1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২, ০৮:৫৮ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

স্মৃতির জানালায় ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী : ঝিনুকে মুক্তা হলে চুপ হয়ে যায়, মুখ খোলে না

  • আপডেট সময় শনিবার, ২০ আগস্ট, ২০১৬

কমল খালিদ ::
ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী এখন নিঃশব্দের ঘরে। যোজন যোজন দূরত্বে। তাঁর শেখানো শব্দগুলির মশাল জ্বেলে আমরা আজ পথ দেখাচ্ছি ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের। কিন্তু মাঝে মাঝে খুব দৈন্য মনে হয় নিজের কাছে। এই দৈন্যতা শুধু আমার নয়, আজ অবধি ক্লাসরুমে শিক্ষকের চেয়ারটিতে বসতে দ্বিধা হয়। কারণ ঐ চেয়ারটিতে স্যার বসতেন, তাই ছোট একটি চেয়ার নিয়ে ঐ চেয়ারটির কাছ ঘেঁষে বসি। মনে হয়, স্যার আমার পাশে বসে আছেন। আমি নিবিষ্ট মনে বুকে সাহস নিয়ে পাঠ্যবিষয় শিক্ষার্থীদের সম্মুখে উপস্থাপন করি। স্যার যখন ছিলেন, তখন অনুপ্রেরণা ছিল কিছু বলবার, লিখবার, গাইবার। অন্তত নিজের সৃষ্টিকর্মকে যাচাই করবার জন্য স্যারের সান্নিধ্য নিতাম। শিখে নিতামÑ কোন শব্দ কিভাবে উচ্চারণ করলে গানের প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায়। মেলোডির প্রয়োগ কিভাবে হয়, গানের মাঝে কিভাবে শ্বাস গ্রহণ করতে হয়। প্রবন্ধে শব্দ চয়ন, বাক্য বিন্যাস প্রসঙ্গে তিনি খুঁটে খুঁটে দেখতেন। শিখিয়ে দিতেন বাক্যকে কিভাবে সমৃদ্ধ করতে হয়। সময়ে – অসময়ে তাঁর ঘরে কড়া নেড়েছি নিজেকে আলোকিত করার জন্য। শুধু আমি নই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলে।
ধৈর্য্য আর একাগ্রতার আধার ছিলেন ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী। যে কোন সমস্যার তাঁর কাছ থেকে একটা সমাধান মিলতো। স্যারের প্রাণপ্রিয় বন্ধু রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। সেদিন খুব নির্লিপ্ত মনে আমাকে বললেন- “জানো খালিদ, আমার একজন বন্ধু ছিল মৃদুল। রাত-বিরাতে ফোন করে অনেক বিষয় শেয়ার করতাম ওর সঙ্গে। ও (মৃদুল) খুব ভাল সমাধান দিতে পারত যে কোন সমস্যার। আজ মৃদুল নাই, স্বার্থহীন মানুষও খুব কম যাঁর কাছে প্রাণ খুলে কথা বলবো।”
ক’দিন আগে কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে বাংলাদেশ হাই কমিশনের আমন্ত্রণে গিয়ে দেখা হল সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম স্যারের সাথে। কুশল বিনিময়ের পর তিনি বললেন, “জানো খালিদ মৃদুলকে খুব মনে পড়ে। এক বিস্ময়কর ছেলে আমাদের সুনামগঞ্জের। কিন্তু ও আমাদের বিস্মিত করে চলে গেল। এই দেশ, এই মাটি, এই জাতি কতকিছু পেতে পারতো ওর কাছ থেকে।”
মৃদুল স্যার সম্পর্কে এরকম কথা প্রায় প্রতিদিনই কারো না কারো মুখে শুনতে পাই। বিস্মিত হই এই ভেবে যে, একজন প্রচারবিমুখ মানুষের বাস মানুষের হৃদয়ে। এখনো কোন সেমিনার বা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গেলে স্যারকে খুব মনে পড়ে।
বক্তব্যের এক নতুন ধারা স্যার তৈরি করে গেছেন। বক্তব্যের প্রসঙ্গকথার সঙ্গে যুক্ত হতো গান। পরিমিত কথায় বক্তব্য প্রদান, যা মনে হতো একটি শিল্পকে উপস্থাপন করার মতো। অন্যান্য বক্তার বক্তৃতায় মানুষ যখন বিরক্ত ঠিক তখন স্যার উঠতেন মঞ্চে। সুবচন, স্বল্পভাষে বিষয়কে শিল্পসম্মত উপস্থাপন করতেন, সঙ্গে বাড়তি পাওনা ছিল গান। বক্তব্যের মধ্যে উদার কণ্ঠে খালি গলায় বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক গান জুড়ে দিতেন। সঙ্গে সঙ্গে সরস হয়ে উঠতেন দর্শকবৃন্দ। বক্তৃতার জন্য স্যারের এক ভিন্ন জনপ্রিয়তা ছিল।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্যারের সঙ্গ পেয়েছি। স্যারের একটি প্রিয় গান- “আমার বন্ধু দয়াময়/তোমারে দেখিবার মনে লয়…”
সুরের একাগ্রতায় এক বিদগ্ধ পথিক ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী। আর দশজন শিল্পীর মত তিনি নন। তিনি ব্যতিক্রম তাঁর আপন আলোয়। পরিশীলিত জীবনযাপন, মৃদুভাষী, সংস্কৃতিবান, প্রজ্ঞাবান, নিষ্ঠাবান একজন মানুষ। কিন্তু একজন লোকজ শিল্পীর মতোই সরল।
“নয়ন সমুখে তুমি নাই
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই…”
স্যারের সঙ্গে আমরা কিছু সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখেছিলাম। এখনো সেই স্বপ্ন আছে। শুধু স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনার মানুষটি নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সেই সিঁড়ি, ক্লাসরুম, সেমিনার, কলাভবনের আঙিনা, চারুকলার সম্মুখস্থ পথ, শাহবাগ মোড়, আজিজ সুপার মার্কেট সবই আছে যে যার মত। শুধু নেই সেই বিদগ্ধ পথিক। যে গুনগুন করে গান করে পায়ে পায়ে সজীব করে রাখতো হাজারো শিক্ষার্থী, বন্ধু-স্বজনের মনোজগত।
[লেখক : শিক্ষক ও গবেষক]

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com