শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৫২ অপরাহ্ন

Notice :

নেতৃত্বশূন্য জামায়াতের পরিণতি কী?

সুনামকণ্ঠ ডেস্ক ::
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের ফাঁসি হওয়ায় দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ। ইতোমধ্যে দলটির আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এছাড়া ফাঁসির দন্ড কার্যকরের পথে রয়েছে দলটির অন্যতম নীতি-নির্ধারক মীর কাশেম আলী।
দলের ঐক্যের প্রতীক গোলাম আযম শাস্তি চলাকালীন কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রভাবশালী নেতা সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীও আমৃত্যু কারাভোগ করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতকে এগিয়ে নেয়ার মতো যোগ্য নেতৃত্বের শূন্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্তমান নেতৃত্বকেও অতীত নেতৃত্বের কৃতকর্মের দায়ভার বহন করতে হবে, এমনকি নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করলেও। ভবিষ্যতে তাদের এ থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
এদিকে, আদালত জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীরও বিচার করা যাবে- এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। দেশের সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ বিভিন্ন মহল থেকে জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দলটির মিত্র ও সহানুভূতিশীল ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোও নীরব। সুতরাং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পরপরই এই আলোচনা সর্বাগ্রে আসছে।
এ নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) পলিট ব্যুরোর সিনিয়র সদস্য হায়দার আকবর খান রনো বলেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে হবে। বাহাত্তরের সংবিধানে পুরোপুরি ফিরে গেলেই জামায়াত বা জামায়াত ধরনের দলগুলো অটোমেটিক্যালি নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।
তবে বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা এলে জামায়াতকেও রাজনীতি করার অধিকার দিতে হবে কি না এ প্রশ্নও উঠেছে। যেমনটি বললেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তার মতে, অন্য ইসলামী দলগুলোর মতো জামায়াতেরও রাজনীতি করার অধিকার থাকা উচিত। তবে একাত্তরে পূর্বসূরিদের বিতর্কিত ভূমিকার জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার শর্ত দিতে চান তিনি।
এছাড়া জামায়াত তো খুবই ছোট বা দুর্বল ভিত্তির কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এদের যেমন আছে অর্থনৈতিক ভিত্তি তেমনি জনভিত্তিও আছে। তাছাড়া, এ ধরনের একটি কট্টর আদর্শবাদী রাজনৈতিক দলের প্রাণশক্তিও থাকে প্রবল। ফলে, এরা হারিয়ে যাবে না; সুযোগমতো আবার আত্মপ্রকাশ করবে বলে মনে করেন ২০ দলীয় জোটের শরিক জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান।
সবকিছুর ফয়সালা আদালতে হয় না, এটি আইনগত বিষয় নয়, এটি জনগণকেন্দ্রিক বিষয়- এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন তিনি। তবে জামায়াতের চূড়ান্ত পরিণতি কী, সেটা বলার সময় এখনো আসেনি বলে মনে করেন প্রধান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদেক খান মনে করেন, এটি জামায়াতের একটি সাময়িক অবস্থা। সরকার বিরোধীদের দমনে শক্তিশালী পলিসি নিয়েছে। জামায়াতের সমর্থক থাকলে তাদের রাজনীতিও থাকবে। নিষিদ্ধ হলে হয়তো তারা অন্য নামে আসবে অথবা ২০ দলীয় জোটে একীভূত হয়ে যাবে। তবে বহুদলীয় গণতন্ত্র থাকলে জামায়াতেরও একটি ভবিষ্যৎ থাকবে।
সাদেক খান বলেন, ২০ দলীয় জোট একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হলে জামায়াত সেই জোটে একীভূত হয়ে যেতে পারে। তবে সেটার সম্ভাবনা খুবই কম। আমার মনে হয়, দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রই থাকবে। জামায়াতকে দমনের চেষ্টা অব্যাহত থাকলে জঙ্গিবাদের উত্থানের আশঙ্কাও করছেন এই রাজনীতি বিশ্লেষক।
অপরদিকে, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ স¤পাদক সাইফুল হক বলেছেন, রাজনৈতিক ফেনোমেনা হিসেবে জামায়াতের একটি আদর্শিক বাতাবরণ আছে। তাছাড়া কোনো দলের রাজনীতিকে শুধু নিষিদ্ধ করে সমাজ ও সমাজের গভীর থেকে তাকে নিঃশেষ করা যায় না। এজন্য জামায়াতকে মতাদর্শিক, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে গণজাগরণ ও গণচেতনার মধ্য দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, জামায়াতের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দরকার তাদের চিন্তা-চেতনা-রাজনীতির বিরুদ্ধে মতাদর্শিক রাজনীতি ও সংস্কৃতির সংগ্রাম করা। এটি দীর্ঘমেয়াদী কাজ। এ ব্যাপারে সরকার বা কোনো পক্ষ থেকেই কার্যকর কোনো তৎপরতা আমরা দেখছি না। যে কারণে যুদ্ধাপরাধে সাজা পাওয়ার পরেও তাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি এখনো অনেকখানি অটুট থেকে যাচ্ছে।
সাইফুল হক বলেন, জামায়াত যে নামেই রাজনীতি করুক না কেন, তাদের প্রথম কাজ হবে- একাত্তরের বিতর্কিত ভূমিকার জন্য দেশবাসীর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করা। তবে একাত্তরের অপরাধের উত্তরাধিকারটা নিয়েই তাদের চলতে হবে। শীর্ষ নেতৃত্বের ফাঁসি হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে জামায়াত দুর্বল হয়ে পড়ছে। নতুন নেতৃত্ব এলেও সাংগঠনিক কাঠামোর খুব বেশি পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না।
আদালতে নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় ভবিষ্যতে এই নামে ও বর্তমান প্রতীকে তাদের রাজনীতি করা দুরূহ। তবে নেতৃত্বে নতুন যারা আসবেন তাদের কর্মকৌশলই জামায়াতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তারা ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে রাজনীতিতে টিকে থাকতে চাইলে সেটাও অনিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যাপার। এমনটাই মনে করেন ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী