1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ০৭:৫৪ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষণে নীতিমালা হচ্ছে : দাতা না পাওয়ায় জলবায়ু তহবিলের টাকায় সংরক্ষণের উদ্যোগ

  • আপডেট সময় শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৬

শামস শামীম ::
প্রায় ১৩ বছরের ব্যবস্থাপনায় সিকিভাগও সুফল মিলেনি। উল্লেখিত সময়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার নামে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদ বিনাশ হয়েছেন। এসব কারণে আন্তর্জাতিক রামসার সাইট খ্যাত এই অনন্য জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘টাঙ্গুয়ার হাওর বিধিমালা’ প্রণয়নের কাজ করছে বলে জানা গেছে। টাঙ্গুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত আইইউসিএন গত মে মাসে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত ওই বিধিমালা প্রেরণ করেছে। বিধিমালা অনুমোদন হলে এ হাওরের জন্য আলাদা দফতর প্রতিষ্ঠা করে সুনামগঞ্জ থেকেই নতুন আঙ্গিকে হাওর ব্যবস্থাপনা করা হবে। তবে নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংগঠন আইইউসিএন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে জলবায়ু তহবিলের টাকায় খন্ডকালীন ও সীমিত আকারে ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যাবে। দাতা না পাওয়ায় সরকার জলবায়ু তহবিলের টাকায় হাওর রক্ষার ১৬ মাসের একটি উদ্যোগ নিচ্ছে বলে ওই সূত্র জানিয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সাল থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর কো ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দাতা সংস্থা এসডিসি ৩ দফা হাওর ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন করে। গত ৩১ আগস্ট তৃতীয় দফা মেয়াদান্তে সুইস দাতা সংস্থা এসডিসি টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষণে আর অর্থায়ন করবেনা বলে জানিয়ে দেয়। ওই ব্যবস্থাপনা নানা ত্রুটি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রক্ষকরাই ভক্ষক সেজে টাঙ্গুয়ার হাওরকে সংকটাপন্ন করেছেন বলে সুধীজন ও স্থানীয়দের মত।
জানা গেছে, হাওর রক্ষণাবেক্ষণে এসডিসি অর্থায়ন করবেনা জানানোর পর সরকার বিপাকে পড়ে সরকার। ব্যবস্থাপনায় নতুন সংকট দেখা দেয়। সরকার বিভিন্ন সূত্রে দাতা খুঁজলেও না পেয়ে অবশেষে জলবায়ু তহবিলের টাকায় আইইউসিএনকে দিয়েই ১৬ মাসের একটি খন্ডকালীন ও সীমিত প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়। এই প্রকল্পটি শীঘ্রই অনুমোদন পাবে বলে জানা গেছে।
৯ হাজার ৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে জেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর। স্থানীয়ভাবে ছয়কুড়ি কান্দার নয়কুড়ি বিল খ্যাত হাওরে রয়েছে পাখ-পাখালি, মাছ, গাছসহ অসংখ্য স্থলজ-জলজ উদ্ভিদ। ১৯৯৯ সনে টাঙ্গুয়ার হাওর পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষিতের পর ২০০০ সনের ২০ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক রামাসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সরকার ৬০ বছরের ইজারাপ্রথা বিলোপ করে। হাওর এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি, সম্পদ সংরক্ষণ, টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জীব-বৈচিত্র্য পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে হাওরটি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ২০০৩ সাল থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
স্থানীয় জনগণ ও বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক এই জলাভূমিকে রক্ষা করতে ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, কঠোরতা ও দক্ষতার দাবি জানিয়েছেন। তারা পৃথক অধিদপ্তরের মাধ্যমে দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে সচেতন কর্মীদের মাধ্যমে হাওর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পরিচালনার আহ্বান জানান।
ব্যবস্থাপনার শুরু থেকেই প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংগঠন আইইউসিএন রামসার নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে বললেও তাদের কাজে স্বচ্ছতা, সততা ও নিষ্ঠার অভাব দেখা দেয়। গত ১৩ বছর ধরে ওই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাওরের জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে এনে সম্পদ ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অগ্রগতির কথা থাকলেও এই ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জেলার সুধীজন এই ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফোরামে, সরকারি সভায় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আনছে। ব্যবস্থাপনার নামে গত ১৩ বছর ধরে প্রায় শত কোটি টাকার অপচয় হয়েছে বলে তারা মনে করেন। পাশাপাশি রক্ষকরা ভক্ষককে রূপ নেওয়ায় হাওরের মাছ, গাছ, পাখি ও জীববৈচিত্র্যও কমছে বলে তাদের অভিমত।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত আনসার, পুলিশ, এলাকাভিত্তিক গঠিত সমিতির নেতা, এনজিও প্রতিনিধি ও বাস্তবায়ন কাজে নিয়োজিত সরকারি-বেসরকারি লোকদের লোভ ও দুর্নীতির কারণে অবাধে ঘোষিত অভয়াশ্রমে মাছ ধরে হাওরকে মাছশূন্য করা হয়েছে। বছর ব্যাপী অবাধে মাছ লুট ও শীতে পাখি বিক্রিতেও জড়িত ওই সিন্ডিকেট। ব্যবস্থাপনায় টাঙ্গুয়ার হাওরের জীব-বৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রতিবেশের অবস্থা এখন সংকটাপন্ন। সম্প্রতি এই হাওর পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় এর জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে নতুন সংকট দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, স্থায়ী সংরক্ষণের লক্ষ্যে হাওর-রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত আইইউসিএন গত মে মাসে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে এই নীতিমালা পাঠিয়ে দিয়েছে। এর আগে তারা হাওরের সীমানা নির্ধারণ করে। জীব-বৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ, ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সরকারি ও বেসরকারি লোকজন এবং স্থানীয় অভিজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এই নীতিমালা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। নীতিমালা প্রণয়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবেক সচিব নীককান্তি মজুমদারসহ সরকারের সচিব ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বিশিষ্টজন। এ নীতিমালায় সুনামগঞ্জে একটি আলাদা দফতর প্রতিষ্ঠা করে হাওর রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে। নীতিমালায় কারা, কিভাবে হাওর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করবে তা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এই নীতিমালাটিই হবে টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষণাবেক্ষণের গাইড লাইন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
টাঙ্গুয়ার হাওর কো ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের থিম্যাটিক কোঅর্ডিনেটর ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, গত ৩১ আগস্ট ব্যবস্থাপনার মেয়াদ শেষ হয়েছে। নীতিমালা প্রণয়নের আগ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হবে। মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলেও কাজের পরিধি আগের চেয়ে কমে যাবে বলে তিনি জানান। জলবায়ু তবহিলের টাকায় ওই ১৬ মাস হাওর সংরক্ষণ করা হবে।
প্রকল্পের আরেক থিম্যাটিক কো অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত মে মাসে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে করা ‘টাঙ্গুয়ার হাওর বিধিমালা’ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় শীঘ্রই বিধি চূড়ান্ত করবে। এই বিধি প্রণয়নে দেশের জীব-বৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞসহ সরকারের সচিব পর্যায়ের কয়েকজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন। বিধি পাস হলে এটি হবে হাওর সংরক্ষণের গাইডলাইন।
সুনামগঞ্জের জীব-বৈচিত্র্য গবেষক কল্লোল তালুকদার চপল বলেন, গত ১৩ বছর ব্যবস্থাপনার নামে লুটপাট হয়েছে। পাখি, মাছ, গাছ উজাড় হয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওর এখন নানা সংকটে। এই হাওর প্রমোদভ্রমণের জন্য উন্মুক্ত করায় সংকট আরো প্রকট হচ্ছে। প্রমোদভ্রমণের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও প্রতিবেশ সংক্রান্ত সচেতনতামূলক ব্যবস্থা না থাকায় হাওরের বিনাশ ডেকে আনা হচ্ছে। হাওর সংরক্ষণে বিজ্ঞানসম্মত, সুচিন্তিত ও আন্তরিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. লুৎফুর রহমান বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনা যে লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছিল সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বরং এই ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সরকার যেহেতু আন্তর্জাতিক রামসার সাইট হিসেবে রামসার কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে সেহেতু এই হাওরের জীববৈচিত্র্য আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে। ব্যবস্থাপনার মেয়াদ গত আগস্ট মাসে শেষ হলেও আরো ১৬ মাস সময় বৃদ্ধির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ বিষয়ে সরকার শীঘ্রই সিদ্ধান্ত নেবে।
সাবেক সাংসদ ও টাঙ্গুয়ার হাওর বিষয়ে অভিজ্ঞ নজির হোসেন বলেন, যে লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক জীব-বৈচিত্র্যের এই এলাকা সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সেই লক্ষ্যপূরণ হয়নি। বরং হাওরটি দিনদিন ব্যবস্থাপনার নামে বিরান হচ্ছে। তিনি বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের রূপবৈচিত্র্যের কাছে দেশের সবচেয়ে সুন্দর বলে খ্যাত বান্দরবনের পাহাড়ি সৌন্দর্য এবং মেঘালয়ের গিরিশৃঙ্গরাজির দিগন্ত বিস্তৃত মায়াবি রূপ হার মানে। যাদুকাটা নদী, লাউড়েরগড়, বড়গোপটিলা, টেকেরঘাট এলাকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর ইকোজোন করার দাবি জানান তিনি।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com