1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ০৫:০৭ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01867-379991, 01716-288845

একাত্তরের একটি অঙ্গীকারনামা

  • আপডেট সময় রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ইকবাল কাগজী :
তিনি এই সমাজে তেমন কোনও কেউকেটা কেউ নন। হতে পারতেন এই পৌরসভার জননন্দিত মেয়র, কোনও ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ কিংবা বিখ্যাত ক্যাডার অথবা বড় কোনও আমলাজাতীয় উচ্চপদাধিকারী, নিদেনপক্ষে একজন বিপুল বিত্তবৈভবের অধিকারী ধনবান। যাকে নিয়ে লিখে দিস্তার পর দিস্তা কাগজ নিঃশেষ করা যায়, প্রশংসার ফুলঝুরি ঝরাতে ঝরাতে রচনা করা যায় মহাকাব্য, অফুরন্ত বাকবিস্তারের মহসমুদ্র। তিনি তেমন কেউই নন, তাঁকে কীছুতেই কেউকেটা কেউ বলা যায় না। তিনি সাধারণ পৌর নাগরিক। বিদ্যাবুদ্ধিতেও তিনি সবার চেয়ে পিছিয়ে, ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়’ হবার প্রচেষ্টাও তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। তারপরেও স্বীয় মহিমায় তিনি সবার উপরে বিরাজ করেন, এই জন্য যে, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি মুক্তিযোদ্ধা বলে নিজেকে কতটা কী মনে করেন, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো আমরা সাধারণ মানুষেরা যারা তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা বলে জানি, তারা তাঁকে আসমান সমান মান্য করি, তাঁর জন্য গর্ববোধ করি। যাঁরা আমাদের মহান স্বাধীনতার নির্মাতা, তিনি জাতির সেইসব মহান সন্তানদের একজন। যিনি ৩০ লক্ষ শহীদের একজন হতে পারতেন। তাঁর নাম মালেক হুসেন পীর। জন্ম ১৯৫৪-র ৩১ ডিসেম্বর। সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার তেঘরিয়া গ্রামের বিখ্যাত পীর বাড়িতে। বাবা মছব্বির হোসেন পীর।
এই মছব্বির হোসেন পীর কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নন। তাঁর পূর্বসূরি পরিবারের ঐতিহাসিক ব্যক্তি নিশা শাহ্ পীরের উত্তরসূরি আলহাজ শের আলী পীর ও ডা. ইমদাদ আলী পীরের মতো তিনি বিখ্যাত নন। শের আলী পীর ‘নেশা বাঁশি’র মরমি কবি হিসেবে সুনামগঞ্জের লোকসাহিত্যের আকাশে এক অম্লান উজ্জ্বল নক্ষত্র। ডা. ইমদাদ আলী পীরের রচিত কিতাব “মুর্ছিআখানি” গানের পান্ডুলিপি ডক্টর মোহাম্মদ সাদিকের কাছে সংগৃহিত আছে। তাঁর ‘সিলেটি নাগরী : ফকিরি ধারার ফসল’ গ্রন্থে উক্ত পান্ডুলিপির তিনি উল্লেখ করেছেন। কবি ও চিকিৎসক হিসেবে ইমদাদ আলীও অবশ্যই বিখ্যাত। মছব্বির হোসেন পীরের সেরকম কোনও কবিত্বপূর্ণ অবদান নেই। কিন্তু তিনি বিখ্যাত হয়ে থাকবেন এই জন্য যে, ১৯৭১-য়ে তিনি তাঁর পরম স্নেহের প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানি প্রশাসনের সন্নিকটে রীতিমত লিখিত অঙ্গীকারপত্র পেশ করে একরকম ‘ত্যাজ্যপুত্র’ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি অঙ্গীকারপত্রে লিখে দিয়েছিলেন, ‘ও ংড়ষবসহষু ফবহড়ঁহপব ধষষ পড়হহবপঃরড়হ রিঃয যরস.’ (আমি পবিত্রচিত্তে তার সঙ্গে সকল সম্পর্ককে প্রকাশ্যে দোষারোপ বা অভিযুক্ত করছি)। এই ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭১-য়ের ২৫ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ২ মাস ২১ দিন আগে। সেদিন পিতা কর্তৃক যে পুত্রটি দালিলিকভাবে অস্বীকৃত হয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন, তিনি ছিলেন মছব্বির হোসেন পীরের মুক্তিযোদ্ধা পুত্র মালেক হুসেন পীর।
আমরা জানি, একাত্তরের ২৭ মার্চ সুনামগঞ্জে পাকহানাদার বাহিনী প্রবেশ করে এবং ২৯ মার্চ সুনামগঞ্জ হানাদারমুক্ত হয়। ১০ মে সুনামগঞ্জ আবার পাকসেনাদের অধিকৃত হয়ে পড়ে। তারপর স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৭ মাস ৬ দিন দেশের ভেতরে, তথা সুনামগঞ্জ শহর ও শহরের আশপাশের গ্রামান্তরে যেসব লোকসাধারণ ছিলেন তাঁদের উপর অকথ্য, অমানবিক নির্যাতন চলে। বিভিন্ন লেখকের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বর্ণনা পড়লে হৃদয়ঙ্গম হয় যে, সমগ্র দেশটাকে পাকসেনা ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার – আলবদর – দালালেরা একটি ৫৫ হাজার বর্গমাইলজুড়া বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিল। দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী প্রতিটি মানুষ তখন ছিলেন মৃতুভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত ও বলতে গেলে নির্জীব প্রাণী। যে পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা ভারত যেতে পারেননি, ক্ষেত্র বিশেষে সে পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যকেই পাকপ্রশাসনের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে বা নির্যাতিত হয়ে কোনও না কোনও প্রকার অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।
মছব্বির হোসেন পীরকে তাঁর কিশোরপুত্র (মালেক হুসেন পীরের বয়স তখন ১৬ বছরের মতো) বাড়িতে নেই কেন, সে কোথায় গেছে, পাকপ্রশাসনের কাছে এই প্রকারের নানাবিধ প্রশ্নের সদুত্তর প্রদানের বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। ’৭১-য়ের যুদ্ধকালে পরিবারের মধ্যে উঠতি বয়সের কিশোর বা যুবক থাকলে তাকে রাজাকার হতেই হতো, কিন্তু তখন সে অনুপস্থিত থাকলে প্রশাসন স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছে যে ‘মুক্তি হ গিয়া’, অর্থাৎ সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। এর একমাত্র পরিণতি ছিলো পরিবারটির উপর পাকপ্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গতি নাজিল হওয়া এবং সে দুর্গতির শেষ পরিণতি মৃত্যু পর্যন্ত প্রলম্বিত হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ভাগ্য ভালো যে মছব্বির হোসেন পীরের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি।
মালেক হুসেন পীর ও আবু সুফিয়ান দুই বন্ধু, হরিহর আত্মা। ২৭ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে সুনামগঞ্জে সংগঠিত প্রতিটি সংগ্রাম-আন্দোলন-ঘটনার সঙ্গে এই দুই কিশোর ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন। দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী, আব্দুর জহুর, আব্দুর রইছ, হুসেন বখ্ত, আলফাত উদ্দিন মোক্তার, আছদ্দর আলী মুক্তার, নজির হোসেন প্রমুখ নেতাদের নির্দেশানুসারে তখন মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত যেসব কাজ হয়েছে, তার কোনও না কোনটিতে এই দুই কিশোরের সম্পৃক্ততা ছিলো, কোনও না কোনওভাবে।
১০ এপ্রিল সুনামগঞ্জ পাকসেনাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর, এই দুই কিশোর সিদ্ধান্ত নেন, ভারত চলে যাবেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নেমে যুদ্ধ করে পাকহানাদারদের তাড়াতে হবে, দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। পরামর্শ মতো তাঁরা মিলিত হন আবু সুফিয়ানের গ্রামের বাড়ি জগাইরগাঁওয়ে। বাড়ির লোকজনের অজান্তে, এখান থেকেই ২০ এপ্রিল সকালে তারা রওয়ানা হন, সীমান্তবর্তী ভারতের বালাটের উদ্দেশ্যে। মালেক পীর তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে তখন শহরের বাড়ির আশ্রয় ছেড়ে তাঁর মামার বাড়ি গৌরারং হোসেনপুর সাহেব বাড়িতে থাকতেন। সে-সময়ে তাঁর মামার বাড়ি, তেঘরিয়ার পীর বাড়ির লোকেরাসহ, তাঁদের আত্মীয়-স্বজনদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের ভাগ্না মালেক হুসেন পীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে তাঁরা তৎকালে স্থানীয় দালাল-রাজাকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অত্যাচারের শিকার হয়েছিলন।
মালেক হুসেন পীর ও আবু সুফিয়ান এই দুই বন্ধু সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময়ের প্রতিটি কাজে, যুদ্ধযাত্রায় যেমন একসঙ্গে ছিলেন, তেমনি তাঁরা দুই বন্ধু অতি সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের সুদীর্ঘ সাড়ে চার দশক সময় পেরিয়ে যাবার পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনুসন্ধানের কাজে একসঙ্গে নেমেছেন। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় এক সঙ্গে ছিলেন এবং সাড়ে চার দশক পরে এখনও আছেন যথারীতি বরাবরের মতো দেশের কাজেই।
মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাস অনুসন্ধান করে বের করার মহৎ কাজে এই দুই বন্ধু সুনামগঞ্জের ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সে কথা যেমন সত্য, তেমনি আর একটি সত্য এই যে, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের কোনওরূপ কর্মকান্ডে যুক্ত ছিলেন না, তথাপি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে নিজের নাম যুক্ত করে ইতিহাস বিকৃতির ষড়যন্ত্রে যুক্ত আছেন বা থাকবেন তাঁদেরকে মনে রাখতে হবে যে, এই দুই মুক্তিযোদ্ধা এখনও সত্যোৎঘাটনের জন্য জীবিত আছেন।
মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার ক্ষেত্রে তাঁদের দু’জনের মিল যেমন আছে, তেমনি আরও একটি বিষয়ে তাঁদের দু’জনের মধ্যে মিল পরিলক্ষিত হয়। আর সেটি হলো তাঁরা দু’জনই একাত্তরে যুদ্ধকালে তাঁদের পিতৃদেব কর্তৃক দালিলিকভাবে অস্বীকৃত হয়েছিলেন, অর্থাৎ যুদ্ধকালে পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের চাপে পড়ে তাঁদের পিতারা তাঁদেরকে সাধারণ অর্থে ‘ত্যাজ্য’ করেছিলেন। সুফিয়ানকে ত্যাজ্য করা সংক্রান্ত হলফনামাটি পাওয়া যায়নি। কিন্তু মালেক হুসেন পীরকে ত্যাজ্য করার হলফনামাটি পাওয়া গেছে। সেটি মুক্তিযোদ্ধা খসরু ভাই’র (অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী) পরামর্শে মালেক হুসেন পীর ২০০৮-য়ের ২৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে নিদর্শনস্বরূপ অর্পণ করেছেন। হলফনামাটি মূলত লিখা হয়েছিলো ইংরেজিতে। এর বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘আমি মছব্বির হোসেন পীর, পিতা মৃত মোঃ ইমদাদ আলী সাং তেঘরিয়া, থানা: সুনামগঞ্জ, জেলা: সিলেট, পূর্বপাকিস্তান, বয়স ৪৫ বৎসর এতদ্বারা শপথ গ্রহণ পূর্বক নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করিতেছি যে, আমার পুত্র মালেক হুসেন পীর, বয়স ১৫ বৎসর, সুনামগঞ্জ গভ. জুবিলী হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র প্রায়শই তাহার পাঠে অমনোযোগী ও অনিয়মিত থাকে, যে কারণে তাহাকে যখন তখন বকাবকি করি, ফলে ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ ইং তারিখে সে গৃহত্যাগ করে চলে যায়।
সেই সময় হইতে বর্তমান সময় পর্যন্ত তার কোন ঠিকানা পাওয়া যায় নাই। সে জীবিত কি মৃত আমি জানি না। আমি আনুষ্ঠানিকভাবে তাহার সহিত সকল সম্পর্ক ছিন্ন করিলাম।
উপরে বর্ণিত তথ্য আমার জ্ঞান ও বিশ্বাস মতে সত্য।
তারিখ: ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ ইং মছব্বির হোসেন পীর
ঘোষণাকারী’
এখানে উল্লেখ্য যে, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদটি আমি (লেখক) করিনি। স্বয়ং মালেক হুসেন পীর জনৈক ব্যক্তির মাধ্যমে করিয়ে এনেছেন। সেই অনুবাদকের প্রতি রইল অশেষ কৃতজ্ঞতা।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com