বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৫৫ অপরাহ্ন

Notice :

বদরপ্রধান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর

সুনামকণ্ঠ ডেস্ক ::
ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে দেশের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীকে। মঙ্গলবার (১০ মে) দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মঞ্চে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির এই ফাঁসি কার্যকরের খবর নিশ্চিত করেন।
কারাগারের সামনে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের উদ্দেশ্যে সিনিয়র জেল সুপার বলেন, রাত ১২টা ১ মিনিটেই মতিউর রহমান নিজামীকে ফাঁসির মঞ্চে তুলে গলায় ফাঁস পরানো হয়। আর এরপর ফাঁসি দিয়ে ঠিক রাত ১২টা ১০ মিনিটে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হলো সে সময়কার ‘মইত্যা রাজাকার’ নামে পরিচিত নিজামীকে।
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন এই নিজামী।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড এবং হত্যা-গণহত্যা ও ধর্ষণসহ সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব) দায়ে ফাঁসির দন্ড দেওয়া হয় তাকে। সেই দন্ডই কার্যকর করা হলো মঙ্গলবার রাতে।
স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এটি হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার পঞ্চম ফাঁসির রায় কার্যকর, যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত করা হলো জামায়াতের আমির তথা শীর্ষনেতার। এর আগে ফাঁসি কার্যকর হওয়া অন্য চার শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর মধ্যে তিনজনই জামায়াতের এবং অন্যজন ছিলেন বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতা।
বুধবার ভোরে নিজামীর মরদেহ পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মন্মথপুর গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তার নামাজে জানাজা ও দাফন স¤পন্ন হবে।
জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের (জমিয়তে তালাবা) নিখিল পাকিস্তান সভাপতি (নাজিমে আলা) হিসেবে নিজামী একাত্তরে ছিলেন আলবদর বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধিতাকারী জামায়াতের হয়ে তার নেতৃত্বেই বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ নৃশংসতম নারকীয় যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করে এই বাহিনী। আর ফাঁসি হওয়া পর্যন্ত ছিলেন জামায়াতের আমির। হয়েছিলেন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী।
একাত্তরের মূল ঘাতক ও জামায়াতের শীর্ষনেতা এবং সাবেক মন্ত্রীর ফাঁসি কার্যকরের ঘটনায় দেশের জন্য তাই রচিত হলো আরও একটি নতুন ইতিহাস।
যেভাবে ফাঁসি কার্যকর :
রিভিউ রায়ের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ফাঁসি দড়ি এড়াতে নিজামীর সামনে একটাই পথ ছিলো রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়া। মঙ্গলবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে জানা যায়, তিনি ক্ষমা চাননি। এর আগে বিকেলেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কারাগারে পৌঁছায় নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করতে সরকারের নির্বাহী আদেশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সে আদেশও তাকে পড়ে শোনানো হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় ফাঁসি কার্যকরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। রাতেই নিজামীর স্ত্রী-পুত্র-পরিজনকে শেষবারের মতো তার সঙ্গে দেখা করার জন্য ডেকে পাঠায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। রাত ৭টা ৫০ মিনিট থেকে ৯টা ২২ মিনিট পর্যন্ত ২৬ জন স্বজন কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে শেষ সাক্ষাৎ করেন। এরপর কনডেম সেলে গিয়ে নিজামীকে গোসল করিয়ে রাতের খাবার দেওয়া হয়।
স্বজনদের সাক্ষাতের পর কারাগারের মাওলানার মাধ্যমে তওবা পড়িয়ে নেন কারা কর্তৃপক্ষ। এ সময় তার কাছ থেকে তার শেষ কোনো কথা থাকলে তাও শুনে নেন কারা কর্মকর্তারা।
এরপর ধর্মীয় রীতি অনুসারে নিজামীকে তওবা পড়ান কেন্দ্রীয় কারাগারের পুকুরপাড় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মনির হোসেন। এর আগেই তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা স¤পন্ন করেন কারা চিকিৎসক ডা. বিপ্লব কান্তি পাল ও ডা. আহসান হাবীব।
সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির রাতেই তার ফাঁসি কার্যকর করা হবে বলে নিজামীকে জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, এটাই আপনার শেষ রাত। এখন আপনাকে তওবা পড়তে হবে।
মাওলানা মনির হোসেন তাকে বলেন, আপনার কৃতকর্মের জন্য আদালত আপনাকে ফাঁসির রায় দিয়েছেন। আপনি একজন মুসলমান ব্যক্তি। এ কারণে আপনি আল্লাহ’র এই দুনিয়ায় কৃতকর্মের জন্য তওবা করেন। এরপর ইমাম সাহেব তাকে তওবা পড়ান। তওবা পড়ার মিনিট চারেক পর কনডেম সেলে জল্লাদরা আসেন। রাত পৌনে বারটার দিকে তারা নিজামীকে নিয়ে যান ফাঁসির মঞ্চে। আগে থেকেই মঞ্চের পাশে রাখা ছিল মরদেহ বহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স। ফাঁসির মঞ্চে নেওয়ার পর তার মাথায় পরানো হয় একটি কালো রংয়ের টুপি। এই টুপিটিকে বলা হয় ‘যমটুপি’।
ফাঁসির মঞ্চে তোলার পর নিজামীর দুই হাত পেছন দিকে বাধা হয়। এ সময় ফাঁসির মঞ্চের সামনে উপস্থিত ছিলেন কারা কর্তৃপক্ষ, সিভিল সার্জন ও একজন ম্যাজিস্ট্রেট। ফাঁসির মঞ্চে প্রস্তুত ছিলেন জল্লাদও। মঞ্চে তোলার পর তার দুই পাও বাধা হয়। পরানো হয় ফাঁসির দড়ি।
কারা কর্তৃপক্ষের হাতে ছিল একটি রুমাল। রুমালটি হাত থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জল্লাদ ফাঁসির মঞ্চের লিভারে টান দেন। লিভারটি টান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফাঁসির মঞ্চের নিচে চলে যান নিজামী। এ সময় তিনি মাটি থেকে ৪-৫ ফুট শূন্যে ঝুলে থাকেন। এতে মুহূর্তের মধ্যেই তার ঘাড়ের হাড় ভেঙ্গে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়।
মৃত্যুদন্ড কার্যকরের পর মরদেহ তোলার পর কারা চিকিৎসক ডা. বিপ্লব কুমার ও ডা. আহসান হাবিব, ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন ডা. আবদুল মালেক মৃধার তত্ত্বাবধানে ময়না তদন্ত স¤পন্ন করেন। এ সময় নিজামীর ঘাড়ের রগ কাটা হয়। নিজামীর ফাঁসির লিভারে টান দিয়ে ঐতিহাসিক এ দায়িত্ব পালন করেন প্রধান জল্লাদ রাজু। অন্য দু’জন জল্লাদ ছিলেন তার সহযোগী। জল্লাদ রাজু এর আগে মুজাহিদ ও কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকরেও জল্লাদের ভূমিকা পালন করেন।
ফাঁসি কার্যকর করার সময় ফাঁসির মঞ্চে ও কারাগারের ভেতরে ছিলেন অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. ইকবাল, ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট) মো. সালাউদ্দিন, ঢাকার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল মালেক মৃধা, ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ, কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির, জেলার নেসার আলম, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) শেখ নাজমুল আলম, র‌্যাবের পক্ষ থেকে একজন এবং ডেপুটি জেলার। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শেখ মারুফ হাসানের নেতৃত্বে পুলিশের ১২ সদস্যের দলও ছিলেন কারাগারের ভেতরে-বাইরে।
নিজামীর ফাঁসির রায় কার্যকরকে কেন্দ্র করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সন্ধ্যায় জেলখানার মূল ফটক ঘিরে ফেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চারদিকে তিন স্তরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার বিভিন্ন বাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। পুরো কারাফটক জুড়ে ছিলেন ২২ প্লাটুনের মতো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। পুলিশের পাশাপাশি ছিলেন র‌্যাব এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ। বন্ধ করে দেওয়া হয় কারাগারের সামনের সড়কে সাধারণ যান চলাচল ও আশেপাশের সমস্ত দোকানপাট।
বদর প্রধানের যতো অপরাধ :
নিজামীকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড এবং হত্যা-গণহত্যা ও ধর্ষণসহ সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) প্রমাণিত ৮টি মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে ৪টিতে ফাঁসি ও ৪টিতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ৩টিতে ফাঁসি ও ২টিতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। অন্য তিনটিতে চূড়ান্ত রায়ে দন্ড থেকে খালাস পেয়েছেন নিজামী, যার মধ্যে একটিতে ফাঁসি ও দু’টিতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ ছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নিখিল পাকিস্তানের সভাপতি হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন নিজামী। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা ছাড়াও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) হিসেবে আলবদর বাহিনী ও ছাত্রসংঘের অপরাধের দায়ও তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে বিচারিক ও আপিল আদালতের রায়ে। নিজামীর বিরুদ্ধে মোট ১৬টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ৮টি অর্থাৎ ১, ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৮ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ে। প্রমাণিত চারটি অর্থাৎ সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়িসহ দু’টি গ্রামে প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে গণহত্যা ও প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ (২ নম্বর অভিযোগ), করমজা গ্রামে ১০ জনকে গণহত্যা, একজনকে ধর্ষণসহ বাড়ি-ঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ (৪ নম্বর অভিযোগ), ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে গণহত্যা (৬ নম্বর অভিযোগ) এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড ও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (১৬ নম্বর অভিযোগ) দায়ে নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৪ নম্বর অভিযোগের দায় থেকে নিজামীকে খালাস দিয়ে বাকি তিনটিতে ফাঁসি বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
অন্য চারটি অর্থাৎ পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিন হত্যা (১ নম্বর অভিযোগ), মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর ক্যা¤েপ নিয়মিত যাতায়াত ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র (৩ নম্বর অভিযোগ), বৃশালিখা গ্রামের সোহরাব আলী হত্যা (৭ নম্বর অভিযোগ) এবং রুমী, বদি, জালালসহ সাত গেরিলা যোদ্ধা হত্যার প্ররোচনার (৮ নম্বর অভিযোগ) দায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ১ ও ৩ নম্বর অভিযোগের দায় থেকে চূড়ান্ত রায়ে খালাস পেয়েছেন নিজামী। বাকি দু’টিতে তার যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ বহাল রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী