1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ০৮:০১ পূর্বাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য মহারাজের বাংলোঘর অবিকল কাঠামোয় ৪৬ বছর ধরে সংরক্ষণ

  • আপডেট সময় সোমবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৬

শামস শামীম ::
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল ধর্মপাশায় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক কর্মী ও অনুরাগী ছিলেন প্রাক্তন চেয়ারম্যান মনফর রাজা চৌধুরী ওরফে মহারাজ মিয়া। জমিদার বংশের এই মানুষটি শান-শওকত নিয়ে চলতেন বলেই এলাকাবাসী তাঁকে মহারাজ ডাকতেন। এ কারণেই তাঁর মূল নাম ছাপিয়ে মহারাজ চৌধুরীই পরিচিতি পায়। বঙ্গবন্ধুর অনুরাগী এই মানুষটি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য তাঁর বাংলোঘরটি অবিকল কাঠামোয় সংরক্ষণ করে গেছেন।
১৯৮৯ সনে মারা যাওয়ার আগে সন্তানদেরও নির্দেশনা দিয়ে গেছেন যাতে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য টিনশেডের ঐতিহাসিক বাংলোঘরটি কখনো ভাঙা না হয়। সন্তানদের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে এই বাংলোঘরটি অবিকল কাঠামোয় সংরক্ষণের। পিতার মৃত্যুর ২৭ বছর ধরে বাবার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন সন্তানরা। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিঘেরা বাড়িটির স্মৃতি যাতে মুছে না যায় সে জন্য বাংলোঘরটি সংরক্ষণ করে চলছেন তাঁরা। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু, মহারাজ মিয়ার পারিবারিক যে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করেছিলেন সেই মসজিদকেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন এলাকাবাসী। সেই মসজিদটিও অবিকল কাঠামোয় সংরক্ষিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়িয়ে জুম্মার নামাজ আদায় করছেন রাজাপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফা ও সাহেব আলী। তারা দু’জন এখনো সেই স্মৃতি রোমন্থন করেন।
ঐতিহাসিকরা জানান, ১৯৭০ সনে বর্ষা মওসুমে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারণায় আসেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সঙ্গে ছিলেন জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদসহ আরো জাতীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীবৃন্দ। ঐতিহাসিক এই সফরের একাধিক সঙ্গী এখনো বেঁচে আছেন। আড্ডায় তাঁরা সেই স্বর্ণালী স্মৃতি রোমন্থন করেন। ওইদিন মহারাজ মিয়া চৌধুরীর আতিথেয়তা এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রাণোচ্ছল কথাবার্তা এখনো স্মরণ রেখেছেন তাঁরা।
বঙ্গবন্ধুর একাধিক সফরসঙ্গীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তখন ছিল বর্ষা মাস। চারদিকে পানি আর পানি। গ্রামগুলো দ্বীপে রূপ নিয়েছে। লঞ্চের অগ্রভাগে থেকে রূপসী বাংলার বর্ষার দৃশ্য দেখছেন জাতির জনক। হাওরের বুকে ডানা মেলা হিজল-করচবৃক্ষ যেন তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছিল।
হাওরের নিলাভ জলের কুচি কুচি ঢেউ কেটে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী লঞ্চ এগিয়ে চলছে হাওর উপজেলা সুখাইড়-রাজাপুরের দিকে। উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত নেতা ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মহারাজ মিয়া চৌধুরীর বাড়ি। সিদ্ধান্ত হয়েছে এই বাড়িতে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী কর্মীসভা করবেন। দিনটি ছিল শুক্রবার। জুম্মার নামাজ শুরুর আগেই বঙ্গবন্ধুর নৌবহর রাজাপুর গ্রামে পৌঁছে যায়। একটি পাকা ঘাটে লঞ্চ ভেড়ানোর পর সুখাইড় রাজাপুরের আওয়ামী লীগ নেতা ও বঙ্গবন্ধুর পরীক্ষিত কর্মী মহারাজ মিয়া চৌধুরী লঞ্চে উঠে আসেন। তাঁকে দেখেই বঙ্গবন্ধু হাত বাড়িয়ে দেন। কোলাকুলি করেন। হাওরপাড়ের মানুষ মহারাজ মিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর উষ্ণ আলিঙ্গন ও সখ্যতার দৃশ্য দেখে পুলকিত হয়। এরপরই তিনি বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্যদের নিয়ে নিচে নেমে আসেন। নামাজ শুরু হওয়ার মুহূর্তেই সদলবলে মহারাজ মিয়ার পারিবারিক সুখাইড় রাজাপুর মসজিদে নামাজ আদায় করেন বঙ্গবন্ধু। পরে তাঁর ছায়াঘেরা টিনশেডের বাংলোঘরে বিশ্রাম নেন। হাওর ঘেরা বাড়িটি বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির খবর পেয়ে মুখর হয়ে উঠে। এরপরই শুরু হয় নির্বাচনী কর্মীসভা। নেতাকর্মীরা বক্তব্য দেন। সবার শেষে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর ভাষণে পাকিস্তানি বাহিনীর শোষণ-বৈষম্যের চিত্র উঠে আসে। ভাষণের মাঝে-মধ্যেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মহারাজ মিয়ার বাড়ি মুখরিত হয়ে ওঠে।
লঞ্চে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মহারাজ মিয়ার কোলাকুলি ও হাত ধরে কথা বলার দৃশ্য দেখেই গ্রামবাসী টের পান অজোপাড়াগাঁর এক বিশ্বস্ত কর্মীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ। নামাজের পর বাড়িটি লোকারণ্যে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখার জন্য নারী-পুরুষ গ্রাম ভেঙে মহারাজ মিয়ার বাড়িতে ছুটে আসে। তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন তাঁরা। তবে বাংলোঘরে শতাধিক মানুষের বেশি স্থান সংকুলান না হওয়ায় বাংলোঘরটি ঘিরেই গ্রামবাসী অবস্থান নেন। তাঁরা পিনপতন নীরবতায় কর্মীসভার সবার বক্তব্য শোনেন।
ওইদিন বিকেলে বঙ্গবন্ধু চলে যাওয়ার পর মহারাজ মিয়ার বাংলোঘরটি তাঁর কাছে নতুন গুরুত্ব নিয়ে দেখা দেয়। এরপর থেকেই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য বাংলোঘরটি সংরক্ষণে উদ্যোগী হন তিনি। এর স্মৃতি যাতে মুছে না যায় জীবদ্দশায় সেই চেষ্টাই করেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মহারাজ মিয়া চৌধুরী সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন ১১নং সেক্টরের মহেশখলা ক্যাম্পের সহকারি ইনচার্জ। যুদ্ধের সময় তাঁর বাড়িতে আক্রমণ করে রাজাকাররা। এসময় লুটপাটও হয় বাংলোঘরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাজাকারদের হাতে। মুক্তিযুদ্ধের পরে গ্রামে ফিরে বসতঘর সংস্কারের আগে মহারাজ মিয়া চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বাংলোঘরটি সংস্কার করে পূর্বের কাঠামোয় ফিরিয়ে আনেন।
মহারাজ মিয়া মারা গেছেন ১৯৮৯ সনে। তাঁর জীবদ্দশায় বাংলোঘরটিকে নিজেই যতœআত্তি করতেন। কোথাও বাংলোঘরের ত্রুটি তার চোখে পড়লে তিনি সাথে সাথে সেটি সংস্কার করতেন। বঙ্গবন্ধু নামাজ আদায় করায় পারিবারিক মসজিদটিকেও তিনি সংরক্ষণ করতেন। মারা যাবার পর পিতার নির্দেশনা অনুসারে সন্তানরা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত এই বাংলোঘরটি সংরক্ষণ করছেন।
রাজাপুর মসজিদের ইমাম মাওলানা মাফিল উদ্দিন বলেন, নানা কারণে এই মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ। এটি সুখাইড় রাজাপুর গ্রামের প্রথম মসজিদ। মহারাজ মিয়া চৌধুরীর পূর্ব পুরুষ তাঁদের জায়গায় নিজস্ব অর্থায়নে মসজিদটি নির্মাণ করেন। আমি ১৭ বছর ধরে এই মসজিদের ইমামতি করছি। প্রথম দিন ইমাম হিসেবে যোগদানের পর স্থানীয় মুসল্লি গোলাম মোস্তফা ও সাহেব আলী আমাকে জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই মসজিদে নামাজ আদায় করেছিলেন। তাঁরা এখনো এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের বিষয়ে গল্প করেন।
মহারাজ মিয়া চৌধুরীর সন্তান সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমান রাজা চৌধুরী বলেন, বাবা ছিলেন আমৃত্যু আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ, বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত কর্মী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। ১৯৭০ সনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের বাংলোঘরে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। পরে সেই ঘরে কর্মীসভা করে দুপুরের খাবার খেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই স্মৃতিধন্য বাংলোঘরটি জীবদ্দশায় বাবা সংরক্ষণ করে গেছেন। নানা সময়ে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। তিনি মারা যাওয়ার আগে আমাদেরও স্মৃতিটি ধরে রাখার নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।
বঙ্গবন্ধুর ওই সফরের সঙ্গী তৎকালীন মহুকমা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, সেদিন লঞ্চের অগ্রভাগে মহারাজ মিয়া চৌধুরীকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোলাকুলি ও করমর্দন করে কথাবার্তা বলতে দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম। তিনি বঙ্গবন্ধুর কতটা ভক্ত ও অনুরাগী ছিলেন তাঁর বাংলোঘরে বঙ্গবন্ধুর বিশ্রাম, কর্মীসভা এবং একই স্থানে আপ্যায়নে টের পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুও যে আমজনতার নেতা সেদিন মহারাজ মিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে আমরা আবারও দেখেছিলাম। জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত বাংলোঘরটি নিজে সংরক্ষণ করতেন তিনি। এখন তাঁর সন্তানরা সেটা করছেন। বঙ্গবন্ধুকে এভাবেই যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখবেন তাঁর বিশ্বস্ত কর্মী ও অনুরাগীরা।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com