শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

Notice :

গাইডবাণিজ্যের নামে জাতিকে মেধাশূন্য করা সঙ্গত নয়

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে সংযোজিত ৭টি উপধারার উপর বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সুনামগঞ্জ জেলা শাখার নেতারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এ কারণে তাঁরা জেলা প্রশাসকের বরাবরে একটি স্মারকলিপি পেশ করেছেন গত ১৮ এপ্রিল দুপুরে। সংবাদবিবরণী অনুসারে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য হলোÑ “প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন ২০১৬ আইনের উল্লিখিত সাতটি উপধারা বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত বর্তমান শিক্ষা আইন ২০১৬-এর খসড়ায় সৃজনশীল সহায়ক গ্রন্থ প্রকাশে অন্তরায়মূলক উপধারা সংযোজন করায় আমরা বিস্মিত, ক্ষুব্ধ ও হতভম্ব।”
সংশ্লিষ্ট উপধারাগুলো যদি সামগ্রিক অর্থে ‘প্রকাশনা শিল্পের জন্য হুমকি’ হয়ে দাঁড়ায় তবে এগুলোকে আমরা কিছুতেই সমর্থন করতে পারি না। সংশ্লিষ্ট উপধারাগুলো ‘সৃজনশীল সহায়ক গ্রন্থ প্রকাশে অন্তরায়’ প্রশ্নে পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি বিস্মিত, ক্ষুব্ধ ও হতভম্ব হতেই পারেন। কিন্তু আমরা বিস্মিত, ক্ষুব্ধ ও হতভম্ব কোনওটাই হতে পারছি না। ‘সৃজনশীল সহায়ক গ্রন্থ’ প্রকাশ প্রতিহত হলে তৎসংশ্লিষ্ট মুষ্টিমেয় পুস্তক প্রকাশক কিংবা বিক্রেতার লাভের পরিমাণ সংকুচিত হতে পারে, কিন্তু প্রকাশনা শিল্প হুমকির সম্মুখীন হবে এটা একটি অসম্ভব বিষয়। বরং এতে প্রকাশনা শিল্পের সৃজনশীলতা বৃদ্ধির অবকাশ তৈরি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের বিপুল বিস্তৃত অর্থাৎ বৃহদায়তন প্রকাশনা শিল্পের সকল কর্মপ্রচেষ্টাই পাঠ্যবই, নোট, গাইড, সহায়ক গ্রন্থ ইত্যাদি প্রকাশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে অসম্পৃক্ত। প্রকাশনা শিল্পের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করেন মৌলিক সাহিত্য-সৃষ্টি, গবেষণা, অনুবাদ ইত্যাদি সৃজনশীল গ্রন্থসম্ভার প্রকাশ করে। সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প দেশের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই প্রকাশনির্ভর নয়, এটাই চূড়ান্ত সত্য।
সংশ্লিষ্ট ৭ উপধারা শিক্ষাকে দামি পণ্য করে তোলবে না বিধায় বিশেষ মহলের বাড়তি মুনাফা অর্জনের অন্তরায় হলে হতেও পারে, কিন্তু বিপরীতে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী অভিভাবকের পকেট কাটার ব্যবস্থা অন্তত বন্ধ হওয়ার সহায়ক হবে বলে মনে হয়। তাছাড়া এতে করে শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল হওয়ার শিক্ষাধারা থেকে সরিয়ে গাইড-নোট-সহায়ক বইনির্ভর করে তোলে মেধাবিকাশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ হবে। গাইড-নোট ইত্যাদি বই প্রকাশের নামে বাণিজ্য করা একটি ধনবৃদ্ধির উপায় বটে, কিন্তু দেশের শিশু ও শিক্ষার্থীদের মেধাবিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে জাতিকে প্রকারান্তরে ক্রমে ক্রমে মেধাশূন্য করে তোলতে পারে অনায়াসে। একটু অন্যভাবে ভাবলে, যা প্রকৃতপ্রস্তাবে ’৭১-এর বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে জাতিকে মেধাহীন করে তোলার বিকল্প অপচেষ্টারই নামান্তর। সংশ্লিষ্ট গাইড-বাণিজ্যের সঙ্গে এমন একটি অপ্রীতিকর প্রপঞ্চের অস্তিত্বের কল্পনা কেউ করে বসলে তাকে খুব একটা দোষারোপ করাও মনে হয় অসঙ্গত হবে।
বাণিজ্যকে অবশ্যই হতে হবে সেবাধর্মী। সে বাণিজ্য যদি হয় প্রকাশনা শিল্পনির্ভর আর হয়ে ওঠে মেধাবিধ্বংসী, তবে তা কোনও সচেতন মানুষেরই সমর্থন পেতে পারে না। পুস্তক ব্যবসায়ীরা সমাজে জ্ঞান বিতরণের মহৎ বণিক। সে জন্য তাঁরা সর্বজননমস্য। কিন্তু তাঁরা যদি বাণিজ্যের নামে জ্ঞানের বিকাশ বিতরণের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করেন, তবে সমাজ যে মেধাবন্ধ্যাত্বের ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ফলে সৃষ্ট সাংস্কৃতিক বিপর্যয় থেকে দেশ-জাতিকে কে উদ্ধার করবে? জাতিগত মেধাহীনতা শেষ পর্যন্ত সমগ্র জাতিকে অপর প্রাগ্রসর মেধাবী জাতিসত্ত্বার দাসে পরিণত করবে। সে ভয়ংকর পরিণতিকে সংশ্লিষ্ট পুস্তক ব্যবসায়ীরা ঠেকাবেন কী করে? এর উত্তর দেবেন কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী