শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ০৮:০৭ পূর্বাহ্ন

Notice :

মানুষ জনবান্ধবধর্মী পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে

পত্রিকায় সংবাদ এসেছে, অর্থপ্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান সরকারি অফিসগুলোতে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে যথোচিত আচরণ না করার পরিপ্রেক্ষিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আর এই করে তিনি নিজের অজানতেই সাধারণ মানুষের দরদি বন্ধু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জনতার পক্ষ থেকে তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন।
বাংলাদেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এ সময়ে তাঁর জনমানুষের পক্ষে ইতিবাচক কিংবা অনুকূল আচরণ অর্থাৎ সরকারি অফিসগুলোর চালচলনের আধুনিকায়ন সম্পর্কে অভিমতকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা অপরিহার্য। তাঁর এইরূপ জনবান্ধব চিন্তা-চেতনা দেশের প্রতিটি রাজনীতিকের মধ্যে, বিশেষ করে বর্তমান ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারক ও সকল স্তরের কর্মীদের মধ্যে, বিকাশ লাভ করুক এই কামনা করি। আর সকল সরকারি, বেসরকারি অফিসের সকলে, সকল স্তরের কর্মীরা, হয়ে উঠুন আচরণগত দিক থেকে জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু।
বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বিন্যাসগত অবস্থা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় খুব একটা ব্যতিক্রমী কিংবা আলাদা কীছু নয়, বলতে গেলে, এক ছাঁচে গড়া কিংবা এই যাকে বলে এক ক্ষুরে মাথা কামানো। এ দেশে অফিসব্যবস্থাপনা বরং উন্নত বিশ্বের উত্তরাধুনিক অফিসব্যবস্থাপনার চেয়ে মানে-গুণে পশ্চাৎপদ। যদিও মূলত আদর্শিক দিক থেকে একই নীতিপদ্ধতির অনুসারী। প্রকৃতপ্রস্তাবে বিশ্বের দেশে দেশে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিসমষ্টিকে নিয়ে একটি বিশেষ তন্ত্র গড়ে উঠেছে। এটাই সত্যি। বলা হয়, এই তন্ত্রটি সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা ও অনেকটা বলতে গেলে তৃণমূলসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কিন্তু জনগণের মাথার উপরে প্রতিষ্ঠিত, রাষ্ট্র বা সরকার নির্ধারিত বিশেষ বিশেষ কাজের দায়িত্ব এর উপর ন্যস্ত। এটি বিশেষ সুবিধাভোগী প্রশাসন পরিচালনার একটি ব্যবস্থা বা তন্ত্র বিশেষ।
সমাজবিজ্ঞানীদের অভিমত, সমাজে শ্রেণিপ্রপঞ্চের উদ্ভবের সঙ্গে এইরূপ তন্ত্রের উদ্ভব ঘটেছে। মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে সর্বপ্রথম এইরূপ সামাজিক তন্ত্রের প্রাদুর্ভাব ঘটে সর্বপ্রথম দাসতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অভ্যন্তরে। সামন্ততন্ত্রে সেটা অব্যাহত থাকে। ধারাবাহিকভাবে টিকে থেকে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার অভ্যন্তরে বর্তমান বিশ্বায়নের কালে সেটা হয়ে উঠেছে বিশাল আকৃতির, যাকে বলে দানবিক এবং সেই সঙ্গে তথপ্রযুক্তির শক্তিতে সুসমৃদ্ধ। জন্মলগ্ন থেকে এর প্রধান প্রধান চারিত্র্যলক্ষণ হলোÑ প্রাণচাঞ্চল্যহীনতা, দীর্ঘসূত্রতা, রক্ষণশীলতা, অনুষ্ঠানসর্বস্বতা ও সুচতুর প্রতারণাপ্রবণ। এই ব্যবস্থাতন্ত্রের প্রতারণা পর্যায়ের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো, অতিসম্প্রতি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় বোরো ফসলহানির বিষয়ে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রস্তুত ও দাখিলকৃত হিসেব। যেখানে ফসলের সিংহভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সর্বসাধারণের হিসেব অন্তত তাই বলে, যা বেসরকারি বা জনপ্রতিনিধিদের হিসেবে কীছুতেই ৮০ শতাংশের কম নয়, সেখানে কৃষি অধিদপ্তরের হিসেবমতে ফসলহানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ। অথচ সংশ্লিষ্ট কৃষকরা মনে করেন, প্রতি মৌসুমেই ১৫ শতাংশ ফসলহানি স্বাভাবিক। হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক বা প্রতিবেশগত বৈশিষ্ট্যই এরকম।
দেশে বিদ্যমান প্রশাসনব্যবস্থাপনার আচরণগত বাস্তবতার প্রতি অর্থপ্রতিমন্ত্রীর অসন্তোষ, যা সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর অন্তরের অকৃত্রিম বান্ধবতার প্রকাশ, তা প্রকাশ পর্যন্তই সীমিত থেকে যাবে, যদি না তিনি বিদ্যমান ওই ব্যবস্থাটাকে জনগণের পক্ষে আমূল কিংবা আপাদমস্তক বদলে দিতে না পারেন। জানি তাঁর একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। সম্ভব তখনই যখন সমাবেত প্রচেষ্টায় একটি সামাজিক-রাজনীতিক পরিবর্তন সংঘটিত হবে। যে পরিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান প্রশাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে চূর্ণ হবে, তার ধ্বংসস্তূপের উপর একটা নতুন ও জনবান্ধব প্রশাসনতন্ত্র তৈরি হবে। মানুষ সে জনবান্ধবধর্মী পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে। আর সেটা কেবল অফিসব্যবস্থাপনা নয় সেটা হবে সমগ্র সমাজের সার্বিক ও আমূল পরিবর্তন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী