জলে হৈ হুল্লুর হল। প্রবল বেগে প্রায় ৪০ ফুট উঁচু থেকে বড় বড় পাথরে আচড়ে পড়ছে পানি এ প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর যা নিজ চোখে না দেখলে বুঝানোর কিছু নেই। থেকে যেতে ইচ্ছে করছিল প্রকৃতির কাছাকছি। এক সময় বৃষ্টি নেমে এল। পাইন্দু খালে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেল। ঝিরি পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পায়ে মধ্যে দু-একটি জোঁক ধরলো। পাইন্দুখাল, তিনাপ সাইতার পিছনে পড়ে রইলো। ভ্রমণপিপাসু সাদেকুর ভাই টেবিল পাহাড়, জাহাজ পাহাড় চেনালো। টেবিল পাহাড়, জাহাজ পাহাড়ে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি এল।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান, সেখান থেকে রুমা বাজার, রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি, তারপর চান্দের গাড়িতে মুন্নাম পাড়া, সেখান থেকে দু’ঘণ্টা পাহাড়ি পথ পায়ে হাঁটলেই তিনাপ সাইতার।
[বাবরুল হাসান বাবলু, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ]

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com