মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ০৫:৪৯ অপরাহ্ন

Notice :
«» লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ অর্ধ লক্ষাধিক গ্রাহক «» শেখ রাসেলের জন্মবার্ষিকী উদযাপিত «» মঙ্গলবার সারাদিন, নৌকা মার্কায় ভোট দিন : নূরুল হুদা মুকুট «» পরিকল্পনামন্ত্রীর সুস্থতা কামনায় জেলা মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক কর্মচারী সমিতির দোয়া মাহফিল «» মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের মানববন্ধন «» বড়ছড়া শুল্কস্টেশন দিয়ে কয়লা আমদানি শুরু : শ্রমিকদের চোখে আশার আলো «» গোখাদ্য সংকট : খড়ের চড়া দামে কৃষকরা বিপাকে «» দোয়ারাবাজার টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ : ভিত্তিপ্রস্তরেই আটকে আছে নির্মাণকাজ «» উন্নয়ন চাইলে নৌকায় ভোট দিন : নূরুল হুদা মুকুট «» এলডিপি থেকে অ্যাড. তুষারের পদত্যাগ : ‘নাগরিক দায়িত্বে’র কার্যক্রম শুরু

হাওর-রক্ষা বাঁধ : একটি একদেশদর্শী উন্নয়ন পরিকল্পনা

।। কল্লোল তালুকদার চপল।।
হাওরের ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কে নূতন করে বলার কিছু নেই। বিভিন্ন শ্রেণির মিডিয়ার উলটা-সিধা প্রচারের সুবাদে বর্তমানে আমরা সবাই কমবেশি তা জানি। তবু মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে এ সম্পর্কে সংক্ষেপে দু-একটি কথা বলে নেয়া দরকার। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু কিছু স্থানে ভূ-পৃষ্ঠ প্রাকৃতিক কারণে ডেবে গিয়ে পিরিচ বা বোলসদৃশ (ঝধঁপবৎ ড়ৎ ইড়ষি ংযধঢ়বফ) অগভীর খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। বছরের অধিকাংশ সময় জলনিমগ্ন থাকা এই জলাভূমিই সাধারণত হাওর নামে পরিচিত। বর্ষাকালে সাগরের রূপ পরিগ্রহ করে বলেই একে হাওর (সাগর>সায়র>হাওর) নামে অভিহিত করা হয়। তবে শুষ্ক মৌসুমে জল সরে গিয়ে দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর জেগে ওঠে। তখন এর উর্বর বিস্তীর্ণ প্রান্তরে শুরু হয় ধানচাষের তোড়জোড়।
প্রাকৃতিকভাবেই হাওরে একটি জলপ্রণালী গড়ে ওঠেছে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় হাওর বেসিনে পানি ঢুকে এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জলমগ্ন থাকে। অতঃপর সেই জল যথাসময়ে নির্দিষ্ট পথে বের হয়ে যায়। এই জলচক্রের জন্য প্রাকৃতিকভাবে হাওরবেসিনে গড়ে ওঠেছে পানি প্রবেশ ও নিষ্কাশন পথ। আর এই পানিচক্রের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সুদূর অতীতে গড়ে ওঠেছিল এই অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থা। তবে ৪/৫ বছর অন্তর অন্তর পাহাড়ি ঢলের কারণে অসময়ে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় (ঋষধংয ঋষড়ড়ফ) ফসল তলিয়ে যাওয়াও হাওরাঞ্চলে একটি নিয়মিত ব্যাপার। এর ফলে কৃষকের যাপিত জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়।
হাওর-অর্থনীতি মূলত আবর্তিত হয় বোরো ধানকে ঘিরে। অর্থাৎ এ অঞ্চলের উৎপাদন, ভোগ, বিতরণ ও বিনিময়Ñ অর্থশাস্ত্রের এই চারটি কার্যক্রম প্রধানত বোরো ধান কেন্দ্রীক। তবে হাওরের মৎস্যসম্পদও এই কার্যকলাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাওরের প্রধান ফসল এই বোরো ধান রক্ষার জন্য এযাবৎ কোটি কোটি টাকা খরচ করে বহু বাঁধ নির্মিত হয়েছে। আকস্মিক বন্যা থেকে ফসল রক্ষার জন্য সুরমা থেকে যেসমস্ত নদীনালা, খাল হাওরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, তাদের মুখে নির্মাণ করা হয়েছে হাওর-রক্ষা বাঁধ, যেমন : পা-ারখাল, জামালগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও, শাহপুর, গজারিয়া বাঁধসহ ছোট-বড় অনেক বাঁধ। কিন্তু এই বাঁধসমূহের কারণে হাওরের পরিবেশে-প্রতিবেশ এবং হাওর-কৃষি কীভাবে প্রভাবিত হবে, বাঁধ নির্মাণের পূর্বে তা কি কখনো মূল্যায়ন করা হয়েছে? হাওররক্ষা বাঁধ কি হাওরবাসীকে তার পৌনঃপুনিক দুঃখ-চক্র থেকে মুক্তি দিয়েছে?
হাওররক্ষা বাঁধ যদিও আপাতদৃষ্টিতে ফসল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে হয়, কিন্তু হাওরের কৃষি, পরিবেশ-প্রতিবেশসহ সকল প্রাকৃতিক প্রণালিতে ফেলছে সুদূরপ্রসারী বিরূপ প্রভাব। সোজা কথায়, ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্র। অপেক্ষাকৃত উজানের নদী-নালা-খাল দিয়ে হাওরে পানি প্রবেশ এবং ভাটির নিষ্কাশন পথ দিয়ে সেই পানি যথাসময়ে হাওর থেকে বের হওয়া, এটাই ছিল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। হাওরে আগত নদীবাহিত পানি প্রচুর পলিমাটি বয়ে আনে। ফলে বৃদ্ধিপায় জমির উর্বরতা। যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণের ফলে অনেক ঘোরপথে, বহু বাধা অতিক্রম করে বর্তমানে হাওরে পানি প্রবেশ করে। ফলে সেই পানিতে থাকে না পর্যাপ্ত পলি। এভাবে জমি ক্রমশ হারাচ্ছে স্বাভাবিক উর্বরতা। ফসল উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে প্রয়োগ করতে হচ্ছে অতিরিক্ত রাসায়নিক পদার্থ, যা পরিবেশের জন্য খুব অনিষ্টকর। তাছাড়া পলিসমৃদ্ধ নদীর ঘোলা পানি হাওরে সরাসরি প্রবেশ না করায় এবং পানিতে স্বাভাবিক ¯্রােত না থাকায় জলজ আগাছার পরিমাণ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। পানি সরে যাওয়ার পর জমিকে আগাছা মুক্ত করে চাষোপযোগী করতে কৃষককে অতিরিক্ত অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়।
অপরিকল্পিত বাঁধ এবং সড়ক নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশন পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া পলি জমে জমে ভাটিতে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের উচ্চতা ক্রমশ বেড়ে চলছে। কিন্তু হাওরের বাকি অংশে পলি না পাড়ায় গভীরতা রয়েছে অপরিবর্তিত। প্রাকৃতিক নিয়মে যদি সমভাবে পললায়ন ঘটতো, তবে হয়তো ধীরে ধীরে সমগ্র হাওরবেসিনের গভীরতা হ্রাস পেত। এতে একফসলী জমি হয়তো দুফসলী জমিতে পরিণত হতো। ঠিক এইভাবে জামালগঞ্জের পাগনার হাওরের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে পলি জমে ভূমির উচ্চতা ইতোমধ্যে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছুদিন পর হয়তো সেখানে বোরোর পাশাপাশি আমান ধান চাষও সম্ভব হবে। কিন্তু এভাবে শুধু ভাটির দিক ভরাট হয়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে আর এক ভয়াবহ সংকট। হাওরের পানি নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। শত শত একর জমি চাষাবাদের আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সময় মতো পানি সরে না যাওয়ায় পাগনার হাওরের উত্তর-পূর্ব দিকের শত শত একর জমিতে চাষাবাদের সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রলম্বিত হচ্ছে ফসল তোলার সময়। তাই প্রতিবছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি ঘটছে। এই জলাবদ্ধতা-সমস্যা হাওরের কৃষিতে ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করছে। হাওরে পানি প্রবেশ করতে যেমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি হাওরের স্বাভাবিক জলনির্গম প্রনালীতেও সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা। তাই দেখা যায়, অল্প বৃষ্টিপাতেই হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। স্থানীয়ভাবে জমিতে জমে যাওয়া বৃষ্টির পানিকে বলা হয় ‘ডুবরা’। এই ডুবরার পানিতে প্রায় প্রতি বছরই ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা নয়, বরং ডুবরার পানি এখন পঁচিয়ে দিচ্ছে মাঠভরা সোনালি ফসল।
হাওরাঞ্চল দেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল জলাভূমি হিসেবে সুপরিচিত। জীববৈচিত্র্য ধারণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে হাওরের গুরুত্ব অপরিসীম। অতীতে স্থানীয় ও অভিগমনকারী পাখপাখালি এবং বিচিত্র বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল এই হাওরাঞ্চল। পানির মুক্ত প্রবাহে বাধা দেওয়ায় ভারসাম্য নষ্ট হয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছে হাওরের ইকোসিস্টেম। নষ্ট হচ্ছে উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের আবাস। জীববৈচিত্র্যের উপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। নানান বাধাবিপত্তির কারণে জলজ প্রাণীদের অবাধ চলাচলে বিঘœ ঘটছে। হাওরে আগের মতো আর পানি হয় না। পানি নেই তো মাছও নেই। মাছসহ অন্যান্য জলজপ্রাণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। পরিযায়ী পাখিরাও আগের মতো আসে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে অনেক জীবপ্রজাতি একসময় বিলুপ্তির অতল তলে হারিয়ে যাবে।
দেখা যাচ্ছে, যে কৃষির সুরক্ষায় এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, সেই কৃষিব্যবস্থাই এই বাঁধের কারণে হচ্ছে নিদারুণভাবে ক্ষতির সম্মুখীন। হাওর-কৃষিতে এই প্রকৃতির প্রত্যাঘাত ইতোমধ্যেই প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ কথা এড়িয়ে যাবার আর কোনো উপায় নেই যে, হাওরাঞ্চলের মানুষের ভোগান্তির বহুবিধ কারণের মধ্যে যত্রতত্র অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ অন্যতম প্রধান কারণ। এইসব অপরিকল্পিত বাঁধ দেওয়া হয় একটি মাত্র লক্ষ্য সামনে রেখেÑ যেনতেন প্রকারে ফসল রক্ষা করা। কিন্তু আধুনিক ধারণা অনুযায়ী, যেকোনো ধরণের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করার সময় তার পরিবেশগত প্রভাব (ঊহারৎড়হসবহঃধষ ওসঢ়ধপঃ অংংবংংসবহঃ, ঊওঅ) সর্বাগ্রে নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখতে হয়। কিন্তু হাওররক্ষা বাঁধের পরিবেশগত প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী তা কি কখনো আদৌ মূল্যায়ন করা হয়েছে?
হাওররক্ষা বাঁধের কারণে এই অনন্য বাস্তুতন্ত্রে বহুবিধ সমস্যা ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। সমস্যার কার্যকর সমাধানের জন্য দরকার একটি সমন্বিত টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা, যাতে হাওরের কৃষিও নিরাপদ হবে, আবার পরিবেশ-প্রতিবেশের সকল ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও অক্ষুণœ থাকবে। বন্যা একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। বন্যা হবেই। একে আটকানো যাবে না। বরং বন্যাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে কাক্সিক্ষত ফসল ঘরে তোলা যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে প্রতিবছর মাটির বাঁধ নির্মাণ করা কোনো কাজের কথা নয়। এই সব বাঁধ নির্মাণের প্রক্রিয়ায় কিছুসংখ্যক আমলা, গুটিকয়েক প্রভাবশালীর পকেট কেবলই মোটাতাজা হয়। কিন্তু হাওরের প্রান্তিক চাষীর অবস্থা তথৈবচ, বরং বলা ভালো, পূর্বের চেয়েও করুণ। বন্যাসহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন ছাড়াও এমন উচ্চফলনশীল আগাম ধানের জাত উদ্ভাবন করতে হবে, যার জীবনচক্র হবে বেশ ছোট। চৈত্রমাসেই যেন সিংহভাগ ফসল ঘরে তোলা যায়। ফলে কালবৈশাখী ঝড়, শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যার মতো দুর্যোগ এড়িয়ে নিরাপদে ফসল গোলায় ভরা যাবে। এটাও নিশ্চিত করতে হবে যেন হাওরের পানি যথাসময়ে নিষ্কাশিত হয়। জলাবদ্ধতার কারণে যেন চাষাবাদ বিলম্বিত না হয়। ভরাট হয়ে যাওয়া নদী, নালা, খাল প্রভৃতি খনন করা প্রয়োজন।
যে সমস্ত পয়েন্টে বাঁধ নির্মাণ করা খুবই জরুরি, সেখানে স্থায়ী বাঁধ না দিয়ে স্লুইস গেইট নির্মাণ করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন কার্যকরভাবে ফসল রক্ষা করা যাবে, তেমনি ফসল কাটার পর গেইট খুলে দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহও অক্ষুণœ রাখা যাবে। কেউ কেউ হয়তো প্রশ্ন তোলতে পারেন, স্লুইস গেইট নির্মাণ ব্যয়বহুল। কিন্তু এ যাবৎ মাটির বাঁধ (পড়–ন বালির বাঁধ!) নির্মাণ করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় (পড়–ন অপব্যয়!) করা হয়েছে এবং যে পরিমাণ অর্থ লুটপাট হয়েছে, তারচেয়ে হয়তো অনেক কম খরচে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অত্যাধুনিক স্লুইস গেইট নির্মাণ করা সম্ভব হতো। তাছাড়া আরও অন্যান্য যা যা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার, তা নেয়া যেতো। প্রয়োজনে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞদের পরমর্শের ভিত্তিতে টেকসই উন্নয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতো। প্রত্যক্ষ লাভের আশায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রাকৃতিক সিস্টেমকে বিঘিœত করার পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ। যতদিন না এই একদেশদর্শী উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে নীতিনির্ধারকগণ বের হয়ে আসবেন, ততদিন হাওরের কৃষিজীবী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্গতি অবসানের কোনো আশু সম্ভাবনা নেই।
লেখক: কবি ও উদ্ভিদ বৈচিত্র গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী