1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ০২:২২ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

সিরিজ বোমা হামলার ১১ বছর : তবুও আলোচনায় জেএমবি

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৬

সুনামকণ্ঠ ডেস্ক ::
১৭ আগস্ট, ২০০৫ সালের এ দিনে দেশের সাড়ে ৪শ’ স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের প্রচারণা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। শুধু মুন্সীগঞ্জ বাদে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়েছিল জঙ্গি সংগঠনটি। এ ঘটনার ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার চার্জশিটভুক্ত অর্ধশতাধিক জঙ্গিকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখনও রয়েছে তাদের অস্তিত্ব। কিছুদিন পর পরই জেএমবি সদস্যরা গ্রেফতার হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে।
১৯৮৮ সালে শায়খ আবদুর রহমান জেএমবি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পর ১৯৯৮ সালে জেএমবি দেশব্যাপী তাদের কার্যক্রম শুরু করে। তবে দলটির প্রকাশ্য তৎপরতা শুরু হয় ২০০৩ সালের প্রথমদিকে। পরে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা ও ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারককে হত্যার মধ্যদিয়ে সংগঠনটি আলোচনায় আসে।
জেএমবির শুরা কমিটির প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ আবদুর রহমান, অপারেশন কমান্ডার আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহসহ শীর্ষ ৬ জনের ফাঁসি ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ কার্যকর হওয়ার পর বেশ কয়েকদিন আত্মগোপনেই ছিল নিষিদ্ধ সংগঠনটির অন্য নেতা-কর্মীরা। কিন্তু ২০১৪ সালে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে ময়মনসিংহ আদালতে নেওয়ার পথে ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে ফাঁসি ও যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত জেএমবি সদস্য সালাউদ্দিন (সালেহীন), জাহিদুল ইসলাম (বোমারু মিজান) ও রাকিব হাসানকে (হাফেজ মাহমুদ) ছিনিয়ে নেয় জঙ্গিরা। এ সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় পুলিশ কনস্টেবল আতিকুল ইসলাম (৩০) নিহত হন। আহত হন আরও দুই পুলিশ সদস্য। ওই দিনই টাঙ্গাইলে ধরা পড়ে রাকিব হাসান। ওই রাতেই পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সে মারা যায়। পালিয়ে যাওয়া অন্য দুই জেএমবি নেতার অবস্থান স¤পর্কে এখনও নিশ্চিত না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক মো. লুৎফর রহমান জানিয়েছেন, ছিনতাই হওয়া জেএমবির দুই সদস্য কোথায় আছে তা তাদের জানা নেই। তবে ধারণা করা হচ্ছে তারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।
র‌্যাবের তথ্যানুযায়ী, ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশে মোট ১৬১টি মামলা হয়। সব মামলা তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে ৫৮টি মামলা এখনো বিচারাধীন। রায় ঘোষণা করা হয়েছে ১০৩ মামলার। এ ঘটনায় দায়ের করা মোট ১৬১টি মামলায় পুলিশের চার্জশিটে মোট ৬৬০ জঙ্গির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ৪৫৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জামিনে আছে ৩৫ জন। বাকিদের ১১ বছরেও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। গোয়েন্দারা বলছে, এদের অনেকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান জানান, জেএমবি সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর জন্য যেকোনো সংগঠনে যেতে পারে। দেশে উগ্রপন্থী সংগঠনের যে বিস্তার সেটি কিন্তু জেএমবির মাধ্যমে হয়েছিল। এরপর সরকারের কঠোর অবস্থান, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি এবং কারাগারে থাকায় তারা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু কার্যক্রম থামিয়ে রাখেনি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র মতে, সর্বশেষ গুলশানের হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ায় ঈদগাহে হামলা থেকে শুরু করে ইটালিয়ান প্রবাসী তাবেলা সিজার, জাপানের হোশে কুনিও, খ্রিস্টান ধর্ম যাজকের উপর হামলা, সেবাশ্রমের সেবক-কর্মচারী হত্যাকান্ড ইত্যাদি ঘটনায় জেএমবির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। বর্তমানে তামিম আহমেদ চৌধুরী নামে কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশী নতুনভাবে জেএমবিকে সংগঠিত করে এ ধরনের নাশকতামূলক কর্মকান্ড করছে এবং ১ জুলাই গুলশানে রেস্টুরেন্টে হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড তিনি। তবে গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় আরেক মাস্টারমাইন্ড মারজানকে শনাক্তের বিষয়টি গত শুক্রবার (১২ আগস্ট) জানায় পুলিশ। সোমবার (১৫ আগস্ট) রাতে ‘হ্যালো সিটি’ অ্যাপসের মাধ্যমে মারজানের পরিচয় ও ঠিকানা পায় পুলিশ। পাবনার হেমায়েতপুরে তার বাবা-মা মারজানের পরিচয় নিশ্চিত করে। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় নূরুল ইসলাম ওরফে মারজান। ক্যা¤পাসে তিনি ফাহাদ নামে পরিচিত ছিলেন। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় সিজিপিএ ৩.৪৮ পেয়ে তিনি দ্বিতীয়বর্ষে উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বর্ষের ছয়টি কোর্সের পরীক্ষা দিলেও বাকি পরীক্ষায় আর অংশ নেননি। তবে মারজান গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে স্ত্রীসহ নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি কার্যকর ও অধিকাংশ নেতা কারাগারে থাকায় নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবি সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জেএমবির অনেক সদস্যই এখন অন্য নামে কাজ চালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু জেএমবির কিছু নেতা-সদস্য অন্য নামে আসতে চাইলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে জেএমবি’র অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। জেএমবি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ও বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দিয়ে তাদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে চেষ্টা করছে বলেও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়।
চলতি বছরের ১১ আগস্ট রাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের একটি দল দারুস সালাম থানার মিরপুর টেকনিক্যাল মোড় এলাকা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি’র ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ২৫টি ডেটোনেটর ও ৮৭৫ গ্রাম জেল উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতাররা হলেন- আতিকুর রহমান ওরফে আইটি আতিক, মো. আব্দুল করিম বুলবুল ওরফে ডা. বুলবুল, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. মতিউর রহমান ও শাহিনুর রহমান হিমেল ওরফে তারেক।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটি) প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম জানান, জেএমবি দেশব্যাপী বোমা হামলা চালিয়ে তাদের শক্তির জানান দিয়েছিলো। পরে অনেকের বিচার হয়েছে, জেলে রয়েছে শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা। জেএমবি আগের মতো সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী নয় তবে জেএমবি ভেঙ্গে নব্য জেএমবি গঠিত হয়েছে। নব্য জেএমবির সদস্যরাই সাম্প্রতিক হামলাগুলোর সঙ্গে জড়িত। সারাদেশে নাশকতামূলক ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সংঘটনের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর লক্ষ্যে তারা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। তারা তাদের আদর্শ ও কর্মকান্ডকে গতিশীল ও উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা করে আসছে। বর্তমানে দেশীয় ইসলামী উগ্রপন্থি সংগঠনের সহায়তায় বাংলাদেশে নাশকতামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করাই তাদের উদ্দেশ্য।
র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, এই এলিট ফোর্স জন্মলগ্ন থেকে চলতি বছর পর্যন্ত এক হাজার ১৯২ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যকে আইনের আওতায় এনেছে। এদের মধ্যে শুধুমাত্র জেএমবির সদস্য ৬২৩। বিভিন্ন অভিযানে জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে ৩৪৯টি গ্রেনেড বা ককটেল বিভিন্ন প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র ৯৬টি, বিভিন্ন প্রকার গোলাবারুদ ৪ হাজার ৯২৮ রাউন্ড, বিভিন্ন প্রকার ১ হাজার ৯৮৩ কেজি বিস্ফোরক, ৬২৪টি গ্রেনেড বডি, বিভিন্ন প্রকার ৯ হাজার ১২৩টি ডেটোনেটর এবং বিপুল সংখ্যক সাংগঠনিক বই, সিডি, লিফলেট ও পোস্টার উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে, এ সংগঠনটি নারী সমর্থক ও সদস্য সংগ্রহের জন্যও চতুরতার সঙ্গে কাজ করছে। আর এ কাজের জন্য নিষিদ্ধ সংগঠনটি নারীদেরই ব্যবহার করছে। গাজীপুর ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির এক নারী উপদেষ্টাসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।
রোববার (১৪ আগস্ট) রাত ২টা থেকে সোমবার (১৫ আগস্ট) রাত ১০টা পর্যন্ত গাজীপুরের সাইনবোর্ড, মগবাজার ও মিরপুর-১ এলাকায় এ সব অভিযান চালানো হয়। গ্রেফতাররা হলেন- আকলিমা রহমান, ঐশী, মৌ ও মেঘলা।
তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মূলত সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করত। তাদের মধ্যে একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক আর বাকি তিনজন মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষার্থী।
র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) খন্দকার লুৎফুল কবির জানান, জেএমবির ওই নারী সদস্যরা সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ঐশী ওই সেলের প্রধান। সে মোটিভেশন করে নারীদের তাদের দলে আনতো। গত ২১ জুলাই গাজীপুর থেকে গ্রেফতার হওয়া জেএমবির দক্ষিণাঞ্চলের আমির মো. মাহমুদুল হাসানের (২৭) কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জেএমবির নারী সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়।
তিনি আরও জানান, র‌্যাবের কাছে মাহমুদুল স্বীকার করে রাজধানীতে আকলিমা আক্তার মনি নামে এক নারীর নেতৃত্বে জঙ্গি কার্যক্রম শুরু করেছে জেএমবির সমর্থক নারী সদস্যরা। র‌্যাব আকলিমাকে নজরদারিতে রাখে এবং তার বিরুদ্ধে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায়। এরই সূত্র ধরে টঙ্গির সাইনবোর্ড এলাকা থেকে আকলিমাকে গ্রেফতার করা হয়। আকলিমার দেওয়া তথ্যে মগবাজার এলাকা থেকে ঐশীকে আটক করা হয়। পরে মেঘলা ও মৌ নামে আরও দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। জেএমবি আমির মাহমুদুল এদের অর্থের যোগানদাতা ছিলেন। গ্রেফতারদের কাছ থেকে দুটি ল্যাপটপ, বেশ কয়েকটি মোবাইল, বিপুল পরিমাণ জিহাদি বই, অডিও এবং ভিডিও ক্লিপস উদ্ধার করা হয়েছে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com