1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ০৬:৫৩ পূর্বাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01711-368602

মু ক্ত ম ত : প্রসঙ্গ : রাজনীতি ও স্কুলের অসহায় খেলার মাঠ

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৬

কল্লোল তালুকদার চপল ::
বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রমবিকাশ ও চূড়ান্ত পরিণতির দিকে অগ্রযাত্রায় মূল চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করেছিল ভাষাতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ। অপরপক্ষে, সামন্ত-সেনা শাসিত পাকিস্তান নামক কৃত্রিম উদ্ভট রাষ্টযন্ত্রের মূল ভিত্তি ছিল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ। এই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের স্ফূরণে বাঙালি জাতি অর্জন করে অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ এই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জয়যাত্রার চূড়ান্ত রূপ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
৫২’র ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির মিনার ‘শহীদ মিনার’। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ইট, বালি, সিমেন্ট সংগ্রহ করে ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল বেলা শহীদ মিনার নির্মাণ কাজ শুরু করেন। রাতভর চলে নির্মাণকাজ। ভোরে নির্মাণকাজ শেষ হলে একটি কাপড় দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি ঢেকে রাখা হয় এবং ঐ দিনই অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদ সফিউরের পিতা তা উদ্বোধন করেন। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী একদিন পর অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি সেই শহীদ মিনার ভেঙে ফেলে। পরবর্তীতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়ার পর ১৯৫৭ সালে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৬৩ সালে তা সমাপ্ত হয়। পরবর্তীতে সারাদেশ জুড়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে বা সম্পূর্ণ নূতন ডিজাইনে অসংখ্য শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে। আমাদের সুনামগঞ্জেও বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেন, যা একাধারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতিসৌধ হিসেবে জনগণের কাছে গণ্য হয়ে আসছে। কালপরিক্রমায় ক্রমশ এই শহীদ মিনারটি সুনামগঞ্জবাসীর নানা আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। সুনামগঞ্জবাসীকে বিভিন্ন সংকটে এই শহীদ মিনার শক্তি ও সাহস যোগিয়েছে এবং দিয়েছে সঠিক পথের নিশানা। ক্রমশ এই শহীদ মিনার সুনামগঞ্জের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনতা গভীর শ্রদ্ধায় শহীদগণের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন এই শহীদ মিনারে। কয়েক বছর আগে কালেক্টরেট ভবন প্রাঙ্গণে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদস্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হওয়ায় পুরাতনটি সুনামগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার হিসেবেই জনগণের কাছে বিবেচিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি শুনা যাচ্ছে, নূতন করে অত্যাধুনিক শহীদ মিনার নির্মিত হবে। এতে সুনামগঞ্জবাসী খুবই খুশি।
আমরা জানি, ১৯৫৬ সালে দেশের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার জন্য ভীষণ আগ্রহী ছিলেন তৎকালীন একজন মন্ত্রী। কিন্তু জনতার প্রতিরোধের কারণে সেদিন কোনো মন্ত্রী তা করতে সাহস পাননি। পরিশেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করানো হয় ভাষা শহীদ রিকশাচালক আওয়ালের ছয় বছরের মেয়ে বসিরনকে দিয়ে। কিন্তু অত্যন্ত অবাক হয়ে সুনামগঞ্জবাসী প্রত্যক্ষ করলেন, গত ৩১ জুলাই সুনামগঞ্জ জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো জুবিলী স্কুলের খেলার মাঠে। এতে সাধারণ মানুষ যারপর নাই বিস্মিত, ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ইতোপূর্বে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য একটি ‘সাইট সিলেকশন কমিটি’ও গঠিত হয়েছিল। সেই কমিটির সম্মানিত সদ্যসরাও নাকি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন!
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জন্য স্থান নির্বাচন বিষয়ে সর্বশেষ সভাটি অনুষ্ঠিত হয় সুনামগঞ্জ পৌরসভায়, মেয়র মহোদয়ের কক্ষে। এতে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জনাব এম.এ. মান্নান এমপি, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান জনাব ড. মোহাম্মদ সাদিকসহ সুনামগঞ্জের বয়ঃজ্যেষ্ঠ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, রাজনীতিকগণ। ঐ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, পুরনো শহীদ মিনার সংলগ্ন আইন মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন পুরো জায়গাটি আইন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিয়ে বৃহৎ পরিসরে নূতন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মিত হবে। জুবিলীর খেলার মাঠসহ অন্যান্য প্রস্তাবিত স্থানসমূহের কথা সেদিন সর্বসম্মতিক্রমে বাতিল করা হয়। সেই সভার সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে জুবিলী স্কুলের খেলার মাঠে কেন শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো?
নূতন শহীদ মিনার নির্মাণকল্পে সরকার ৩২ লক্ষ টাকা নাকি বরাদ্দ দিয়েছেন। আমাদের কোনো কোনো বুদ্ধিজীবীর মতে, এখনই যদি কাজ শুরু করা না যায়, তবে এতগুলো টাকা ফেরত চলে যাবে। সেই টাকার চিন্তায় তাঁদের নাকি ঘুম নষ্ট হওয়ার যোগাড়। তাই যেনতেন প্রকারে হোক, যেকোন স্থানে হোক একটি কিছু নির্মাণ না করলেই নয়। স্কুলের বাচ্চাদের খেলাধুলা, পড়াশোনা প্রভৃতি গোল্লায় যাক, কার কী তাতে? আমাদের মতো সাব-অল্টার্ন মানুষের নি¤œকণ্ঠের প্রশ্ন, উপযুক্ত স্থান পাওয়া না গেলে, বরাদ্দকৃত টাকা ফেরত গেলে কী এমন ক্ষতি? গেলে যাক না। এর আাগেও তো অডিটরিয়াম নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত সাড়ে ছয় কোটি টাকা ফেরত গেল। সে তুলনায় এতো নস্যি। বলি, বরাদ্দকৃত টাকা কি বানের জলে ভেসে ভেসে অন্যদেশে চলে যাচ্ছে? নাকি রাষ্ট্রীয় কোষাগারেই পুনরায় জমা হবে? এরূপ একদেশদর্শী নির্মাণ কজের চেয়ে টাকা ফেরত যাওয়াই কি উত্তম নয়? অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে, একবার টাকা ফেরত গেলে কোনো দিনই যেনো আর তা পাওয়া যাবে না!
জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য কি কেবল স্কুলের খেলার মাঠই একমাত্র উপযুক্ত জায়গা? স্কুলের খেলার মাঠ কী, কেন- তা নূতন করে ব্যাখ্যার কোনো অবকাশ নাই। কিন্তু একটি স্কুলের একমাত্র খেলার মাঠে জেলার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নির্মাণের খবরে জনমনে কিছু প্রশ্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই উত্থিত হয়।
শহীদ মিনার কেবল জাতীয় শোক দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেয়ার স্থান নয়, শহীদ মিনার চেতনা শানিত করারও স্থান। শোষণ-বঞ্চনা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করারও স্থান। সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনীতিক সংগঠনসমূহের বছর জুড়ে নানান কর্মসূচি থাকে। স্কুল প্রাঙ্গণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মিত হলে স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রমে কী এর কোনো প্রভাব পড়বে না?
স্কুলে একটা শহীদ মিনার থাকাবস্থায় আরেকটি কেন? একটি স্কুলে কয়টি শহীদ মিনার দরকার? পুরাতন (মাত্র দুই-আড়াই বছর আগে নির্মিত!)-টিকে নিয়ে তখন কী করা হবে?
যখন শুনি কর্তাব্যক্তিরা নাকি শহীদ মিনার ব্যবহারের নীতিমালা তৈরি করে দেবেন, তখন আর বিস্মিত না হয়ে কোনো উপায় থাকে না! তাঁরা ঠিক করে দেবেন আপনি কখন কীভাবে শহীদ মিনারে যাবেন। তা না হয় করলেন, কিন্তু স্কুল মাঠে ক্রিকেট, ফুটবল প্রভৃতি সারা বছর খেলা চলে। বল বা অন্য কোনো খেলার উপকরণ গিয়ে যখন নান্দনিক শহীদ মিনারে আঘাত করে ক্ষয়ক্ষতি করবে, তখন তাঁরা নান্দনিক সৌন্দর্য রক্ষায় কী পদক্ষেপ নিবেন? পৃথক দেয়াল, নেট ইত্যাদি দিয়ে অর্থাৎ শহীদ মিনারকে বাক্সবন্দি করে সুরক্ষার ব্যবস্থা করবেন? শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষার কথা বলে অথবা এর নান্দনিকতার দোহাই দিয়ে ক্রমান্বয়ে ছাত্রদের খেলাধুলায়ও কি একপর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হবে?
পৃথক দেয়াল দিলে, তখন সেই ভূমিটুকু স্কুলের মালিকানাধীন থাকল কী? তাছাড়া শুনা যাচ্ছে, খেলার মাঠে প্রবেশপথে বিশাল গেইট হবে এবং তাতে জুবিলী স্কুলের খেলার মাঠের পরিবর্তে লেখা হবে, ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার’। তখন দৃশ্যত মাঠের মালিকানা গেল কার হাতে?
এই যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো এবং সেখানে শহীদ মিনার নির্মিত হবে- তার আইনগত ভিত্তিটাই-বা কী? এই জায়গায় এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়ার এখতিয়ার কার? এ বিষয়ে বিভাগীয় কোনো অনুমতিপত্র কি আছে?
জুবিলী স্কুলের খেলার মাঠ ছাড়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জন্য সুনামগঞ্জ শহরে কি আর কোনো উপযুক্ত স্থান নেই? কেউ কেউ বলেন, পুরনো শহীদ মিনারটি একান্তই যদি সরাতে হয় তবে নবনির্মিত জেলা শিল্পকলা একাডেমির পাশে অবস্থিত জেলা পরিষদের মালিকানাধীন মজাপুকুরটি ভরাট করে সেখানে নান্দনিক শহীদ মিনার নির্মাণ করা যেতে পারে। তবে জনসাধারণের বক্তব্য হলোÑ জুবিলী স্কুলের খেলার মাঠ বাদ দিয়ে পুরনো শহীদ মিনারটিকে বর্ধিত কলেবরে আধুনিকায়ন করা হোক।
জুবিলীর শিক্ষার্থীরা তাদের মাঠ রক্ষার দাবিতে শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজপথে নেমে এসেছে। তাদের যৌক্তিক দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে একপর্যায়ে হয়তো তাদের অভিভাবক, জুবিলীর প্রাক্তন ছাত্র অর্থাৎ জুবিলীয়ানরা, সচেতন নাগরিকগণ রাজপথে নেমে আসবেন। অনেকে মনে করেন, এই পরিস্থিতি সৃষ্টির পূর্বেই শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে তাদের খেলার মাঠে জেলার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হোক। জেলাবাসী মনে করেন বংশপরম্পরায় আমাদের কচিকাঁচাদের শারীরিক, মানসিক সুষ্ঠু বিকাশের জন্য স্কুলের খেলার মাঠটি অক্ষত রাখা একান্ত প্রয়োজন।
[লেখক : জুবিলী’র প্রাক্তন ছাত্র]

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com