1. dailysunamkantha@gmail.com : admin2017 :
  2. editor@sunamkantha.com : Sunam Kantha : Sunam Kantha
বৃহস্পতিবার, ০৫ অগাস্ট ২০২১, ০৮:১৮ অপরাহ্ন
ঘোষণা ::
সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা সুনামকন্ঠে আপনাকে স্বাগতম। আমাদের পাশে থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন - 01867-379991, 01716-288845

দিদি শ্রীমতি দিপালী চক্রবর্তী : আলোর পথের যাত্রী

  • আপডেট সময় সোমবার, ৩০ মে, ২০১৬

স্বপন কুমার দেব ::
২০০৩ সালের আজকের এইদিনে (৩১ মে) দিদি শ্রীমতি দিপালী চক্রবর্তী ৭০ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তিনি সশরীরে নয়ন সম্মুখে না থাকলেও তাঁর মহতী কর্মকান্ডের ভেতর দিয়ে আমাদের দু’নয়নের মাঝে তিনি জ্বল জ্বল করে অবস্থান নিয়ে আছেন। এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা হয়তো অনেকেই তাঁকে চিনেন না। তবে ষাটের দশকে ও পরবর্তী সময়ে দিপালী চক্রবর্তীকে চিনতেন না এমন লোক শহরে ছিলেন না। দিদিকে আমি যতটুকু দেখেছি ও চিনেছি তাতে অনায়াসে বলা যায়- এক গৃহবধূ থেকে নন্দিত ও আলোকিত মানুষ রূপে উত্তরণের কাহিনীই দিদির জীবন কাহিনী।
১৯৩৩ সনের জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখে জগন্নাথপুর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে দিদির জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম শ্রী সত্যেন্দ্র চৌধুরী এবং মাতা হীরালতা চৌধুরী। গ্রামেই দিদির পড়াশোনার হাতেখড়ি। পিতার পরিবারে ছিল সঙ্গীত চর্চা। দিদির সঙ্গীত চর্চা পরিবারেই শুরু হয়। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেতো। দিদির বিয়ে হয় বর্তমান দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার হাঁসকুড়ি গ্রামের শ্রী মনোরঞ্জন চক্রবর্তী মহাশয়ের সঙ্গে। মনোরঞ্জন চক্রবর্তী ছিলেন মৃদুভাষী, বিনয়ী, ন¤্র প্রকৃতির সজ্জন লোক। তাঁরও ছিল সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ। মনোরঞ্জন চক্রবর্তী মিঠে সুরে বাঁশি বাজাতেন আর দিপালী চক্রবর্তী এ¯্রাজে ঝংকার তুলতেন। ধামাইল গানও গাইতেন দিদি। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই দেখতে ছিলেন সুন্দর এবং তাঁদের গায়ের রং ছিল ফর্সা। বলা যায় রাজযোটক। মনোরঞ্জন চক্রবর্তী মহাশয় পলাশের জমিদার এস্টেটে কর্মরত ছিলেন। সেই সূত্রে পরবর্তীকালে সুনামগঞ্জ শহরের উকিলপাড়ায় পলাশের জমিদার বাড়িতে বসবাস শুরু। পলাশের অন্যতম জমিদার পিলু বাবু দিদির পরিবারের সঙ্গে এই বাসায়ই বসবাস করতেন। পিলু বাবু ছিলেন অত্যন্ত সঙ্গীত পিপাসু এবং একজন উঁচুমানের এ¯্রাজ বাদক। তিনি, দিদি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পরম যতেœ ও মমতায় জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এখানেই কাটিয়ে গেছেন। কিশোরী বয়সে দিপালী দি’র বিয়ে হলেও পড়াশোনা ও জ্ঞান অর্জনে তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছা ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ফলশ্রুতিতে শহরের এস সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তিনি পড়াশোনা শুরু করে দেন। তৎকালীন সময়ে সংসারি নারীর এরকম প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের নজির ছিল খুবই কম। তখন থেকেই দিদি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং প্রশংসিত হন। দিপালী দি’ ছিলেন একজন গুণবতী নারী। শিক্ষাজীবন শুরু করলেও গৃহকর্মে কোনদিন অবহেলা করেন নি। নিপুণা গৃহিণীর মতই রান্নাবান্না, স্বামী-সন্তানদের যতœ-আত্তির কোন ঘাটতি হয়নি। ম্যাট্রিক/এসএসসি পরীক্ষায় পাস করার পর শ্রীমতি দিপালী চক্রবর্তী উচ্চ শিক্ষাগ্রহণের জন্য সুনামগঞ্জ কলেজে ভর্তি হন। তখন ছিল ষাটের দশক। পূর্ব বাংলায় রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অগ্নিগর্ভ। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সারা পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা ছিলেন আন্দোলনমুখর। দিদি’র মনে ছিল ছাই চাপা আগুন। প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় বাম ঘরানার ছাত্র রাজনীতিতে ধারক-বাহক ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। সেই সময়ে সুনামগঞ্জ মহকুমাসহ সারা সিলেট অঞ্চলে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী ও জোরদার একটি সংগঠন। মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন এদের মত নেতারা ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের কান্ডারী। কলেজে গিয়েই দিদি ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এবং নিজ সাংগঠনিক কর্মকান্ডের গুণে এই সংগঠনের মধ্যমণি হয়ে উঠেন। দিদিকে দেখে অনেক মেয়েরাই তখন সংগঠনে যোগ দেন। দাবি আদায়ের প্রতিটি আন্দোলনে শ্রীমতি দিপালী চক্রবর্তী ছিলেন অত্যন্ত সোচ্চার, নিষ্ঠাবান ও আন্তরিক। সহজাত গুণের কারণে সবাই দিদিকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দেন।
সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে এখানেই ¯œাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। পড়াশোনা, সংসার কর্ম, সংগঠন, আন্দোলন সবই এক সঙ্গে চালিয়ে যেতে থাকেন। সেই সময়ে সুনামগঞ্জের ছাত্র রাজনীতি পরিচালিত হতো দিদি ও দিদির বাসাকে কেন্দ্র করে। বিকেল হলেই ছাত্র-ছাত্রীরা দলে দলে সমবেত হতেন দিদির উকিলপাড়ার বাসায়। এখানে বসেই সবাই ঠিক করতেন পরবর্তী পরিকল্পনা এবং আন্দোলনের ছক। দিদি আপ্যায়নে ছিলেন উদারহস্ত। চা এবং জলখাবারে কোন ত্রুটি ছিল না। কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি থাকাবস্থায় তৎকালীন পূর্ব বাংলার অগ্নিকন্যা বেগম মতিয়া চৌধুরী একাধিকবার সুনামগঞ্জ সফর করেন এবং দিদির বাসায় অবস্থান করেন। ডিগ্রি পাস করে কলেজ জীবন শেষ হলেও দিদিকে কেন্দ্র করে রাজনীতির চলমান প্রবাহ শেষ হয়নি। নারীর উপর অত্যাচার প্রতিরোধে দিদি ছিলেন সর্বদা প্রতিবাদ মুখর। সেই সময়ে সুনামগঞ্জের একমাত্র মহিলা সংগঠন মহিলা সমিতিতে যোগদান করে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন দিদি। এদিকে পূর্ব বাংলায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশঃ স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চের পর শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ লোকজন শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় নেন মেঘালয়ের বালাটে। দিদিও পরিবার-পরিজনসহ বালাটে আসেন। বালাটে এবং শিলংয়ে তিনি রেডক্রসের পক্ষ থেকে শরণার্থীদের সেবাদানে কার্যকর ও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। দেশ স্বাধীন হবার পরও দীর্ঘদিন তিনি দেশে ফিরে আসা শরণার্থীদের মাঝে রেডক্রসের পক্ষে কর্মতৎপরতা চালিয়ে যান। এভাবেই চলতে থাকে দিদি’র জীবন।
নারী অধিকার আদায়ে সোচ্চার হন তিনি। উপলব্ধি করেন নারী জাগরণ না হলে অপূর্ণ থেকে যাবে অর্ধেক জনগোষ্ঠী। ১৯৯৯ সালের পহেলা মে তারিখে সুনামগঞ্জে দিদির হাত ধরে জন্ম নেয় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সুনামগঞ্জ শাখা। শ্রীমতি দিপালী চক্রবর্তী ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মহিলা পরিষদ জেলা শাখার বর্তমান সুযোগ্য সভাপতি শ্রীমতি গৌরী ভট্টাচার্য্য এবং সাধারণ সম্পাদক শরিফা আশরাফী সম্পা সহ অনেক নেত্রীই দিদির আলোয় আলোকিত। সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সুনামগঞ্জ জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন দিদি। তাঁর আরেক সত্ত্বা ছিল ঈশ্বরভক্তি। সুনামগঞ্জ রামকৃষ্ণ আশ্রমের যখন খুবই দুরবস্থা ছিল তখন শ্রীমতি দিপালী চক্রবর্তী একাহাতে সব সামাল দিয়েছেন এবং আশ্রমে দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন পূজা ও ভক্তিমূলক সঙ্গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। মহারাজগণ এলে তাঁদের থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা দিদির বাসাতেই হতো। সুনামগঞ্জের সারদা সংঘেরও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। দিদি যেমন ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত তেমনি তাঁর সন্তানেরাও কম নয়। তাঁর বড় মেয়ে রতœা চক্রবর্তী উঁচুমানের সঙ্গীত শিল্পী। এক সময়ে রতœার গান শুনতে সবাই উন্মুখ হয়ে থাকতেন। বড় ছেলে মৃণাল চক্রবর্তী মিঠু একজন ভালো তবলাবাদক ছিলেন। পেশায় ছিলেন আইনজীবী। অকালে মিঠুর মৃত্যু হলে দিদি আরো ভেঙ্গে পড়েন। দ্বিতীয় ছেলে ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী শান্তি নিকেতনে অধ্যয়ন করেছেন। পরবর্তীকালে লোকসংগীতের গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগের শিক্ষক। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগ চালু হয়। অনেকগুলি গবেষণামূলক গ্রন্থ তিনি লিখে গেছেন। দেশে-বিদেশে ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী ছিলেন একজন পরিচিত মুখ। ছোট ছেলে মলয় চক্রবর্তী রাজু পেশায় একজন আইনজীবী। তবে তিনিও ভালো সঙ্গীত শিল্পী।
আজকের দিনে নারীরা যেখানে পদে পদে নির্যাতিত হচ্ছেন এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সেখানে শ্রীমতি দিপালী চক্রবর্তীর মত নেত্রীর আরো বেশি বেশি দরকার। সুনামগঞ্জ মহিলা পরিষদ দিদি’র আদর্শ মাথায় রেখে এগিয়ে যাবে বলেই আশা করা যায়। শুধু আশা নয় তার প্রতিফলনও আমরা দেখতে পাচ্ছি।
দিদি দিপালী চক্রবর্তী ছিলেন একজন আলোকিত মানুষ এবং আলোর পথের যাত্রী। আজকে তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। সুনামগঞ্জবাসী শ্রীমতি দিপালী চক্রবর্তীকে কোনোদিন ভুলবে না। শ্রীমতি দিপালী চক্রবর্তী তাঁর কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন।
[লেখক : সিনিয়র আইনজীবী/কথাসাহিত্যিক]

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© All rights reserved © 2016-2021
Theme Developed By ThemesBazar.Com