1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ০২:১০ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

পাথর কুড়িয়ে শৈশব কাটে সুজনদের

  • আপডেট সময় সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

আমিনুল ইসলাম ::
সকাল হলেই বই-খাতা নিয়ে স্কুলে ছুটতে হবে। এজন্য রাতেই বইগুলো গুছিয়ে নেয়া হতো। স্কুলের ড্রেসটা পরিচ্ছন্ন রাখা ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। আরও একটি কঠিন কাজ স্কুলে কলম নিয়ে উপস্থিত হওয়া। অধিকাংশ দিনেই কলম আনার কথা মনে থাকতো না। এজন্য বকা শুনতে হতো। অনেকেই ব্যাগ নিয়ে স্কুলে আসতো। আর বাকিরা বই-খাতা আনতো হাতে করেই। স্কুলে যাওয়ার চেয়ে পথের পাশের মাঠে ফুটবল নিয়ে দৌড়ঝাপ করাটা অনেক মজা লাগতো। কিন্তু এখন স্কুল আর খেলা কোনোটাই ভালো লাগে না সুজনদের। তারা এখন শৈশবেই দক্ষ শ্রমিক।
এক সময়ের স্কুলছাত্র ও বর্তমানের পাথর শ্রমিক সুজনের বয়স এখন ১০ বছর। রোজ সূর্য উঠার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেও জেগে ওঠে। বাঁশের তৈরি একটি পুরোনো টুকরি মাথায় করে শুরু হয় দিন।
ওজনটা একটু বেশি হলেও দিনশেষে টাকা পাওয়া যাবে ভেবেই হাড়ভাঙা পরিশ্রমকেও কিছুই মনে করে না সুজন। তবে রাতে পুরো শরীররটা ব্যথা করে।
অভাবের সংসারে অল্প বয়সেই সে হাল ধরেছে। উপার্জনটাই এখন তার কাছে সব। তবে সমবয়সীরা যখন স্কুলে যায় তখন স্কুলটার কথাও মনে পড়ে তার। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পাথর কোয়ারি এলাকায় সে এখন একজন শিশু শ্রমিক। দিনশেষে দুইশ টাকা পাওয়ার ইচ্ছেটাই তার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কারণ। আর্থিক অসচ্ছলতা তাকে এবং তার মতো বাকি শিশুদেরও পাথর শ্রমিকের ভূমিকায় এনেছে।
তাহিরপুর উপজেলার টেকেরঘাট, বড়ছড়া, ডলুরা ও বাগলি সীমান্তে সুজনের মতো আরও প্রায় দুই হাজার শিশুর শৈশব এভাবেই পাথর কুড়িয়ে কাটছে। একসময় তাদের অনেকেই ছিল স্কুলের ছাত্র। সকালে বইখাতা নিয়ে স্কুলের পাঠগ্রহণ আর বিকালটা ছিল খেলাধূলার। কিন্তু এখন তাদেরকে দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাথর সংগ্রহ ও বিক্রি করে টাকা উপার্জন করতে হয়।
এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তাদের অনেকেরই। তাদের দিনগুলো আতঙ্কে কাটে। অনেকে সীমান্ত ঘেঁষে পাথর সংগ্রহ করে। সীমান্তরক্ষীরা প্রায়ই তাদের দিকে তেড়ে আসেন। বকা দেন। এসময় ছুটে পালায় ওরা। নিজের নামটা প্রকাশ করতে গিয়ে আসল নামটা লুকিয়ে নিজেকে ‘সুজন’ বলে পরিচয় দেয় এক শিশু। তার সঙ্গেই আলাপচারিতায় জানা যায় সীমান্তের শিশুদের শ্রমমুখর শৈশবের কথা।
সুজন জানায়, প্রতিদিন ২০০ টাকা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পাথর কুড়ায় শিশুরা। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তারা পাথর সংগ্রহ করে। তবে দুপুরে খাওয়ার মতো সময় বের করে তারা। অনেকেই বাড়ি থেকে প্লাস্টিকের পাত্রে করে ভাত নিয়ে আসে। সঙ্গে ভাজি, ভর্তা আর শাক। মাঝেমধ্যে ছোটমাছ দিয়ে ভাত আনে কেউ কেউ। অনেকে আবার সকালে স্কুলে যায় আর দুপুরে পাথর কুড়াতে আসে।
সেলিম নামের আরও এক শিশুর সঙ্গে কথা হয়। সে দুপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠগ্রহণ শেষে বাসায় গিয়ে খাবার খেয়ে তিনটায় পাথর কুড়াতে আসে। মাথার উপরে গামছা পেঁচিয়ে তার উপর পাথর ভর্তি টুকরি নেয় সে। তাতে ব্যথা একটু কম লাগে বলে জানায় সেলিম।
সুজনের কাছে লেখাপড়া আর পাথর কুড়ানো নিয়ে জানতে চাইলে সে বলে, একসময় সে ভালো ছাত্র ছিল, ক্লাসে তার রোল নম্বর ছিল ৭। বাবা ছিলেন দিনমজুর। তিনিই পরিবারের ভরণপোষণের জন্য রোজগার করতেন। মা হাঁস পালতেন। ভালোই কাটতো দিনগুলো। কিন্তু পরিবারে তার ছোট আরও দুই বোন আছে। দুই বছর আগে বাবা ভারী কাজ করতে গিয়ে যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখন থেকেই অভাব দেখা দেয়। পরে ঋণের জাল ছিঁড়ে আর উঠতে পারেনি তারা।
সুজন বলে, ‘আমরার ঘরের মইধ্যে আব্বায় টেকা রুজি করতো, আমি ইশকুলে যাইতাম, কেলাসে ৭ নম্বর আছিলাম, আম্মায় হাঁসেরে লইয়া আর আমার দুই বইনেরে লইয়া থাকতো, আব্বায় কিস্তি লইয়া কি জানি একটা করছিলো, পরে আব্বায় মাল টানতে গিয়া কোমরে ধরাইছে, আর কাম করতে পারে না। মাইনষের কিস্তিও আর দিতে পারছে না। হের লাগি তো কাম করা লাগে, আমার মামার সাথে আইছলাম, বাক্কাদিন আগে, আমার লগের বন্ধুরা তো ইশকুলে যায়ই, ইশকুলে যাইতে ইচ্ছা তো করেই, টেকা নাই যে, কেমনে যাই।’
সেলিম জানায়, তারা চার বন্ধু মিলে প্রতিদিন পাথর কুড়াতে আসে, একজনের টুকরি অন্যজন মাথায় তুলে দেয়। যেখানে নদী থেকে বা মাটি খুঁড়ে পাথর তোলা হয় সেখান থেকে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে পাথর জমা করেন ব্যবসায়ীরা। তাদের কাজ ওই স্থান পর্যন্ত মাথায় করে পাথর পৌঁছে দেয়া। দিন শেষে চার বন্ধু টাকা নিয়ে বাসায় ফিরে। তবে প্রতিদিন কিছু টাকা তারা নিজেদের জন্য রেখে দেয়। সে টাকা নিয়ে বাজারে খাবার কিনে খায় তারা।
স্কুলের নামটা তারা লুকিয়ে রাখে। লুকাতে চায় নিজেদের পরিচয়ও।
সেলিম বলে, ‘আমি একলা আই না, আমার সাথে আমার আরো তিন বন্ধু পাথ্যর তুলতে আয়। বিকালে বাড়িতে গিয়া টেকা দেলাই। কিছু টেকা আমরা রাইতে বাজারে গিয়া খাই। চারজনে কাম করলে খারাপ লাগে না, একজনের উরা (টুকরি) আরেকজনে তুইল্লা দেই, আমরা মাঝেমাঝে ইশকুলে যাই, কাম করতে কষ্ট হইলেও টেকা পাওয়া যায়।’
বড়ছড়া এলাকার এক বাসিন্দা শফিক মিয়া বলেন, ‘এই অল্প বয়সে বাচ্চারা যে কাজ করছে সেইটা মোটেও ভালো না, তারা তাদের জীবনটাই নষ্ট করে ফেলবে, এখন তারা লেখাপড়া আর খেলাধূলা করার কথা, আমাদের এলাকার অনেক শিশুরা এক সময় কয়লা কুড়াতো, তারা সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কাজ করে ২-৩শ টাকা পেত। এখন কয়লা তুলতে না পেরে তারা পাথর কুড়ায়। তাদের পরিশ্রম দেখলে নিজেরও খারাপ লাগে, স্কুলে না গিয়ে তারা মাথায় করে পাথর বোঝাই টুকরি নেয়, তাদের দিকে সরকারের দায়িত্বশীলদের দৃষ্টি দেয়া উচিত।’
এদিকে, সীমান্তপাড়ের এসব শিশুকে স্কুলমুখি করতে সরকারের নানা পদক্ষেপ রয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ। তাদের মতে যেসব শিশুরা এখন স্কুল আর লেখাপড়া ছেড়ে পাথর কুড়িয়ে টাকা উপার্জন করছে তাদের ভবিষ্যতটা ভালো হতে পারে না। তাই অভিভাবকদেরকে এখনই বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হযরত আলী বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকাসমূহে যেসব শিশু বিদ্যালয়ে না গিয়ে পাথর কুড়াচ্ছে তাদেরকে স্কুলের দিকে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। আমরা উপবৃত্তির সুবিধা চালু করেছি। পাশাপাশি শিশুরা যাতে স্কুলে ক্ষুধা পেলে কিছু খেতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। যেসব শিশু ঝরে পড়ছে তাদের জন্য বিদ্যালয়কে আরও আনন্দঘন করে গড়ে তোলা হবে। সে অনুযায়ী আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যারা এখন বিদ্যালয় ছেড়ে সামান্য কিছু টাকার জন্য পাথর কুড়াচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, তাই ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে শিশুদের অভিভাবকদেরকে এ বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে।’

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com