বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৩১ পূর্বাহ্ন

Notice :

জাতীয় বাজেটে কৃষকের স্বার্থের প্রতিফলন ঘটছে না

অমিত রঞ্জন দে ::
জাতীয় বাজেট ঘোষণা করার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। বাজেট প্রণেতা, বাজেট চিন্তক, কর্মসূচি আয়োজক, গণমাধ্যমকর্মী সকলের মধ্যে একটা সাজ সাজ অবস্থা বিরাজ করছে। অন্যদিকে বাজেটের আগে-পরে প্রতিবছরই নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে যাদের জীবন বিপর্যস্ত হয় তাদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। না জানি বাজেট পরবর্তী সময়ে আবার কি দুর্ভোগ অপেক্ষা করেছে। এরকম একটি সময়ে জাতীয় বাজেটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত কৃষি বাজেট নিয়ে কথা বলছি। জাতীয় বাজেট যেমন একটি রাষ্ট্রের বাৎসরিক আয়-ব্যায়ের হিসাব, ঠিক তেমনিভাবে এর মধ্যদিয়ে তার উন্নয়ন নীতি-দর্শনের প্রায়োগিক প্রতিফলনও ঘটে থাকে। সরকারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ২৪ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে এ হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং দেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার অঙ্গিকার রয়েছে এ সরকারের।
ইতিমধ্যে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে এবং ২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এটিই এখন একমাত্র পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। বৈশ্বিক পর্যায়েও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) নির্ধারিত হয়েছে এবং তা পূরণে বাংলাদেশ সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। এরকম একটি যুগসন্ধিক্ষণে জাতীয় বাজেট খুবই গুরুত্ব বহন করে।
জাতীয় বাজেটের কৃষিখাত নিয়ে আলোচনা করছি তার মূল কারণ হলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত এবং এই খাতেই দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে। যদিও গত কয়েক দশকে আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে। জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান কমছে, শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপরও বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৬৪ ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা জরুরি। কারণ কৃষিকে কেবল কৃষি হিসেবে দেখলে চলবে না। একে কেবলই জিডিটি’র মাপকাঠিতে বিবেচনা করলেই হবে না। কৃষির সাথে আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি জড়িয়ে রয়েছে। জড়িয়ে আছে আমার পরিবেশ ও প্রতিবেশের উৎকর্ষতার বিষয়সমূহ। সেক্ষেত্রে সরকারের নীতি-কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মাননীয় অর্থমন্ত্রী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমাদের সরকারের কৃষিবান্ধব নীতিকৌশলের প্রভাবে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংস¤পূর্ণতা অর্জন করেছে। নিজেদের চাহিদা পূরণ করে আমরা নানা কৃষিপণ্য রপ্তানি করছি। আমরা এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই।’
প্রথমত বলা দরকার, বাংলাদেশ এখনো খাদ্য স্বয়ংস¤পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনি, অন্যতম খাদ্যশস্য ধান বা চালে স্বয়ংস¤পূর্ণতা অর্জন করেছে। এই স্বয়ংস¤পূর্ণতা অর্জন করতে গিয়ে আমাদের কৃষি ক্রমান্বয়ে যন্ত্রনির্ভর হচ্ছে, নির্ভরতা বাড়ছে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও সেচের উপর। যা আমার পরিবেশ-প্রতিবেশের বিপন্নতাকে আরো ঘনিভূত করে তুলছে। এরপরের বিষয় হলো, সরকার যে ধারাবাহিকভাবে কৃষিপণ্য রপ্তানির কথা বলছেন, তা কি তারা ভেবে বলেছেন? এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে জনগণের পর্যাপ্ত পরিমাণ সুষম খাদ্য প্রাপ্তির বিষয়টি আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে কি না? পাশাপাশি এখন পর্যন্ত দেশের খাদ্য চাহিদার সিংহভাগ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা পূরণ করে আসছে। রপ্তানি করার নীতির মাধ্যমে তা বিঘিœত হবে কি না? এর ফলে বড় কৃষক বা বড় পুঁজির মালিক রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনে বেশি মনোযোগী হবে। ফলে তা একদিকে যেমন আমাদের খাদ্য শৃঙ্খলায় বিঘœ তৈরি করবে অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সাফল্যকে পদদলিত করে কর্পোরেট কৃষিকে প্রণোদনা যোগাবে।
বিগত বছরগুলোতে বাজেটের আকার যে পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে তার সঙ্গে কৃষিখাতের বরাদ্দ তুলনা করলে এক বঞ্চনার চিত্র ভেসে ওঠে। আমরা দেখতে পাই যে, স্বাধীনতার পর কৃষিখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয় ২০০৭-০৮ অর্থবছরে, যা ছিল মোট বাজেটের ৬.৫৭ শতাংশ। এরপর ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ কমতে থাকলেও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কৃষিখাতে বরাদ্দ একটু বেড়ে মোট বাজেটের ৫.৫১% হয়। কিন্তু ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে আবার তা কমতে থাকে এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এখাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ৪.৩%। যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনি¤œ।
সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের এককপ্রতি খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তার সাথে সঙ্গতি রেখে কৃষিপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে না। কৃষিতে ভর্তুকি প্রদানের ক্ষেত্রেও বরাদ্দ কমেছে। অথচ এ সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছে ৭.৮%। সুতরাং কৃষিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বিষয়টি যদি এভাবে ভাবা হয় তাহলে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা ক্রমশ বিনিয়োগের ক্ষমতা হারাবে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে।
এবার আসা যাক গুরুত্বের বিবেচনায় কৃষি বাজেট প্রসঙ্গে। বাজেটে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহের ‘স¤পদ সঞ্চালনা’ অধ্যায়ের দিকে তাকালে দেখতে পাব : ১) ২০১২-১৩ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরেই উপস্থাপন করা হয়েছিল; যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নয় নম্বরে উপস্থাপিত হয়েছে। ২) ১২-১৩ অর্থবছরে এ খাতটিকে সাতটি উপখাতে উপস্থাপন করা হয়েছিল; যা ১৩-১৪ অর্থবছরে পাঁচটি উপখাতে উপস্থাপিত হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা মাত্র দুটি উপখাতে বিবৃত করা হয়েছে। জানিনা আসন্ন বাজেটে কৃষিখাতের জন্য কোনো উপখাতই বরাদ্দ থাকবে কিনা? ৩) ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কর্তৃক উত্থাপিত কৃষি বাজেটের শুরুতে বলা হয়েছিল, ‘কৃষি বাংলাদেশের প্রাণ, কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।’ অর্থাৎ কৃষি এবং কৃষক উভয়কেই সামগ্রিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে তার সু¯পষ্ট কোন প্রতিফলন নেই। ৪) অর্থমন্ত্রী কৃষিখাতে বিগত বছরে উদ্ভাবনমূলক যে সমস্ত কর্মকান্ডের উল্লেখ করেছেন তারমধ্যে অন্যতম হলো- কৃষিবীমা প্রবর্তন, কৃষি বিপণন দল ও কৃষক ক্লাব গঠন এবং চিনির বিকল্প হিসেবে সুগারবিট চাষ। কিন্তু চলমান বাজেটে কৃষিবীমাসহ উল্লিখিত বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পরিলক্ষিত হয় নি। ২০১৫ সালের শুরুতেই টানা ৭২ দিনের হরতাল, অবরোধে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠে। এ সময় খাদ্য বোঝাই ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয় হরতাল-অবরোধ আহবানকারীরা। সরকার সেখানে ভর্তুকি প্রদান করেছেন। তবে সে ভর্তুকির টাকা কোনো কৃষক পায়নি, পেয়েছে গাড়ির মালিক। আমরা লক্ষ করেছি এই ধরনের জ্বালাও-পোড়াও এর কারণে গার্মেন্ট সেক্টরের শিপমেন্ট বন্ধ থাকলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে গার্মেন্ট মালিকদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে শ্রমিকরা লাভবান হতে পারেনি। এরকম আরো অনেক কারণেই বা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে কৃষি এবং কৃষক দুইই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু সেখানে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক বা শ্রমজীবীদেরকে সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো পরিকল্পনা বা বাজেটে বরাদ্দ থাকে না। তবে কি আমরা যাদের শ্রমে-ঘামে দেশের উন্নয়নের চাকা সচল রয়েছে তাদেরকে পাস কাটিয়ে চলার চেষ্টা করছি এবং ক্রমান্বয়ে একটি লুণ্ঠনবাদী ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছি? এই ব্যবস্থা অব্যাহত রেখে ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার যে স্বপ্ন তা কি বাস্তবায়িত হবে?
আমরা আরো লক্ষ্য করছি, ক্রমেই কৃষিজমি সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। রাস্তার দু’ধার দিয়ে কৃষিজমি দখল করে গড়ে উঠছে বড় বড় ভবন, ইটভাটা, শিল্প-কলকারখানা। ২০১২ সালে ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১২’-এর খসড়া প্রণীত হয়েছিল, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু তা এখনো খসড়া আকারেই রয়ে গেছে। প্রতি বছরের বাজেট বক্তৃতায় তা চূড়ান্ত করার কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা থাকে না আর আইনটি বছরের পর বছর খসড়া অবস্থায়ই পড়ে থাকে। এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে কি আগামী বাজেটেও আমরা একই কথার পুনরাবৃত্তি শুনবো?
রাস্তার দু’ধার দিয়ে কৃষিজমি ব্যবহার করে যেসব শিল্প-কলকারখানার গড়ে ওঠছে তার ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই এবং এ সব শিল্প-কারখানার সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের কৃষি বা সংস্কৃতির কোনো স¤পর্ক নেই। হিমাগারের অভাবে প্রতিবছর আলুর মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে আলু নষ্ট হচ্ছে। কৃষক বস্তা বস্তা আলু দাম না পেয়ে রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে। উত্তরবঙ্গের টমেটো চাষীরা টমেটো রাস্তায় নষ্ট করছে। অথচ এ খাতে খুব সামান্য বিনিয়োগে এগুলির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত হতে পারে। গড়ে উঠতে পারে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্প-কলকারখানা বা ম্যানুফ্যাকচারিং কো¤পানি। কিন্তু বাজেট পরিকল্পনায় সে ব্যবহারের কোনো দিকনির্দেশনা নেই। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হলো, মাননীয় অর্থমন্ত্রী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় ২০নং অনুচ্ছেদে কৃষকদের উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান বিষয়ে উল্লেখ করেছিলেন। এটি অবশ্যই একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সরকারের জন্যেও এটা একটা গর্বের বিষয়। দেশ-বিদেশে এটা প্রশংসিত হয়েছে। ভারত সরকার বাংলাদেশের আদলে কৃষি সহায়তা কার্ড প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এ সময়ে নারী কৃষকদের কৃষিকার্ড প্রাপ্তির মতো আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার বাস্তবচিত্র কি, এ থেকে কি তারা কোনোভাবে উপকৃত হয়েছেন? গত এপ্রিল ২০১৫ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় কয়েকজন কৃষকের সাথে ছোট-দলে আলোচনা করতে গিয়ে দেখেছি সেখানে বেশ কয়েকজন নারী কৃষক কৃষিকার্ড পেয়েছেন, যাকে আমরা সাফল্যের আরেকটি সোপান হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। তবে এই কার্ডটি ইস্যু করা হয়েছে জুন ২০১৪ সালে কিন্তু এপ্রিল ২০১৫তেও তাদের কার্ডে একটি আঁচড়ও লাগেনি। এপ্রিল ২০১৬ তেও এদের বেশ কয়েকজনের কাছে খবর নিয়ে দেখা জানা গেছে যে, এ কার্ডের মাধ্যমে তারা এখনো কোনো ধরনের সহায়তা পায়নি।সরকার বাজেটে সার, ডিজেল ও সেচের উপর ভর্তুকি প্রদান করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এগুলো সরবরাহ করার ক্ষেত্রে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড ব্যবহার করা হয়নি কেন? যদি এগুলো ব্যবহারই না করা হয় তাহলে তা কৃষকদের মাঝে বিতরণ করে লাভ কি? প্রকৃতপক্ষে এই ভর্তুকির সুফল ভোগ করেছে কিছু কিছু সেচযন্ত্রের মালিক ও সারের ডিলার। যারা টাকার বিনিময়ে ব্যবসা করেন। অর্থাৎ এখাতে বরাদ্দকৃত বাজেটের পুরোটাই চলে গেছে ইনপুট বা উপকরণ ব্যবসায়ীর ঘরে। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার তা হলো ব্যবসায়ী এ খাতে ততক্ষণ বিনিয়োগ করবে, যতক্ষণ সে এখান থেকে লাভ করতে পারবে। তারপর সে এ খাত থেকে সরে দাঁড়াবে। তাহলে সে সময়ের খাদ্য নিরাপত্তার কি হবে? আমরা যদি সত্যিকার অর্থে কৃষি এবং কৃষকের স্বার্থকে বড় করে দেখে একটি স্থায়ীত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই এবং জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই তাহলে কৃষককে উৎপাদন ও বিপণন উভয় পর্যায়েই কষ্ট শেয়ারিং করতে হবে, ভর্তুকি প্রদান করতে হবে এবং প্রদেয় ভর্তুকির টাকা যে কোনো মূল্যে সরাসরি কৃষক বা উৎপাদকের নিকট পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে এ ভর্তুকি যেন কৃষিখাতে নিয়োজিত সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী কৃষকের কাছেও সমভাবে পৌঁছায়। বিশ্বের অনেক মোড়ল রাষ্ট্রের প্রতিভূগণ কৃষি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহারের পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। প্রশ্ন করতে চাই তার নিজের দেশের কৃষি থেকে কি তারা ভর্তুকি প্রত্যাহার করেছেন?
আরেকটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই তাহলো, কৃষিখাতে কর্মরত কৃষকদের বয়স বেড়ে যাচ্ছে। তরুণরা আর কৃষি কাজে আকৃষ্ট হচ্ছে না। কারণ কৃষক হিসেবে পরিচয় দেয়াটা তার কাছে সম্মানজনক না, আবার এটি কোনো লাভজনক পেশাও নয়। বরং উৎপাদন শেষে লোকসান গুনতে হয় তাকে। এবারের বোরো মৌসুমে ধানের বা¤পার ফলন হয়েছে। তারপরও কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে। কারণ মণপ্রতি ধান উৎপাদনে স্থানভেদে খরচ হয়েছে ৬৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা। কিন্তু তাকে বিক্রি করতে হচ্ছে ৪৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য ৮৮০ টাকা দরে ধান ক্রয়ের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু তার সাথে কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার কোনো স¤পর্ক নেই। কারণ সরকার সরাসরি কৃষকের নিকট থেকে ধান কিনছে না। তারা চাতাল মালিকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করছে। পাশাপাশি তরুণরা তার ইচ্ছেমত চাষাবাদ করতে পারে না তার নিজের কোনো জমি এবং ঋণগ্রহণের কোনো সুযোগ না থাকায়। তারজন্য সংগঠন করারও কোনো সুযোগ নেই। এ সমস্ত অসঙ্গতি তরুণদের কৃষিকাজ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি আগেও বলেছি, কৃষিকে শুধু জিডিপি’র মাপকাঠিতে বিবেচনা করলে হবে না তাকে আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও স্থায়ীত্বশীলতার বিষয়সমূহ বিবেচনায় নিয়ে নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে। আর সেক্ষেত্রে জাতীয় বাজেট ও অর্থবছরের পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় এবিষয়গুলোতে বিশেষভাবে নজর দিতে না পরলে অচিরেই আমাদের কৃষি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মাননীয় অর্থমন্ত্রী ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘কৃষি গবেষণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।’ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটেও বলা হয়েছে, ‘কৃষিখাতে অগ্রগতির মূলে রয়েছে উন্নত কৃষি গবেষণা এবং সার্বিক কৃষি গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’ কিন্তু বাজেট কাঠামোতে তার কোনো প্রতিফলন নেই। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের জন্য যেখানে বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো ১১৩ কোটি ৮৪ লাখ ১২ হাজার টাকা। যদিও সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৯২ কোটি ৭২ লাখ ২ হাজার টাকা। আবার ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা কমে ৫৫ কোটি ১৪ লাখ ৬০ হাজার টাকায় নেমে আসে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতের বরাদ্দ আরো কমিয়ে ১৫ কোটি ১০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখাতে ধারাবাহিকভাবে যে হারে বাজেট কমছে তাতে জানি না ২০১৬-১৭ এর বাজেটে কৃষি গবেষণায় এক টাকাও বাজেট থাকবে কিনা? উৎপাদনের উপকরণ, বিশেষ করে বীজ ও কীটনাশক সবকিছুই বহুজাতিক কো¤পানির দখলে চলে যাচ্ছে। নতুন নতুন গবেষণার মধ্য দিয়ে বীজের মালিকানা যদি কৃষকের হাতে ধরে রাখা না যায় তাহলে অচিরেই কেনিয়া, কলম্বিয়া ও উরুগুয়ের মত আমাদের দেশেও কো¤পানিগুলিই কৃষিখাতে আধিপত্য বিস্তার করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যেই বীজের ব্যবসায় নেমে পড়েছে প্রাণ, এসিআই, কাজী এ- কাজী, ব্র্যাক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কো¤পানিসহ তামাক কো¤পানিগুলো।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাঠের কৃষির বাইরেও আমাদের মৎস্য, পোল্ট্রি ও প্রাণিস¤পদের ব্যবস্থাপনা ও এ খাতের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সেখানে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বা উদ্যোগ নিয়ে এখানে কিছু কথা বলতে চাই। এক কথায় বলা যায় এ খাতের অবস্থা আরো বেশি ভয়াবহ।
বিশেষকরে আমাদের পোল্ট্রি খামারগুলো গড়ে উঠেছে ব্যক্তিউদ্যোগে এবং সেখানে বিনিয়োগ করেছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজির মালিকগণ। এরাই এই খাতকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এখাতে সরকারের বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু সেখানে সরকারের কোনো ধরনের বিনিয়োগ বা প্রণোদনা নেই। বরং নতুন করে এগুলিকে করের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। পোল্ট্রি শিল্পের আয়, পোল্ট্রি ফিড, গবাদী পশু, বীজ, দুধ, ব্যাঙ, তুত চাষ, মৌমাছি চাষ, রেশম চাষ, ছত্রাক চাষ, হাস-মুরগী, চিংড়ী ও মাছের হ্যাচারির উপর ৩% থেকে ১৫% হারে কর ধার্য করা হয়েছে। আমি জানিনা এগুলি করার পেছনে কি ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে।
এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আজকে রাজনীতি যেমন রাজনীতিবিদের কাছে নেই, জলা নেই জেলের দখলে, বন নেই বনজীবী অধিকারে ঠিক তেমনি কৃষিও আর কৃষকের কাছে থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী