বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ০৪:২২ অপরাহ্ন

Notice :

ইতিহাসের বস্তুবাদী ধরণা

=ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন=
সেকেলে বস্তুবাদের অসঙ্গতি, অসম্পূর্ণতা ও একদেশদর্শিতা উপলব্ধি করে মার্কস নিশ্চিত হয়ে উঠলেন যে, ‘বস্তুবাদী ভিত্তির সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানের সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা এবং এই ভিত্তি অনুসারে এই বিজ্ঞানের পুনর্গঠন করা’ আবশ্যক। বস্তুবাদ সাধারণভাবে সত্তা দিয়ে চেতনার ব্যাখ্যা করে, বিপরীতটা নয়, সুতরাং মানুষের সামাজিক জীবনে তা প্রয়োগ করলে সামাজিক সত্তা দিয়ে সামাজিক চেতনার ব্যাখ্যা দাবি করবে বস্তুবাদ। মার্কস লিখেছেন (‘পুঁজি’, খন্ডÑ১) : ‘টেকনলজি উদ্ঘাটিত করছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সক্রিয় সম্পর্ক, তার জীবনের প্রত্যক্ষ উৎপাদনী প্রক্রিয়া এবং সেই সঙ্গে মানুষের সামাজিক পরিস্থিতি এবং তা থেকে উদ্ভূত মানসিক ধ্যানধারণা। মানবসমাজ ও মানব ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রসারিত বস্তুবাদের মূলনীতির সামগ্রিক সূত্র মার্কস তাঁর ‘অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে’ রচনার ভূমিকায় এইভাবে দিয়েছেন :
‘নিজেদের জীবনের সামাজিক উৎপাদনে মানুষ এমন কতকগুলি সুনির্দিষ্ট অপরিহার্য সম্পর্কের মধ্যে- উৎপাদনী সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে, যা তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা নিরপেক্ষ, যা তাদের বৈষয়িক উৎপাদন-শক্তির বিকাশের নির্দিষ্ট স্তরটির উপযোগী।
‘এই সব উৎপাদন-সম্পর্কের সমষ্টি থেকেই গড়ে ওঠে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো, বাস্তব বনিয়াদ, তার ওপরেই খাড়া হয় বৈধানিক ও রাজনৈতিক উপরিকাঠামো এবং সামাজিক চেতনার নির্দিষ্ট রূপগুলি এই বনিয়াদের উপযোগী। বৈষয়িক জীবনের উৎপাদনপদ্ধতি নিরূপণ করে সাধারণভাবে জীবনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানসিক প্রক্রিয়া। মানুষের চেতনা থেকে তার সত্তা নির্ধারিত হয় না, বরং মানুষের সামাজিক সত্তা থেকেই নির্ধারিত হচ্ছে তাদের চেতনা। বিকাশের একটা নির্দিষ্ট স্তরে বিদ্যমান উৎপাদন-সম্পর্কের সঙ্গে বিরোধ বাধে সমাজের বৈষয়িক উৎপাদন-শক্তির, অথবা,Ñ ওই একই কথাকে আইনের পরিভাষায় বললে দাঁড়ায়,- যে মালিকানা সম্পর্কের মধ্যে এই সব উৎপাদন-শক্তি এতাবৎ বিকশিত হচ্ছিল, বিরোধ ঘটে তারই সঙ্গে। উৎপাদন-শক্তি বিকাশের একটা রূপ থেকে এ সম্পর্ক পরিণত হয় তার শৃঙ্খলে। তখন আরম্ভ হয় সামাজিক বিপ্লবের যুগ। অর্থনৈতিক বনিয়াদের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিপুল উপরিকাঠামোর সবখানিও ন্যূনাধিক অচিরাৎ রূপান্তরিত হয়ে থাকে। এই রকমের রূপান্তরের পর্যালোচনা করতে গেলে বৈধানিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, নান্দনিক বা দার্শনিক, অর্থাৎ, সংক্ষেপে বললে, যে সকল ভাবাদর্শীয় রূপের মধ্য দিয়ে মানুষ এই বিরোধ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে ও সংগ্রাম করে তার নিষ্পত্তির জন্য,-এগুলির সঙ্গে অবশ্যই তফাৎ করে দেখতে হবে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতোই নির্ভুলভাবে নির্ধারণযোগ্য উৎপাদনের অর্থনৈতিক অবস্থার বৈষয়িক রূপান্তরের কথাটা।
‘নিজের সম্পর্কে যার যা ধারণা, তার ওপরেই যেমন একটি মানুষ সম্পর্কে আমাদের মতামত স্থির করা অনুচিত, তেমনি পরিবর্তনের এই রূপ একটা যুগকেও তার নিজস্ব চেতনা দিয়ে বিচার করা চলে না। এই চেতনাটাকেই বরং ব্যাখ্যা করতে হবে বৈষয়িক জীবনের বিরোধগুলি দিয়ে, সামাজিক উৎপাদন-শক্তির সঙ্গে উৎপাদন-সম্পর্কের বিদ্যমান সংঘর্ষ দিয়ে…’ ‘মোটামুটিভাবে এশীয়, পৌরাণিক, সামন্ততান্ত্রিক ও আধুনিক, বুর্জোয়া উৎপাদন-পদ্ধতিকে অর্থনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থার ধারাবাহিক পর্যায় হিসেবে ধরা চলে।’ (১৮৬৬ সালের ৭ জুলাই এঙ্গেলসের কাছে লেখা চিঠিতে মার্কসের সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা তুলনীয় : ‘উৎপাদনের উপকরণ দিয়ে শ্রম সংগঠন নির্ধারণ বিষয়ে আমাদের তত্ত্ব।’)
ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণার আবিষ্কার, কিংবা বলা ভালো, সামাজিক ঘটনার ক্ষেত্রে বস্তুবাদের সুসঙ্গত প্রসারের ফলে পূর্বতন ঐতিহাসিক তত্ত্বাদির দু’টি প্রধান ত্রুটি দূর হল। প্রথমত, এই সব তত্ত্বে বড়োজোর মানুষের ঐতিহাসিক ক্রিয়াকলাপের পেছনে ভাবাদর্শগত কী প্রেরণা আছে কেবল তারই বিচার করা হত, কিন্তু সে প্রেরণা কোথা থেকে সৃষ্টি হল তার অনুসন্ধান হত না, সামাজিক সম্পর্কের ব্যবস্থার বিকাশে বাস্তব নিয়মবদ্ধতা বোঝা হত না, বৈষয়িক উৎপাদনের বিকাশমাত্রার মধ্যে ঐ সব সম্পর্কের মূল খুঁজে দেখা হত না; দ্বিতীয়ত, পূর্বেকার তত্ত্বে ব্যাপক জনগণের ক্রিয়াকলাপেরই স্থান ছিল না, সেক্ষেত্রে প্রকৃতিবৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক যাথার্থ্যরে সঙ্গে ব্যাপক জনগণের সামাজিক অবস্থা ও এই অবস্থার পরিবর্তন সম্পর্কে নিরীক্ষাকে সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক বস্তুবাদই সম্ভব করে তুলল। প্রাক্-মার্কসবাদী ‘সমাজবিজ্ঞান’ ও ইতিহাসবিদ্যার সর্বোত্তম ক্ষেত্রে কিছু এলোমেলোভাবে নির্বাচিত কাঁচামাল তথ্যের সঞ্চয় দেওয়া হত এবং ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার বিচ্ছিন্ন কয়েকটি দিকের বর্ণনা থাকত। মার্কসবাদ পরস্পরবিরোধী সমস্ত প্রবণতার সামগ্রিকতা বিচার করল, সেগুলিকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির জীবনযাত্রা ও উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পর্যবসিত করল, বিভিন্ন সব ‘নিয়ন্তা’ ধারণার নির্বাচন অথবা তাদের ব্যাখ্যা ক্ষেত্রে আত্মমুখিনতা ও যথেচ্ছপনাকে বর্জন করল, উদ্ঘাটন করে দিল যে বিনা ব্যতিক্রমে সমস্ত ধারণা ও সমস্ত বিভিন্ন প্রবণতার মূল রয়েছে বৈষয়িক উৎপাদন-শক্তিগুলির পরিস্থিতির মধ্যে,Ñ এবং এইভাবে সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উদ্ভব, বিকাশ ও বিলয় প্রক্রিয়ার সামগ্রিক ও সর্বাঙ্গীন অধ্যয়নের পথ দেখাল। লোকেরা নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস রচনা করে। কিন্তু লোকদের, বিশেষ করে ব্যাপক জনগণের প্রেরণা স্থির হয় কিসে, কোথা থেকে সৃষ্টি হয় পরস্পরবিরোধী ধারণা ও প্রবণতার সংঘাত, সমগ্র মানবসমাজগুলির এইরূপ সমস্ত সংঘাতের মোট যোগফলটা কী, মানুষের সবকিছু ঐতিহাসিক ক্রিয়াকলাপের যা ভিত্তি, বৈষয়িক জীবনের উৎপাদনের সেই অবজেকটিভ পরিস্থিতির বিকাশের নিয়ম কী, এই সবের দিকে মার্কস মনোযোগ দেন এবং তার বিপুল বৈচিত্র্য ও বিরোধ সত্ত্বেও একটি একক নিয়মানুগ প্রক্রিয়া হিসেবে ইতিহাসের বিজ্ঞানসম্মত অধ্যয়নের পথ দেখান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী