বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৫৪ অপরাহ্ন

Notice :

জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ : আজিজুস সামাদ ডন

মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদকে নিয়ে কিছু লিখতে বসলে আমার মধ্যে একটা দুঃখবোধ কাজ করে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন স¤পর্কে কতটুকুই আর জানি! আমার জন্মের দুই যুগ আগেই বাবার রাজনীতির শুরু। আর রাজনৈতিক নেতৃত্বে এসেছেন সেই ১৯৪০ সালে, সুনামগঞ্জ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে। আমার জন্মের পরও তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। কারণ, তিনি সময় কাটিয়েছেন হয় স্বৈরাচারের জেলে, নয় তো স্বৈরাচারের দৃষ্টির আড়ালে, আন্ডারগ্রাউন্ডে। আর বাকি সময় জনগণের মাঝে, জনগণকে সংগঠিত করার কাজে। বাবা নিজেও নিজের জীবনী লেখার ব্যাপারে খুবই অনাগ্রহী ছিলেন। ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে থাকাটাই তাঁর বেশি পছন্দ ছিল।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে তিনি ব্রিটিশ সরকারের রুদ্ররোষে পড়েন এবং জেলে নিক্ষিপ্ত হন। তিনি সেই সামান্য কয়েকজন রাজনীতিবিদের মধ্যে একজন, যিনি ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ- তিনটি দেশের জেলেই গিয়েছেন শুধু মানুষের অধিকার আদায়ের দাবি জানানোর কারণে। শুধু ১৯৫৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সংসদীয় সরকারের প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে, একটি জেলার প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসা নিয়ে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। তখন সামাদ আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। সেই সভায় আব্দুস সামাদ আজাদ বললেন, ‘১৪৪ ধারা ভাঙতে পাঁচজনের সমাবেশই যথেষ্ট হলেও ১০ জন হলে নিজেদের শক্তিও বাড়ল, আবার আমরা কোনো অসাধারণ মিছিল-মিটিং করছি তা-ও নয়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা হবে সাধারণ ছাত্রদের চলাফেরায় পুলিশের বাধা, হামলা, গুলি চালানোর শামিল।’ প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে প্রথম ১০ জনের মিছিলটি নিয়ে বের হয়ে আসেন আব্দুস সামাদ আজাদ। ঔপনিবেশিক, স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দৃঢ় চারিত্রিক অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁর মাথার মূল্য নির্ধারিত হয়েছে তিনবার, সব স্থাবর-অস্থাবর স¤পত্তি ক্রোক হয়েছে তিনবার। সবরকম লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে, কোনোরকম রাজনৈতিক স্খলন ছাড়া ৭০ বছর প্রগতিশীল রাজনীতির পতাকা উড়িয়ে বেড়ানোর মতো কজন মানুষ পাওয়া যাবে এ দেশে!
বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, মুক্তিযুদ্ধ হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অন্যতম অংশীদার আব্দুস সামাদ আজাদ। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যারা জেল-জুলুম-মৃত্যুভয় আর ক্ষমতার লোভ উপেক্ষা করে কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন, তিনি তাদের একজন।
আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন একজন পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদ এবং মজ্জাগতভাবে একজন প্রগতিশীল গণতন্ত্রী। প্রায় সারাটা জীবন বিরোধীদলীয় রাজনীতির অংশ হিসেবে থাকলেও রাজপথের পাশাপাশি আলোচনার টেবিলে তিনি ছিলেন দক্ষ। সেজন্যই তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন দেশের একজন অন্যতম সেরা কূটনীতিবিদ হিসেবে। ১৯৮৩, ’৮৭ ও ’৯০-এর আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। সর্বদলীয় বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-পদ্ধতির রূপরেখা প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ভারত বিভাগের আগে থেকেই জ্যোতি বসু, আই কে গুজরালসহ জ্যেষ্ঠ ভারতীয় রাজনীতিবিদরা ছিলেন তার বন্ধুস্থানীয়, সহকর্মী। আর এ দাবি নিয়েই ফারাক্কা বাঁধের পানি সমস্যা সমাধানকল্পে তিনি একটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। তাঁর কথা ছিল একটিই- ভারত যদি নিজ দেশের এতগুলো ভাষা-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য-ইতিহাসকে ধারণ করতে পারে, তবে অবশ্যই অন্য দেশের ভাষা-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য-ঐতিহাসিক স্বকীয়তাকেও সম্মান করতে পারবে। আব্দুস সামাদ আজাদের মতো ত্যাগী নিবেদিত দূরদৃষ্টিস¤পন্ন নেতার বড় প্রয়োজন আমাদের নিরাপদ দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য। আজ ২৭ এপ্রিল প্রয়াত এই জাতীয় নেতার ১১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিন¤্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
[আজিজুস সামাদ ডন : রাজনীতিক, লেখক]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী