জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রশ্নে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এ বাস্তবতায় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। মাত্র একটি সরকারি ভবনের ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও প্রযুক্তির ব্যবহার বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছে ১২৭টি সৌর প্যানেল। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জুন, জুলাই ও আগস্ট - এই তিন মাসে এসব প্যানেল থেকে উৎপাদিত ৩০ হাজার ৮২৭ ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সরকারি ভবনের ছাদ শুধু অবকাঠামো নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও কার্যকর উৎস হতে পারে। নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ এ উদ্যোগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
সুনামগঞ্জের মতো হাওরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জ্বালানি সরবরাহের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে বিকল্প জ্বালানির গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ সরকারি-বেসরকারি বহু ভবনের ছাদ এখনো অব্যবহৃত পড়ে আছে। এসব ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে একদিকে বিদ্যুতের জাতীয় চাহিদা পূরণে সহায়তা মিলবে, অন্যদিকে প্রচলিত জ্বালানির ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
তবে একটি প্রকল্প স্থাপন করেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, উৎপাদিত বিদ্যুতের হিসাব সংরক্ষণ, যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রকল্পের ব্যয় ও উৎপাদনের তুলনায় কতটা আর্থিক সাশ্রয় হচ্ছে, সেটিও নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে একই ধরনের প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যাবে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উপজেলা প্রশাসন এবং হোটেল-রেস্তোরাঁয় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহিত করার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে এ উদ্যোগকে কেবল চিঠি চালাচালি বা উৎসাহ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সরকারি দপ্তরগুলোতে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তা ও আবাসিক ভবনের মালিকদের জন্য সহজ অর্থায়ন, কারিগরি পরামর্শ এবং নেট মিটারিং সংযোগপ্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উদ্যোগটি একটি সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত। এখন প্রয়োজন এ দৃষ্টান্তকে বিস্তৃত করা। সরকারি ভবনের অব্যবহৃত ছাদগুলো কাজে লাগিয়ে জেলাজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। তাই উদ্যোগটি প্রশংসার পাশাপাশি এর ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও সম্প্রসারণ নিশ্চিত করাই হোক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার।