শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ১১:২৮ পূর্বাহ্ন

Notice :

আজ মহান মে দিবস : পিছিয়ে নেই হাওরের নারী শ্রমিকরা

বিশেষ প্রতিনিধি ::
‘বিয়ার আগে মা-বাবার লগে কায়-কামে সাদ দিতাম। আগুন মাইয়া ও বইশাখ মাইয়া খাজে (কাজে) ধানখলায় ধান লাড়া, শুকানো, ধান উগারে তোলাসহ হখল ধরনের খাজ ভাই বইনেরা মিইল্যা খরতাম। বিয়ার পরে শ্বশুর বাড়ি আইয়াও একই খাজ খররাম’। বলছিলেন, সুনামগঞ্জের দেখার হাওরপাড়ের গ্রাম হালুয়ার গাওয়ের ষাটোর্ধ্ব কিষাণী আছিয়া বেগম। শুধু আছিয়া বেগমই নয় হাওরাঞ্চলের নারীরা বিয়ের আগে এবং পরে বোরো ও আমন মওসুমে ধানগাছ তোলা থেকে শুরু করে জমিতে ধান লাগানো, গোলায় ধান তোলা, ধানখলায় ধান শুকানোসহ সংসারের প্রায় সকল কাজই করতে হয় তাদের। এছাড়া অনেক নারী শ্রমিক হিসেবেও এসব কাজ করে থাকেন।
আলাপ করে জানা গেলো, দৈনন্দিন সাংসারিক কাজের পাশাপাশি এসব কাজ করতে গিয়ে তাদের বিরক্তি ধরে না। বরং নিজের কাজ মনে করেই পরিবারের ভালোর জন্য স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে তাঁরা কাজ করেন। হাওরের সোনার ফসল ফলানোর সঙ্গে তাঁদের শ্রমঘামও জড়িত। কৃষি পরিবারের নারীরা স্বেচ্ছায় নিজের কাজ মনে করে এসব করলেও হাওরাঞ্চলের দিনমজুর নারী শ্রমিকরা অন্য শ্রমিকের মতো এসব ভারি কাজে সমান মজুরি পাননা।
দেখতে দেখতে গত সপ্তাহে তলিয়ে যায় সুনামগঞ্জের অন্যতম বড় হাওর দেখার হাওর। পানি বাড়ছে আর কান্দা (হাওরের কিনার) শ্রেণির জমি থেকে আধপাকা ধান কাটতে সর্বস্বান্ত কৃষককে সপরিবারে সান্ত¡নার জন্য যথসামান্য ফসল তোলতে দেখা যায়। কৃষকের সঙ্গে কিষাণীরাও তাঁদের ছেলে বউ মেয়ে ও স্কুল বয়সী শিশুদের নিয়েও খোরাকি জোগার করতে অনেকে ঘর ছেড়ে চলে এসেছেন।
দেখার হাওরপাড়ের গ্রাম তাজপুরের কিষাণী জোবেদা খাতুন (৫৪)। সপরিবারে তাঁর তলিয়ে যাওয়া ক্ষেত থেকে যে যৎসামান্য ধান তোলতে পেরেছেন তা তোলার জন্য ঘর ছেড়ে এসেছেন তিনি। জোবেদা খাতুন জানান, তাঁর দেড় হাল জমির সব ক্ষেতই তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘ঘরবাড়ি তালা মাইরা, ছেলে মেয়ে লইয়া হাওরের কান্দার জমিন তাকি স্বামীর লগে ধান তোলতে আইছি’। এবার ছেলে মেয়ে নিয়ে কি খাবেন এই ভাবনায় এই কিষাণীর মধ্যে অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধান নাড়তে লাগলেন তিনি।
পার্শ্ববর্তী গোবিন্দপুর গ্রামের কিষাণী বেগম (৩৫) বলেন, ‘ঘরের তাইন (স্বামী) ধান তোলতে আইছন। তাইনের লাগি ভাত লইয়া কিত্তায় (জমি) আইছি’। তিনি জানালেন, বিয়ের পরেই তিনি স্বামী ও তাঁদের ক্ষেতের শ্রমিকদের খাবার নিয়ে হাওরে আসেন। পাশাপাশি গোলায় ধান তোলা পর্যন্ত সময়ে তিনি হাওর ও ধানখলায় রাতদিন অবস্থান করেন। তবে এই সময়ের মধ্যে তাঁকে পরিবারের জন্য রান্নাও করতে হয়। এই অতিরিক্ত কাজ করতে গিয়ে তার কষ্ট হলেও খারাপ লাগে না। তিনি এই কাজকে পরিবারের কাজই মনে করেন। তবে সমাজ এখনো মানসিকভাবে নারীদের এই কাজের মর্যাদা না দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন এই কিষাণী।
ইকবালনগর গ্রামের দিনমজুর নারী শ্রমিক তমিরুন্নেছা জানান, তিনি ফসলি মওসুমে গৃহস্থ বাড়িতে কাজ করেন। এই সময় পুরুষ শ্রমিকরা যে শ্রমমূল্য পায় তার চেয়ে কম দেওয়া হয় তাঁকে। তাঁর মতো অন্য নারী শ্রমিকদেরও একই অবস্থা।
শাল্লা আনন্দপুর গ্রামের কিষাণী ঝরনা দাস (৩৮) জানান, হাওরের কিনারে বাড়ি থাকায় তাঁকে বোরো ফসল মওসুমে হাওরেই কাজ করতে হয়। ধানের চারা তোলা থেকে শুরু করে জমিতে ধান লাগানোসহ আবারো ধানতোলা পর্যন্ত তাঁকে কাজ করতে হয়। তিনি জানান, এভাবে হাওর এলাকার সচ্ছল অসচ্ছল কৃষকসহ সকল পরিবারের নারীকেই এই কাজ করতে হয়। তাঁরা সবাই নিজের কাজ মনে করেই এটি করেন।
সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নিগার সুলতানা কেয়া বলেন, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের নারীরা যুগ যুগ ধরে পুরুষের সঙ্গে হাওরে কাজ করছেন। ফসলি মওসুমে এই চিত্র দেখা যায়। এবার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজেও তাঁরা দিনরাত কাজ করেছেন। তাঁরা এই কাজকে নিজের কাজ মনে করেই দৈনিন্দন কাজের পাশাপাশি সংসারের সুখের জন্য প্রতিটি ফসলি মওসুমে মাঠে কাজ করেন। হাওরাঞ্চলের পেশায় মজুর নারীরা ন্যায্যশ্রমমূল্য পাননা। এই মানসিকতা পরিবর্তন জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী